দুর্গাপুর : দক্ষিণবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা, অর্থাৎ SBSTC-র শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, আর্থিক নিরাপত্তা এবং কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের দাবিতে দুর্গাপুরে ডেপুটেশন ও স্মারকলিপি প্রদান করল ‘দক্ষিণবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহন মজদুর সংঘ’। সোমবার BMS অনুমোদিত এই শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা দুর্গাপুরে SBSTC-র প্রধান কার্যালয়ে পৌঁছে সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টরের কাছে স্মারকলিপি জমা দেন। সংগঠনের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণবঙ্গের মানুষের পরিবহণ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে SBSTC। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীকে পরিষেবা দিতে বাস চালক, কন্ডাক্টর, মেকানিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের কর্মীরা নিজেদের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। কিন্তু এই কর্মীদের একাংশ এখনও নানা ধরনের সমস্যা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। সেই সমস্ত সমস্যার দ্রুত সমাধান এবং শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষিত করার লক্ষ্যেই এদিনের এই ডেপুটেশন। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, SBSTC-র মতো একটি ঐতিহ্যবাহী সরকারি পরিবহণ সংস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হলে প্রথমেই কর্মীদের সমস্যার সমাধান করা প্রয়োজন। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা এবং কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। এদিনের স্মারকলিপিতে মোট আট দফা দাবি তুলে ধরেছে ‘দক্ষিণবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহন মজদুর সংঘ’। সংগঠনের দাবি, এই দাবিগুলি শুধুমাত্র শ্রমিকদের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত নয়, এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে SBSTC-র পরিষেবার মান এবং ভবিষ্যৎ পরিকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়টিও। আট দফা দাবির মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি হল সমস্ত অস্থায়ী কর্মীকে অবিলম্বে স্থায়ীকরণ। সংগঠনের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে অস্থায়ী হিসেবে কাজ করে চলা কর্মীদের চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাঁদের অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের পরিষেবাকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত স্থায়ীকরণের ব্যবস্থা করা উচিত। একইসঙ্গে সংস্থায় যে সমস্ত শূন্যপদ রয়েছে, সেই পদগুলিতে স্থায়ী কর্মী নিয়োগের দাবিও জানানো হয়েছে। সংগঠনের মতে, পর্যাপ্ত সংখ্যক স্থায়ী কর্মী নিয়োগ করা হলে কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ কমবে এবং পরিষেবার ক্ষেত্রেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিও স্মারকলিপিতে রাখা হয়েছে। সংগঠনের বক্তব্য, বর্তমান সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর্মীদের বেতন কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। শ্রমিকরা দিনরাত পরিষেবা দেওয়ার পরেও যদি তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে তাঁদের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলেই দাবি সংগঠনের। এর পাশাপাশি শোষণমূলক ঠিকা প্রথা বাতিলের দাবিও জানানো হয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, যে সমস্ত কাজ বর্তমানে ঠিকা বা চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলিকে সরাসরি সরকারি বিভাগের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হোক। তাঁদের বক্তব্য, এতে কর্মীদের কাজের নিরাপত্তা এবং সুযোগ-সুবিধা আরও সুসংহত হতে পারে। একইসঙ্গে নিয়ম মেনে কর্মীদের সময়মতো পদোন্নতি দেওয়ার দাবিও জানিয়েছে শ্রমিক সংগঠন। দীর্ঘদিন ধরে একই পদে কাজ করা কর্মীদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং পরিষেবার সময়কাল বিবেচনা করে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী পদোন্নতির ব্যবস্থা করার দাবি তোলা হয়েছে। শুধু কর্মীদের বেতন বা চাকরির নিরাপত্তা নয়, SBSTC-র পরিকাঠামো এবং যাত্রী পরিষেবার উন্নয়নের বিষয়টিও স্মারকলিপিতে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সংগঠনের দাবি, পুরনো ও দীর্ঘদিন ধরে চলাচল করা বাসগুলি ধীরে ধীরে পরিবর্তন করে পর্যাপ্ত সংখ্যায় নতুন বাস রাস্তায় নামাতে হবে। কারণ পুরনো বাসের কারণে একদিকে যেমন রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যা তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে যাত্রী পরিষেবার ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই যাত্রীদের নিরাপদ এবং উন্নত পরিষেবা দিতে নতুন বাস চালুর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও সমস্ত বাস ডিপোর দ্রুত সংস্কার ও আধুনিকীকরণের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। সংগঠনের বক্তব্য, ডিপোগুলির পরিকাঠামো উন্নত হলে বাস রক্ষণাবেক্ষণ থেকে শুরু করে কর্মীদের কাজের পরিবেশ—সব ক্ষেত্রেই উন্নতি সম্ভব। একইসঙ্গে যাত্রী পরিষেবাকে আরও আধুনিক এবং জনবান্ধব করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে। এদিনের স্মারকলিপিতে আরও একটি দাবি ছিল BMS-এর সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য শ্রমিকদের বিশেষ ছুটি দেওয়া। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শ্রমিকদের সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকলে তাঁদের নিজেদের সমস্যা এবং দাবি-দাওয়া সংগঠনের মাধ্যমে আরও সুসংগঠিতভাবে কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হবে। ডেপুটেশন শেষে সংগঠনের নেতৃত্ব জানায়, SBSTC কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁরা তাঁদের দাবিগুলি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। শ্রমিকদের স্বার্থে কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবে এবং দ্রুত ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে বলেই আশা তাঁদের। সংগঠনের দাবি, শ্রমিকদের সমস্যার সমাধান হলে শুধু কর্মীরাই উপকৃত হবেন না, তার প্রভাব পড়বে গোটা পরিবহণ ব্যবস্থার ওপরও। কারণ কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ, পর্যাপ্ত জনবল এবং উন্নত পরিকাঠামো—এই সমস্ত বিষয় একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এখন দেখার, ‘দক্ষিণবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহন মজদুর সংঘ’-এর পক্ষ থেকে তুলে ধরা এই আট দফা দাবি নিয়ে SBSTC কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ করে। শ্রমিকদের দাবি পূরণের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে সংগঠনের সদস্যরা।