নদিয়া : নেপালের মানাসলু পর্বত অভিযানে মর্মান্তিক তুষারধসে প্রাণ হারালেন বাংলার পর্বতারোহী ধ্রুবজ্যোতি গুহ। মাত্র ৩৬ বছর বয়সেই থেমে গেল তাঁর পাহাড় জয়ের স্বপ্ন। নদিয়ার কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা ধ্রুবজ্যোতি পেশায় ছিলেন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। বেশ কয়েক বছর ধরে জার্মানিতে কর্মরত থাকলেও পাহাড়ের প্রতি তাঁর টান ছিল বরাবরের। একের পর এক দুর্গম শৃঙ্গ অভিযানের পর এবার তাঁর লক্ষ্য ছিল বিশ্বের অষ্টম উচ্চতম শৃঙ্গ মানাসলু জয় করা। ৮ হাজার ১৬৩ মিটার উচ্চতার এই পর্বত জয়ের উদ্দেশ্যেই নেপালে পৌঁছেছিলেন তিনি। কিন্তু সামিটের স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই ভয়াবহ তুষারধস কেড়ে নিল তাঁর প্রাণ। অভিযানে ধ্রুবজ্যোতির সঙ্গে থাকা শেরপা গাইড ফুরসেম্বারও এই দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন বলে অভিযান সূত্রে জানা গিয়েছে। অভিযান সূত্রের খবর, বেশ কয়েক দিন ধরেই মানাসলুতে আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল। প্রবল তুষারপাত এবং আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তনের কারণে সামিট রুটে তৈরি হয়েছিল ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি। ক্যাম্প-৩-এর উপরের অংশে তুষারধসের জেরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সামিট রুটের রোপ এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম। ফলে সামিটের পথে এগোনো আরও কঠিন হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেরপাদের একটি দলকে পাঠানো হয়। শুরু হয় ক্ষতিগ্রস্ত রুট সংস্কার এবং নতুন করে রোপ ফিক্সিংয়ের কাজ।

দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ১৮ সেপ্টেম্বর রোপ-ফিক্সিং দল ফের রুটটি চলাচলের উপযোগী করে তুলতে সক্ষম হয়। কিন্তু এরপরই ফের আবহাওয়ার অবনতি শুরু হয়। ঝুঁকি বাড়তে থাকায় বহু পর্বতারোহী সামিটের চেষ্টা স্থগিত রেখে নিচের ক্যাম্পে ফিরে যান। তবে দ্রুত সামিট করার লক্ষ্যে ধ্রুবজ্যোতি গুহ এবং তাঁর শেরপা গাইড ফুরসেম্বার ক্যাম্প-৩-এর দিকে এগিয়ে যান। তাঁদের লক্ষ্য ছিল অনুকূল সুযোগ পেলেই মানাসলুর চূড়ার দিকে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু পাহাড়ে আবহাওয়ার পরিস্থিতি কখন কোন দিকে মোড় নেবে, তা বলা কঠিন। শনিবার রাতে ক্যাম্প-৩-এ তাঁবুর মধ্যে থাকা অবস্থাতেই আচমকা নেমে আসে ভয়াবহ তুষারধস। মুহূর্তের মধ্যে প্রবল বরফের স্রোত আছড়ে পড়ে ক্যাম্পে। তুষারের বিপুল চাপে তাঁবু কার্যত চাপা পড়ে যায়। দুর্ঘটনার পর থেকেই ধ্রুবজ্যোতি এবং তাঁর শেরপা গাইডের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পাহাড়ের প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার অভিযান চালানোও সম্ভব হয়নি। এরপর রবিবার আবহাওয়া এবং পরিস্থিতির কিছুটা সুযোগ নিয়ে উদ্ধারকারী দল ক্যাম্প-৩-এর দিকে এগিয়ে যায়। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর প্রায় সাত ফুট বরফের নীচ থেকে উদ্ধার করা হয় ধ্রুবজ্যোতি গুহ এবং তাঁর শেরপা গাইড ফুরসেম্বারের দেহ। দুর্ঘটনার ভয়াবহতায় আরও একবার স্পষ্ট হয়ে উঠল হিমালয়ের উচ্চশৃঙ্গে পর্বতারোহণের ঝুঁকি। সামিট রুট তৈরি করা হলেও তুষারধস, তুষারপাত এবং আচমকা আবহাওয়ার পরিবর্তন যে কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, এই দুর্ঘটনা তারই নির্মম উদাহরণ।

বর্তমানে দুই পর্বতারোহীর দেহ মানাসলুর বেস ক্যাম্পে নামিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এই উদ্ধারকাজও যথেষ্ট কঠিন হয়ে উঠেছে। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে সোমবার হেলিকপ্টারে করে দেহ দু’টি নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ধ্রুবজ্যোতির দেহ তাঁর পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। ধ্রুবজ্যোতির পাহাড়ের প্রতি ভালোবাসা ছিল দীর্ঘদিনের। পেশাগত জীবনে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে জার্মানিতে কর্মরত থাকলেও অবসর পেলেই ছুটে যেতেন পাহাড়ের টানে। বিভিন্ন দুর্গম শৃঙ্গ অভিযানে অংশ নিয়ে ইতিমধ্যেই পর্বতারোহণের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন তিনি। এবার মানাসলু জয়ের লক্ষ্য নিয়ে শুরু করেছিলেন নতুন অভিযান। উচ্চতার সঙ্গে লড়াই করে চূড়ায় পৌঁছনোর সেই স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত পরিণত হল এক মর্মান্তিক ঘটনায়। অন্যদিকে, ধ্রুবজ্যোতির মৃত্যুর খবর কৃষ্ণনগরের বাড়িতে পৌঁছতেই শোকের ছায়া নেমে এসেছে পরিবার এবং এলাকায়। প্রিয়জনকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে এমন মর্মান্তিক পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না পরিচিতরাও। যে মানুষটির কাছে পাহাড় ছিল নেশা, যে মানুষটি বিশ্বের অন্যতম কঠিন শৃঙ্গ মানাসলুর চূড়ায় পৌঁছনোর স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন আর পূরণ হল না। মানাসলুর বরফের দেশে চিরতরে হারিয়ে গেলেন বাংলার এই তরুণ পর্বতারোহী ধ্রুবজ্যোতি গুহ। তাঁর মৃত্যুতে কৃষ্ণনগর থেকে বাংলার পর্বতারোহণ মহল—সব জায়গাতেই নেমে এসেছে গভীর শোক।