কলকাতা : দুর্গাপুজোর পাস বিক্রিকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। আর সেই অভিযোগের তদন্তে এবার প্রাক্তন মন্ত্রী তথা গায়ক ইন্দ্রনীল সেনের বাড়িতে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডির তল্লাশি। মঙ্গলবার সকাল থেকেই দক্ষিণ কলকাতার কসবার বাড়িতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকরা অভিযান শুরু করেন। একইসঙ্গে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার একাধিক ঠিকানাতেও চলে তল্লাশি। তদন্তকারীদের নজরে রয়েছেন ইন্দ্রনীল সেনের আত্মীয়স্বজন, তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি এবং ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এক ব্যবসায়ীও। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ‘মাস আর্ট’ নামে একটি সংস্থা। তদন্তকারী সূত্রের দাবি, কলকাতার দুর্গাপুজোর ‘প্রিভিউ শো’ বা পুজো পরিক্রমার নামে পাস বিক্রির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেই পাস বিক্রির প্রচারে ইউনেস্কোর নাম ও লোগো ব্যবহারের অভিযোগও সামনে এসেছে। তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৪টি দুর্গাপুজোর প্রিভিউ পাস বিক্রি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে পাসের দামের ক্ষেত্রেও কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত অঙ্কের কথা উঠে এসেছে। এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে—দুর্গাপুজোর মতো একটি সাংস্কৃতিক উৎসবকে ঘিরে কীভাবে এত বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ সামনে এল? আর সেই লেনদেনের সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন? তদন্তকারী সংস্থার দাবি, প্রাথমিকভাবে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এই অঙ্ক এখনও তদন্তাধীন এবং অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্তের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে। ইডির তল্লাশি শুধু কসবার বাড়িতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। হাইল্যান্ড পার্ক, হিন্দুস্তান পার্ক-সহ কলকাতার একাধিক জায়গায় তদন্তকারীরা পৌঁছেছেন বলে খবর। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তির বাড়িতেও তল্লাশি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি হুগলির সিঙ্গুরে ইন্দ্রনীল সেনের বাগানবাড়ি ‘মোহর’-এও তদন্তকারীরা পৌঁছেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ, অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, সংস্থা এবং আর্থিক লেনদেনের সম্ভাব্য যোগসূত্র খুঁজতেই একযোগে এই অভিযান বলে মনে করা হচ্ছে।

এই মামলার সূত্রপাত অবশ্য আজকের নয়। চলতি বছরের জুন মাসে কলকাতা পুলিশের কাছে একটি অভিযোগ দায়ের হয়। সেই অভিযোগে প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন, তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেন এবং ‘মাস আর্ট’-এর সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের নাম উঠে আসে। অভিযোগ ছিল, দুর্গাপুজোর প্রিভিউ পাস বিক্রির ক্ষেত্রে ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার করা হয়েছে এবং এই পরিচয়কে সামনে রেখে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েকটি নির্বাচিত পুজোমণ্ডপ ঘুরে দেখার জন্য বিশেষ পাস বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেই পাসের প্রচারে ইউনেস্কোর সঙ্গে সম্পর্কের কথা তুলে ধরা হয়েছিল বলে অভিযোগ। কিন্তু ওই সংস্থার সঙ্গে ইউনেস্কোর প্রকৃত সম্পর্ক কতটা ছিল, পাস বিক্রির অনুমতি কীভাবে মিলেছিল এবং সংগৃহীত অর্থ কোথায় গিয়েছিল—এই প্রশ্নগুলিই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতার দুর্গাপুজো ২০২১ সালে ইউনেস্কোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’-র তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ইউনেস্কোর নিজস্ব নথিতেও এই স্বীকৃতির উল্লেখ রয়েছে। ফলে দুর্গাপুজোর সঙ্গে ইউনেস্কোর নাম জড়িয়ে কোনও বাণিজ্যিক প্রচার বা পাস বিক্রির ক্ষেত্রে সেই নাম ও লোগো কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তকারী সূত্রের দাবি, ‘মাস আর্ট’-এর সঙ্গে ইন্দ্রনীল সেন এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্পর্ক, সংস্থার আর্থিক কাঠামো, পাস বিক্রির পদ্ধতি, টিকিট বা পাসের মূল্য, অর্থ কোন অ্যাকাউন্টে জমা পড়েছিল এবং সেই টাকা পরবর্তীতে কোথায় ব্যবহার করা হয়েছিল—এই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একইসঙ্গে সংস্থার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় রয়েছে। ইডির এই অভিযান মূলত আর্থিক লেনদেনের প্রকৃতি এবং সম্ভাব্য মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগের দিকটি খতিয়ে দেখতেই বলে জানা যাচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, তদন্তকারীরা নথিপত্র, আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড এবং ডিজিটাল তথ্যের মাধ্যমে পুরো আর্থিক চক্রটি বোঝার চেষ্টা করছেন। তবে অভিযান চলাকালীন ঠিক কী কী নথি বা সামগ্রী উদ্ধার বা বাজেয়াপ্ত হয়েছে, সে বিষয়ে এখনও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। অন্যদিকে, ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছিল। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনও সিদ্ধান্তে এখনও পৌঁছনো যায়নি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগের সত্যতা নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করাও সম্ভব নয়। এই মুহূর্তে মূল নজর তিনটি বিষয়ে—‘মাস আর্ট’-এর আর্থিক লেনদেন, ইউনেস্কোর নাম ও লোগো ব্যবহারের প্রকৃত ঘটনা এবং পাস বিক্রির মাধ্যমে সংগৃহীত বিপুল অর্থের গতিপথ। ইডির মঙ্গলবারের তল্লাশি সেই তদন্তকেই আরও এক ধাপ এগিয়ে দিল। দুর্গাপুজোর ঠিক আগে প্রাক্তন মন্ত্রীর বাড়িতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার এই অভিযান ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। তবে তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। আগামী দিনে তল্লাশি থেকে কী তথ্য সামনে আসে, কী কী নথি উদ্ধার হয় এবং তদন্তকারীরা এই আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে আর কার কার ভূমিকা খতিয়ে দেখেন—এখন সেদিকেই নজর।