বীরভূম : অর্ধশতাব্দীর ঐতিহ্য, বিশ্বাস আর গ্রামবাসীদের ঐক্যের মেলবন্ধন! কোনও বড় পৃষ্ঠপোষকতা নয়, নেই বাইরের আর্থিক সাহায্য। নিজেদের সামর্থ্য, অনুদান আর সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে পাথেয় করেই বিগত ৫০ বছর ধরে নিষ্ঠা ও ভক্তির সঙ্গে মা লক্ষ্মীর আরাধনায় মেতে ওঠেন বীরভূমের ইলামবাজার ব্লকের ঘুড়িসা অঞ্চলের পশ্চিম নারায়ণপুর নেতাজি কলোনির বাসিন্দারা। গ্রামের পলাশ বাগানে প্রতিবছর মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয় এই ঐতিহ্যবাহী লক্ষ্মীপুজো। সময়ের সঙ্গে বদলেছে অনেক কিছু, বদলেছে জীবনযাত্রা, বেড়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া। কিন্তু বদলায়নি গ্রামের মানুষের বিশ্বাস, ভক্তি আর একসঙ্গে উৎসব উদযাপনের সেই চিরাচরিত রীতি। আর সেই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে আজও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে আসেন এলাকার ৩২ থেকে ৩৫টি পরিবার। বীরভূমের গ্রামবাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব। সেই উৎসবের আবহেই পশ্চিম নারায়ণপুরের পলাশ বাগানের লক্ষ্মীপুজো আজ শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং গ্রামবাসীদের মিলিত প্রচেষ্টা ও সামাজিক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। প্রায় পাঁচ দশক আগে যে পুজোর সূচনা হয়েছিল, আজও সেই পুজোর ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন গ্রামের মানুষ। বছরের পর বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে মা লক্ষ্মীর আরাধনা করে আসছেন তাঁরা। পুরনো প্রজন্মের হাত ধরে যে পুজোর ঐতিহ্য শুরু হয়েছিল, নতুন প্রজন্মও সেই পরম্পরাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সমানভাবে আগ্রহী। এই পুজোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল, এর আয়োজনের পিছনে নেই কোনও বড় আর্থিক সংস্থার সহযোগিতা কিংবা বাইরের কোনও পৃষ্ঠপোষকতা। গ্রামের পরিবারগুলিই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অনুদান দেন। সেই অর্থ এবং সবার সম্মিলিত উদ্যোগেই সম্পন্ন হয় পুজোর যাবতীয় আয়োজন। পুজোর প্রস্তুতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন দায়িত্ব সামলানো, সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে আসেন গ্রামের বাসিন্দারা। কারও দায়িত্ব পুজোর ব্যবস্থাপনা, কারও দায়িত্ব অন্যান্য আয়োজনের দেখভাল। এভাবেই সকলের সহযোগিতায় সফলভাবে সম্পন্ন হয় মা লক্ষ্মীর আরাধনা।

গ্রামের ৩২ থেকে ৩৫টি পরিবারের এই সম্মিলিত উদ্যোগ প্রমাণ করে, কোনও বড় আয়োজনের জন্য সব সময় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় না। আন্তরিকতা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং নিজেদের ঐতিহ্যকে ধরে রাখার ইচ্ছা থাকলেই একটি উৎসবকে বছরের পর বছর বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। পশ্চিম নারায়ণপুরের এই লক্ষ্মীপুজো যেন সেই বার্তাই দেয়। অজয় নদের উত্তর পাড়ে অবস্থিত এই গ্রাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা। নদীর পারের শান্ত পরিবেশ আর গ্রামবাংলার চেনা আবহের মধ্যে লক্ষ্মীপুজোকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় এক অন্যরকম উৎসবের পরিবেশ। পুজোর দিনগুলিতে আনন্দে মেতে ওঠেন গ্রামের ছোট থেকে বড় সকলেই। আট থেকে আশি, সব বয়সের মানুষের অংশগ্রহণে পলাশ বাগান হয়ে ওঠে মিলনক্ষেত্র। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন, পরিচিত মানুষ এবং গ্রামবাসীদের একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগও তৈরি হয় এই উৎসবকে কেন্দ্র করে। গ্রামবাংলায় লক্ষ্মীপুজো মানেই সমৃদ্ধি, সুখ, শান্তি ও মঙ্গল কামনায় দেবীর আরাধনা। সেই বিশ্বাসকে সামনে রেখেই পশ্চিম নারায়ণপুরের বাসিন্দারা প্রতিবছর মা লক্ষ্মীর কাছে প্রার্থনা করেন গ্রামের মঙ্গল এবং সকলের সুখ-সমৃদ্ধির জন্য। পুজোর আয়োজনের মধ্যে দিয়ে একদিকে যেমন ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটে, অন্যদিকে তেমনই আরও দৃঢ় হয় গ্রামের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক। ব্যক্তিগত ব্যস্ততা সরিয়ে রেখে উৎসবের সময় সকলের একসঙ্গে এগিয়ে আসার ছবিই এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তবে এই লক্ষ্মীপুজোর আকর্ষণ শুধুমাত্র পুজো-অর্চনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

