গুয়াহাটি : হোটেলের লিজ নিয়ে বিবাদ, নাকি দীর্ঘদিনের পারিবারিক শত্রুতা? ব্যবসায়িক বিরোধের জের, নাকি পরিকল্পিত হামলা? একের পর এক গুলির শব্দে কেঁপে উঠল গুয়াহাটির বরা সার্ভিস এলাকা। হোটেল বিলাস ইন-এর কাছে ভয়াবহ গুলিচালনায় মৃত্যু হল পাঁচ জনের। গুলিবিদ্ধ আরও এক জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই ঘটনায় ঘনকান্ত গগৈ নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, ধৃতের লাইসেন্সপ্রাপ্ত পিস্তল থেকেই গুলি চালানো হয়েছিল। তবে ঠিক কী কারণে এই রক্তক্ষয়ী হামলা, তা নিয়ে এখনও কাটেনি রহস্যের জট। ঘটনাটি ঘটে সোমবার রাতে। পুলিশ ও প্রাথমিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, রাত প্রায় ন’টা নাগাদ হোটেল বিলাস ইন সংলগ্ন একটি গলিতে আচমকাই গুলিচালনার ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যার পর ব্যস্ত এলাকায় পরপর গুলির শব্দ শুনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও আশপাশের মানুষের মধ্যে। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে ভয়াবহ। কী ঘটছে, তা বুঝে ওঠার আগেই একাধিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হন বলে জানা যাচ্ছে। ঘটনার পর এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারী মোট সাত রাউন্ড গুলি চালিয়েছিলেন বলে দাবি করা হচ্ছে। সূত্রের খবর, প্রথমে এক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। তাঁকে বাঁচাতে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্যরা এগিয়ে এলে তাঁদেরও লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে। তবে হামলার সময় ঠিক কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, কে প্রথম আক্রমণের শিকার হন এবং কীভাবে একের পর এক গুলি চালানো হয়, তা এখনও স্পষ্ট নয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও অন্যান্য তথ্য খতিয়ে দেখে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ জানার চেষ্টা করছে পুলিশ।

গুলিচালনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ। শুরু হয় উদ্ধারকাজ এবং তদন্ত। গুলিবিদ্ধদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি পাঁচ জনের। তাঁদের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলিতে। অন্যদিকে, আরও এক জন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনও সামনে আসেনি। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ঘনকান্ত গগৈ নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, তাঁর লাইসেন্সপ্রাপ্ত পিস্তল থেকেই গুলি চালানো হয়েছিল বলে অনুমান তদন্তকারীদের। তবে এই ঘটনার নেপথ্যে কী কারণ রয়েছে, তা নিয়েই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। গুয়াহাটির পুলিশ কমিশনার পার্থসারথি মহন্ত জানিয়েছেন, প্রায় এক বছর আগে ঘনকান্ত গগৈ হোটেলটি লিজ নিয়েছিলেন। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, হোটেলের লিজ সংক্রান্ত কোনও বিবাদ থেকেই এই ভয়াবহ ঘটনার সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। ব্যবসায়িক সম্পর্কের টানাপোড়েন কি শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী সংঘর্ষের রূপ নিল? লিজের শর্ত, হোটেলের দখল কিংবা আর্থিক লেনদেন নিয়ে কোনও বিরোধ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও তদন্তকারীরা এখনও এই ঘটনাকে সরাসরি লিজ সংক্রান্ত বিবাদের ফল বলে নিশ্চিত করেননি।

অন্যদিকে, এই ঘটনায় পারিবারিক বিরোধের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না তদন্তকারী দল। সূত্রের দাবি, নিহতদের মধ্যে রয়েছেন হোটেলের মালিক হেলেনা ভরালি, তাঁর ছেলে দেবর্ষি কাশ্যপ এবং হেলেনার দাদা ভূদেব ভরালি। নিহতদের অধিকাংশই একই পরিবারের সদস্য বলে জানা যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, হোটেলের লিজ নিয়ে বিবাদের আড়ালে কি কোনও পারিবারিক শত্রুতা কাজ করছিল? সম্পত্তি, ব্যবসায়িক স্বার্থ কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েনের সঙ্গে এই ঘটনার কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। নিহতদের মধ্যে ৪৮ বছর বয়সি নারায়ণ দাসও রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। তবে বাকি নিহতদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কী ছিল এবং কী কারণে তিনি ওই সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও স্পষ্ট নয়। একইভাবে, হামলাকারীর সঙ্গে নিহতদের প্রত্যেকের সম্পর্ক কী ছিল, তা জানারও চেষ্টা চলছে। প্রাথমিকভাবে একাধিক সম্ভাবনার কথা সামনে এলেও কোনও একটি কারণকে চূড়ান্ত বলে ধরে নিতে নারাজ পুলিশ।

এই ঘটনায় ধৃত ঘনকান্ত গগৈকে জিজ্ঞাসাবাদ করে হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য জানার চেষ্টা চলছে। তাঁর কাছে থাকা লাইসেন্সপ্রাপ্ত আগ্নেয়াস্ত্র কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল, গুলিচালনার আগে কোনও বচসা হয়েছিল কি না এবং হামলার ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত ছিল কি না, সেই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। হামলার সময় উপস্থিত ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হতে পারে। সব মিলিয়ে, গুয়াহাটির বরা সার্ভিস এলাকায় হোটেল বিলাস ইন-এর কাছে পাঁচ জনের মৃত্যু ঘিরে তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্ন। হোটেলের লিজ নিয়ে বিবাদ, নাকি পারিবারিক শত্রুতার জেরে এই হত্যাকাণ্ড? একজনকে লক্ষ্য করে শুরু হওয়া হামলা কীভাবে একাধিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিল? সাত রাউন্ড গুলির নেপথ্যে কি কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল? আপাতত এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হামলার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলতে নারাজ তদন্তকারীরা। ধৃতকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তদন্তের অগ্রগতির দিকেই এখন নজর সকলের।