বাঁকুড়া : আসন্ন দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে বাঁকুড়া শহরে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল জোরকদমে। পুজোর দিনগুলিতে যাতে কোনওরকম অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে এবং সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে প্রতিমা দর্শন করতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই শহরের বিভিন্ন পুজো কমিটির সঙ্গে সমন্বয় বৈঠকে বসল জেলা পুলিশ-প্রশাসন ও স্থানীয় বিধায়ক। পুজো উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি প্রশাসনের আধিকারিকদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিশেষ করে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ পরিষেবা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জনস্বাস্থ্য এবং সরকারি অনুমতি—প্রতিটি বিষয়কেই গুরুত্ব দেওয়া হয়। দুর্গাপুজো মানেই কয়েকদিন ধরে বাঁকুড়া শহর ও সংলগ্ন এলাকায় মানুষের ব্যাপক ভিড়। বিভিন্ন মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ঢল নামার পাশাপাশি বাড়ে যানবাহনের চাপও। ফলে পুজোর দিনগুলিতে যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত স্বাভাবিক রাখাই প্রশাসনের কাছে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই বৈঠকে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করা হয়। কোন এলাকায় যানবাহনের চাপ বেশি হতে পারে, কোথায় পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা যায় এবং প্রয়োজনে কীভাবে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে, তা নিয়েও পুজো কমিটিগুলিকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়। শুধু যান চলাচল নয়, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পায়। পুজোর দিনগুলিতে মহিলা, শিশু এবং বয়স্কদের নিরাপত্তার দিকে বিশেষ নজর রাখার আবেদন জানানো হয়। মণ্ডপ চত্বরে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখার পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরা সচল রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কোনওরকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হলে যাতে দ্রুত প্রশাসনকে খবর দেওয়া যায়, সেই ব্যবস্থাও শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে। বৈঠকে স্থানীয় বিধায়ক পুজো কমিটিগুলির উদ্দেশে রাজ্য সরকারের সমস্ত নির্দেশিকা মেনে দুর্গাপুজোর আয়োজন করার আবেদন জানান। পুজো শুধুমাত্র উৎসব নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিপুল সংখ্যক মানুষের নিরাপত্তা এবং নাগরিক পরিষেবা। তাই পুজো উদ্যোক্তাদেরও প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সমস্ত ব্যবস্থা করার আহ্বান জানানো হয়। বিশেষ করে মণ্ডপে পর্যাপ্ত আলো, প্রবেশ ও বেরোনোর পথ পরিষ্কার রাখা এবং দর্শনার্থীদের ভিড় সামলানোর ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবকদের সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। মহিলা ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও পুজো কমিটিগুলিকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। ভিড়ের মধ্যে যাতে কোনও শিশু পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে না যায়, সেদিকেও নজর রাখার কথা বলা হয়েছে। একইসঙ্গে মহিলা দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মণ্ডপ এলাকায় পর্যাপ্ত নজরদারি রাখার বার্তা দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, বাঁকুড়া জেলা পুলিশের ডিএসপি (ডিএনটি) অরুণাভ দাস বৈঠকে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও স্পষ্ট করে দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ এবং প্রচলিত নিয়ম মেনে সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করতে হবে। নিষিদ্ধ ডিজে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখতে হবে। পুজোর আনন্দের নামে যাতে শব্দদূষণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সেদিকে পুজো কমিটিগুলিকে সতর্ক থাকার বার্তা দেওয়া হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, পুজোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পরিচয়পত্রধারী স্বেচ্ছাসেবকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। মণ্ডপে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, দর্শনার্থীদের সঠিক পথে পরিচালনা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে প্রশাসনকে সহযোগিতা করার জন্য স্বেচ্ছাসেবকদের সক্রিয় থাকতে হবে। স্বেচ্ছাসেবকদের পরিচয়পত্র থাকা বাধ্যতামূলক বলেও জানানো হয়েছে। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হয় বৈঠকে। পুজো মণ্ডপ ও আশপাশের এলাকায় পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখতে হবে। বৈদ্যুতিক সংযোগ ও আলোকসজ্জার ক্ষেত্রেও যাতে কোনও ধরনের গাফিলতি না থাকে, তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। অগ্নিকাণ্ড বা অন্য কোনও জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত যাতে মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া যায়, সেই বিষয়েও পুজো কমিটিগুলিকে সতর্ক করা হয়। পুজোর সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পরিষেবা বজায় রাখার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। মণ্ডপের আলোকসজ্জা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের পরিষেবা—বিদ্যুতের কোনও সমস্যা যাতে উৎসবের আনন্দে ব্যাঘাত না ঘটায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলির সঙ্গে সমন্বয় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পানীয় জল, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার বিষয়টিও প্রশাসনের নজরে রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে সরকারি অনুমতি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পুজো আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সমস্ত সরকারি অনুমতি নিতে হবে। ‘সহজ’ পোর্টালের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অনুমতিগুলি সংগ্রহ করা বাধ্যতামূলক। ফলে শেষ মুহূর্তে কোনও জটিলতা এড়াতে পুজো উদ্যোক্তাদের আগেভাগেই সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার বার্তা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের এই সমন্বয় বৈঠকের মূল লক্ষ্য একটাই—উৎসবের আনন্দ যেন কোনওভাবেই মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গে আপস না করে। পুলিশ, প্রশাসন এবং পুজো কমিটিগুলির মধ্যে সমন্বয় যত শক্তিশালী হবে, ততই নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে শারদোৎসব। বাঁকুড়া শহরের পুজো উদ্যোক্তারাও প্রশাসনের নির্দেশিকা মেনে চলার বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। পুজোর দিনগুলিতে বিপুল মানুষের সমাগমের কথা মাথায় রেখে নিরাপত্তা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হয়েছে। অর্থাৎ, পুজোর ঢাকে কাঠি পড়ার আগেই বাঁকুড়ায় শুরু হয়ে গেল নিরাপদ শারদোৎসবের প্রস্তুতি। প্রশাসন, পুলিশ এবং পুজো উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগে এবারও যাতে উৎসবের আনন্দে কোনও ছেদ না পড়ে এবং সাধারণ মানুষ নিশ্চিন্তে পুজো উপভোগ করতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই এগোচ্ছে গোটা প্রস্তুতি।