নবদ্বীপ, নদীয়া : শরীরচর্চার পর গঙ্গায় স্নান করতে নেমে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা! মুহূর্তের মধ্যেই গঙ্গার জলে তলিয়ে গেলেন দুই বন্ধু। নিখোঁজ দুই যুবকের নাম আদিত্য সাহা, বয়স ২০ বছর এবং সুরোজিৎ দে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে নবদ্বীপে। ঘটনাটি ঘটেছে নবদ্বীপের দেয়ারাপাড়া সংলগ্ন কর্মমন্দির মাঠের ঘাটে। দুই যুবকের নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঘটনাস্থলে ভিড় জমাতে শুরু করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরিবারের সদস্যদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে না পৌঁছানোয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন নিখোঁজ যুবকদের পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, শরীরচর্চা করার পর গঙ্গায় স্নান করতে নেমেছিলেন আদিত্য সাহা ও সুরোজিৎ দে। কিন্তু স্নান করতে গিয়েই ঘটে যায় বিপত্তি। আচমকাই দু’জন গঙ্গার জলে তলিয়ে যান। চোখের সামনে দুই যুবককে জলের মধ্যে হারিয়ে যেতে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন উপস্থিত মানুষজন। মুহূর্তের মধ্যেই খবর ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগে তাঁদের উদ্ধারের চেষ্টা করেন। কিন্তু গঙ্গার গভীর জল এবং স্রোতের কারণে সেই চেষ্টা কতটা কঠিন হয়ে ওঠে, তা সহজেই অনুমেয়। দুই যুবকের নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। প্রিয়জনদের খোঁজ না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁরা। কখনও গঙ্গার ঘাটে, কখনও নদীর দিকে তাকিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন পরিবারের লোকজন। তাঁদের একটাই প্রার্থনা, যেভাবেই হোক দ্রুত উদ্ধার করা হোক দুই যুবককে।

তবে এই ঘটনার পর উদ্ধারকাজ শুরু হতে দেরি হওয়ায় ক্ষোভ আরও বাড়তে থাকে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারের অভিযোগ, এমন একটি গুরুতর দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছনো উচিত ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও উদ্ধারকারী দলের দেখা না মেলায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে প্রশাসনিক তৎপরতা নিয়ে। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরও কেন দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করা গেল না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। পরবর্তীতে বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছন। এরপর শুরু হয় নিখোঁজ দুই যুবকের সন্ধানে তল্লাশি অভিযান। গঙ্গার জলে তল্লাশি চালিয়ে তাঁদের খোঁজ পাওয়ার চেষ্টা করেন উদ্ধারকারীরা। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে উদ্বেগের সঙ্গে উদ্ধারকাজের দিকে তাকিয়ে থাকেন পরিবারের সদস্য এবং স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে এই দুর্ঘটনা শুধু দুই যুবকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং নবদ্বীপের গঙ্গার ঘাটগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। কারণ নবদ্বীপ শুধু একটি শহর নয়, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও তীর্থক্ষেত্র। প্রতিদিনই এখানে বহু পর্যটক, পুণ্যার্থী এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত। গঙ্গার বিভিন্ন ঘাটে প্রতিদিন বহু মানুষ স্নান করতে নামেন। বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যার সময় ঘাটগুলিতে মানুষের ভিড় চোখে পড়ার মতো।

এমন পরিস্থিতিতে গঙ্গার ঘাটগুলিতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, বহু ঘাটেই নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তারক্ষী। কোথাও আবার বিপর্যয় মোকাবিলার প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। এমনকি বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধারকাজ চালানোর জন্য প্রশিক্ষিত ডুবুরির ব্যবস্থাও সবসময় চোখে পড়ে না। ফলে সামান্য অসতর্কতা কিংবা দুর্ঘটনা ঘটলে বিপদের আশঙ্কা অনেকটাই বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীতে স্নান করার ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা মেনে চলা অত্যন্ত প্রয়োজন। গঙ্গার জলের গভীরতা সব জায়গায় একরকম নয়। কোথাও অল্প জল থাকলেও কিছুটা দূরেই থাকতে পারে গভীর খাদ। আবার নদীর তলদেশে বালির চর, কাদা কিংবা আকস্মিক গর্ত থাকার কারণে স্নান করতে নামা মানুষের পক্ষে পরিস্থিতি বুঝে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে। তার উপর নদীর স্রোত অনেক সময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না। ফলে অভিজ্ঞ সাঁতারুদের ক্ষেত্রেও বিপদের আশঙ্কা থেকে যায়। তাই গঙ্গার ঘাটগুলিতে শুধুমাত্র দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজ চালালেই হবে না, দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সেই ব্যবস্থাও আগে থেকে নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটে নিয়মিত পুলিশি নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি বিপজ্জনক এলাকাগুলিতে বড় করে সতর্কতামূলক বোর্ড লাগানো জরুরি। কোন জায়গায় কতটা গভীর জল রয়েছে, কোথায় স্নান করা বিপজ্জনক, সেই বিষয়ে স্পষ্টভাবে মানুষকে জানাতে হবে। এছাড়াও ঘাটগুলিতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা, নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম মজুত রাখার দাবি উঠেছে। বিশেষ করে নবদ্বীপের মতো গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্রে স্থায়ী প্রশিক্ষিত ডুবুরি দল রাখার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কারণ নদীতে কেউ তলিয়ে গেলে প্রথম কয়েকটি মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত উদ্ধারকারী দল পৌঁছতে পারলে বিপদের পরিস্থিতি মোকাবিলার সুযোগ বাড়ে। কিন্তু উদ্ধারকাজে বিলম্ব হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রতিটি ঘাটে জরুরি যোগাযোগ নম্বর, উদ্ধারকারী সরঞ্জাম এবং দ্রুত খবর পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার।

এখনও পর্যন্ত আদিত্য সাহা ও সুরোজিৎ দের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবার ও পরিজনদের উদ্বেগ কাটেনি। তাঁদের ফিরে পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করছেন স্বজনেরা। অন্যদিকে, এই ঘটনার পর প্রশাসনের কাছে স্থানীয়দের একটাই দাবি, গঙ্গার ঘাটগুলির নিরাপত্তা নিয়ে আর কোনওরকম অবহেলা করা চলবে না। প্রশ্ন উঠছে, আরও কত দুর্ঘটনা ঘটলে প্রশাসনের টনক নড়বে? আর কত প্রাণহানির পর ঘাটগুলিতে বাড়বে নিরাপত্তা? প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের যাতায়াত যেখানে, সেখানে কেন পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও উদ্ধার ব্যবস্থার অভাব থাকবে? দুই বন্ধুর এই মর্মান্তিক নিখোঁজের ঘটনা আবারও বুঝিয়ে দিল, বিপদ ঘটার পর তৎপরতা দেখানোর পাশাপাশি বিপদ আটকানোর ব্যবস্থাও সমান জরুরি। তাই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে নবদ্বীপের গঙ্গার ঘাটগুলিকে নিরাপদ করে তোলাই এখন সময়ের দাবি।