উৎসবকে আরও আনন্দমুখর করে তুলতে সন্ধ্যায় আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। বিশেষ করে ছোট ছোট শিশুদের অংশগ্রহণে এই অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত। শিশুদের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের মধ্যে সাংস্কৃতিক চেতনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এই উদ্যোগ। এবারের পুজোর বিশেষ আকর্ষণ পুরুলিয়ার ঐতিহ্যবাহী ছৌ নৃত্য। বাংলার লোকসংস্কৃতির অন্যতম পরিচিত এই নৃত্যশৈলীকে ঘিরে উৎসবের আনন্দে যোগ হয়েছে বাড়তি মাত্রা। ছৌ নৃত্যের নিজস্ব ভঙ্গিমা, ছন্দ এবং ঐতিহ্য দর্শকদের কাছে বরাবরই বিশেষ আকর্ষণের বিষয়। পশ্চিম নারায়ণপুরের লক্ষ্মীপুজোর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এই নৃত্য পরিবেশনের উদ্যোগ গ্রামের উৎসবকে আরও বর্ণময় করে তুলেছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি লোকসংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেওয়ার এই প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এই ধরনের আয়োজনের মধ্য দিয়ে গ্রামবাসীরা শুধু নিজেদের আনন্দ ভাগ করে নেন না, বরং পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে দেন নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিচয়। গ্রামের শিশু-কিশোরেরা কাছ থেকে দেখতে পারে বাংলার লোকশিল্পের নানা দিক। একই সঙ্গে বয়স্কদের কাছে এই উৎসব হয়ে ওঠে পুরনো স্মৃতি ফিরে দেখার উপলক্ষ। এভাবেই এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের হাতে পৌঁছে যায় পুজোর দায়িত্ব, আবেগ এবং ঐতিহ্যকে ধরে রাখার অঙ্গীকার।

আজকের দিনে যখন বহু ক্ষেত্রেই উৎসবের আয়োজন বড় বাজেট এবং বাহ্যিক জাঁকজমকের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে, তখন পশ্চিম নারায়ণপুরের পলাশ বাগানের এই লক্ষ্মীপুজো এক ভিন্ন দৃষ্টান্ত তুলে ধরছে। এখানে উৎসবের মূল শক্তি অর্থ বা আড়ম্বর নয়, বরং মানুষের আন্তরিকতা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং একে অপরের পাশে থাকার মানসিকতা। প্রায় ৫০ বছর ধরে এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার পিছনে রয়েছে গ্রামের মানুষের নিরলস প্রচেষ্টা ও গভীর আবেগ। সব মিলিয়ে, বীরভূমের ইলামবাজার ব্লকের ঘুড়িসা অঞ্চলের পশ্চিম নারায়ণপুর নেতাজি কলোনির পলাশ বাগানের লক্ষ্মীপুজো আজ গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক অনন্য পরিচয় বহন করছে। ৩২ থেকে ৩৫টি পরিবারের সম্মিলিত উদ্যোগে পাঁচ দশক ধরে চলতে থাকা এই পুজো প্রমাণ করে, মানুষের মধ্যে ঐক্য থাকলে যে কোনও ঐতিহ্যকে দীর্ঘদিন ধরে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। মা লক্ষ্মীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে তাই এখানে মিলেমিশে যায় ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকসংস্কৃতি, পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক সম্প্রীতি। অর্ধশতাব্দী পেরিয়েও এই পুজোর আবেদন আজও অমলিন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গ্রামের মানুষ যেভাবে নিজেদের উদ্যোগে এই উৎসবকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। পশ্চিম নারায়ণপুরের পলাশ বাগানের লক্ষ্মীপুজো তাই কেবল দেবী আরাধনার উৎসব নয়, বরং ঐক্য, ভালোবাসা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার এক জীবন্ত প্রতীক।