দুর্গাপুর : বাড়ির উঠোনে ঘুরে বেড়াচ্ছিল দুটি কচ্ছপ! আচমকাই এমন দৃশ্য চোখে পড়তেই চমকে উঠলেন বাড়ির মালিক। তবে চমকে গেলেও বন্যপ্রাণী দুটির কোনও ক্ষতি হতে দেননি তিনি। বরং দেরি না করে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে উদ্ধার করেন কচ্ছপ দুটিকে। এরপর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের কথা মাথায় রেখে সেগুলিকে সরাসরি তুলে দেন বনদপ্তরের হাতে। এক যুবকের এমন সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের ঘটনা সামনে আসতেই প্রশংসা শুরু হয়েছে এলাকায়। বৃহস্পতিবার ভোরে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য ছড়ায় দুর্গাপুরের কাঁকসার মলানদিঘির বিষ্ণুপুর এলাকায়। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বিষ্ণুপুর এলাকার বাসিন্দা প্রশান্ত লোহার বৃহস্পতিবার ভোরে নিজের বাড়ির উঠোনে দুটি কচ্ছপ দেখতে পান। সাধারণত বাড়ির উঠোনে এমন বন্যপ্রাণীর দেখা মেলে না। তাই আচমকা জোড়া কচ্ছপকে বাড়ির আঙিনায় ঘুরে বেড়াতে দেখে প্রথমে কিছুটা অবাক হয়ে যান তিনি। কচ্ছপ দুটি কোথা থেকে এল, কীভাবেই বা তাঁর বাড়ির উঠোনে পৌঁছল, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে প্রশান্তের। তবে কৌতূহলবশত কচ্ছপ দুটিকে নিয়ে কোনওরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেননি তিনি। বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে অত্যন্ত সাবধানে সেগুলিকে উদ্ধার করেন। এরপর আর সময় নষ্ট না করে কচ্ছপ দুটি নিয়ে পৌঁছে যান বনদপ্তরের দফতরে। সেখানে শিবপুর বিট অফিসার পিনাকী ভট্টাচার্যের হাতে কচ্ছপ দুটি তুলে দেন প্রশান্ত লোহার। তাঁর এই উদ্যোগের ফলে নিরাপদে বনদপ্তরের কাছে পৌঁছয় বন্যপ্রাণী দুটি।

জানা গিয়েছে, উদ্ধার হওয়া কচ্ছপ দুটি ভারতীয় প্রজাতির। যদিও ঠিক কোন প্রজাতির কচ্ছপ সেগুলি, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি। পাশাপাশি, কচ্ছপ দুটি কীভাবে প্রশান্ত লোহারের বাড়ির উঠোনে এসে পৌঁছল, তা-ও এখনও স্পষ্ট নয়। আশপাশের কোনও জলাশয়, ঝোপঝাড় কিংবা প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে সেগুলি লোকালয়ে চলে এসেছিল কি না, তা নিয়েও নিশ্চিতভাবে কিছু জানা যায়নি। এ প্রসঙ্গে প্রশান্ত লোহার জানান, বৃহস্পতিবার ভোরে নিজের বাড়ির উঠোনে দুটি কচ্ছপ দেখতে পান তিনি। এরপর সেগুলিকে উদ্ধার করে বনদপ্তরের অফিসে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বন্যপ্রাণীর কোনও ক্ষতি না করে কচ্ছপ দুটি আধিকারিকদের হাতে তুলে দেন তিনি। তাঁর এই পদক্ষেপে স্পষ্ট, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সচেতনতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। প্রকৃতির কোলে বসবাসকারী বিভিন্ন প্রাণী কখনও কখনও খাবারের সন্ধানে কিংবা পরিবেশগত কারণে লোকালয়ে চলে আসে। বিশেষ করে জলাশয়, পুকুর, খাল কিংবা জলাভূমির আশপাশে বসবাসকারী প্রাণীদের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। তবে লোকালয়ে কোনও বন্যপ্রাণী দেখতে পেলেই তাকে ভয় দেখানো, আঘাত করা কিংবা নিজের কাছে রেখে দেওয়া উচিত নয়। কারণ, অনেক সময় প্রাণীটিকে সঠিকভাবে ধরতে না পারলে তার শরীরে আঘাত লাগতে পারে। আবার কিছু প্রাণী ভয় পেয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে গিয়েও বিপদের মুখে পড়তে পারে। কচ্ছপ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন প্রজাতির কচ্ছপ জলজ ও স্থলজ বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত। তাদের খাদ্যাভ্যাস এবং পরিবেশের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। তাই কচ্ছপের মতো বন্যপ্রাণীকে রক্ষা করা শুধু একটি প্রাণীকে বাঁচানোর বিষয় নয়, বরং বৃহত্তর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অনেক সময় লোকালয়ে কচ্ছপ দেখতে পেয়ে কেউ কেউ সেগুলিকে বাড়িতে রেখে দেওয়ার কথা ভাবেন। কিন্তু বন্যপ্রাণীকে নিজের কাছে রাখা সবসময় তাদের জন্য নিরাপদ নয়। কচ্ছপের বেঁচে থাকার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ, খাবার এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যা দরকার। কোন প্রজাতির কচ্ছপ কী ধরনের পরিবেশে থাকে, তা না জেনে তাদের অন্যত্র ছেড়ে দেওয়াও বিপজ্জনক হতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতিতে বনদপ্তরের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। প্রশান্ত লোহারও সেই দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন। কচ্ছপ দুটিকে নিজের কাছে না রেখে বনদপ্তরের হাতে তুলে দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য সবসময় বড় কোনও উদ্যোগের প্রয়োজন হয় না। কখনও কখনও সঠিক সময়ে নেওয়া একটি ছোট পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে গ্রাম ও শহরতলির এলাকায় বসবাসকারী মানুষের সচেতনতা বন্যপ্রাণী রক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর। বনদপ্তরের আধিকারিকরাও যুবকের এই সচেতনতা ও বন্যপ্রাণীর প্রতি দায়িত্ববোধের প্রশংসা করেছেন বলে জানা গিয়েছে। বন্যপ্রাণীকে বিপদের মুখে না ফেলে নিরাপদে উদ্ধার করে বনদপ্তরের হাতে তুলে দেওয়ার মতো উদ্যোগ পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তাকে আরও জোরালো করে। তবে কচ্ছপ দুটি কোথা থেকে এসেছিল, কীভাবে বাড়ির উঠোনে পৌঁছল এবং সেগুলিকে পরবর্তী সময়ে কোথায় রাখা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও সামনে আসেনি। বনদপ্তরের তত্ত্বাবধানে কচ্ছপ দুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলিয়ে, দুর্গাপুরের কাঁকসার মলানদিঘির বিষ্ণুপুরে জোড়া কচ্ছপ উদ্ধারের এই ঘটনা শুধু একটি বন্যপ্রাণী উদ্ধারের খবর নয়, বরং পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের দায়িত্ববোধেরও একটি ইতিবাচক উদাহরণ। প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান এবং বন্যপ্রাণীর প্রতি সহমর্মিতাই যে পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখার অন্যতম পথ, তা আরও একবার প্রমাণ করলেন বিষ্ণুপুরের বাসিন্দা প্রশান্ত লোহার।