দুর্গাপুর : বয়স মাত্র ১০ বছর। এই বয়সে যখন অধিকাংশ শিশুর দিন কাটে স্কুল, পড়াশোনা আর খেলাধুলার মধ্যেই, তখন দুর্গাপুরের খুদে কিকবক্সার আরাধ্যা ধীবরের লক্ষ্য অনেক বড়। জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চ—একাধিক প্রতিযোগিতায় একের পর এক পদক জিতে ইতিমধ্যেই নিজের প্রতিভার পরিচয় দিয়েছে এই খুদে ক্রীড়াবিদ। আর এবার তার সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ। উজবেকিস্তানের তাশখন্দে বসতে চলেছে কিকবক্সিং বিশ্বকাপ। আর সেই বিশ্বমঞ্চেই ভারতের হয়ে লড়াই করার সুযোগ পেয়েছে দুর্গাপুরের আরাধ্যা। আগামী ১৩ অক্টোবর থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত উজবেকিস্তানের তাশখন্দে আয়োজিত হবে এই আন্তর্জাতিক কিকবক্সিং প্রতিযোগিতা। জানা গিয়েছে, বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রায় তিন হাজার প্রতিযোগী এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন। এত বড় আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাওয়া যে কোনও ক্রীড়াবিদের কাছেই গর্বের। আর সেখানে মাত্র ১০ বছর বয়সে দেশের হয়ে নামতে চলেছে দুর্গাপুরের আরাধ্যা ধীবর। ফলে পরিবার থেকে শুরু করে স্থানীয় ক্রীড়ামহল—সকলের মধ্যেই তৈরি হয়েছে উচ্ছ্বাস। তবে আরাধ্যার এই জায়গায় পৌঁছনোর পথটা একেবারেই সহজ ছিল না। ছোট বয়স থেকেই কিকবক্সিংয়ের প্রতি তার আগ্রহ। অনুশীলন, প্রতিযোগিতা আর নিয়মিত পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেছে সে। আর তারই ফল মিলেছে গত কয়েক বছরে। ২০২৪ সাল থেকে শুরু করে ২০২৫ এবং ২০২৬—টানা তিন বছর ধরে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে এই খুদে ক্রীড়াবিদ

২০২৫ সালে ওয়াকো ওপেন আন্তর্জাতিক কিকবক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে দুর্দান্ত সাফল্য পায় আরাধ্যা। ওই প্রতিযোগিতা থেকেই তার ঝুলিতে আসে তিনটি সোনা এবং একটি রুপোর পদক। আন্তর্জাতিক মঞ্চে সেই সাফল্যের পর আরও বড় সুযোগ আসে থাইল্যান্ডের বিশ্বকাপে। সেখানেও ভারতের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জোড়া সোনা জেতে দুর্গাপুরের এই খুদে কিকবক্সার। শুধু আন্তর্জাতিক স্তরেই নয়, জাতীয় স্তরেও রয়েছে তার একাধিক সাফল্য। জাতীয় প্রতিযোগিতায় রুপো এবং ব্রোঞ্জ পদক জয়ের পাশাপাশি রাজ্য, জেলা এবং দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন প্রতিযোগিতাতেও একাধিক পদক এসেছে তার ঝুলিতে। বয়স যতই কম হোক, প্রতিযোগিতার মঞ্চে আরাধ্যার আত্মবিশ্বাস কিন্তু যথেষ্ট দৃঢ়। প্রতিটি প্রতিযোগিতার সঙ্গে বাড়ছে অভিজ্ঞতা, বাড়ছে দক্ষতা। আর সেই ধারাবাহিক সাফল্যের সুবাদেই এবার তাশখন্দের বিশ্বকাপের মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে সে। কিন্তু বিশ্বকাপের আগে এখন সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থ। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে রেজিস্ট্রেশন ফি, ভিসা, বিমানভাড়া, থাকা-খাওয়া এবং প্রয়োজনীয় ক্রীড়াসামগ্রী—সব মিলিয়ে প্রয়োজন প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকা। ফেডারেশনের তরফে কিছুটা খরচ বহন করা হলেও বাকি অর্থ এখনও পুরোপুরি জোগাড় হয়নি। ফলে প্রতিভা এবং প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও বিশ্বকাপের আগে আরাধ্যার পরিবারের সামনে তৈরি হয়েছে আর্থিক অনিশ্চয়তা। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, মেয়েকে এই আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাঠানোর জন্য ইতিমধ্যেই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজ্যের ক্রীড়া দপ্তরে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। অর্থ দপ্তরের অনুমোদন পাওয়া গেলে সাহায্যের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে বলে পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে। স্থানীয় বিধায়কদেরও বিষয়টি জানানো হয়েছে। এখন পরিবারের অপেক্ষা প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তার জন্য।

এর আগেও মেয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে বড় আর্থিক চাপ নিয়েছে পরিবার। গতবার আরাধ্যাকে থাইল্যান্ডে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পাঠানোর জন্য পরিবারকে ঋণ নিতে হয়েছিল। মেয়ের প্রতিভা যাতে অর্থের অভাবে থেমে না যায়, সেই চেষ্টাই করে চলেছেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু বারবার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে যে বিপুল খরচ প্রয়োজন, তা বহন করা পরিবারের পক্ষে ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। তবুও থেমে থাকতে নারাজ আরাধ্যা। কারণ তার সামনে এখন একটাই লক্ষ্য—তাশখন্দের বিশ্বমঞ্চে দেশের হয়ে লড়াই করা। এতদিনের অনুশীলন, কঠোর পরিশ্রম এবং প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের সেরাটা দিতে চায় সে। পদক জেতার স্বপ্ন অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু তার থেকেও বড় স্বপ্ন ভারতের পতাকাকে বিশ্বমঞ্চে উঁচু করে ধরা। দুর্গাপুরের এই ছোট্ট ক্রীড়াবিদের গল্প তাই শুধু একজন প্রতিভাবান কিকবক্সারের সাফল্যের গল্প নয়। এটি স্বপ্ন, পরিশ্রম এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্প। মাত্র ১০ বছর বয়সেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে একাধিক সাফল্য অর্জন করে আরাধ্যা দেখিয়ে দিয়েছে, প্রতিভার কোনও বয়স হয় না। কিন্তু সেই প্রতিভাকে আরও বড় মঞ্চে পৌঁছে দিতে প্রয়োজন সুযোগ এবং সহযোগিতা। এখন তাই তাশখন্দের দিকে তাকিয়ে আরাধ্যা এবং তার পরিবার। একদিকে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি, অন্যদিকে অর্থ জোগাড়ের লড়াই। সময়ও খুব বেশি নেই। প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা হলে আগামী দিনে বিশ্বকাপের মঞ্চে ভারতের হয়ে লড়তে দেখা যাবে দুর্গাপুরের এই খুদে কিকবক্সারকে। আরাধ্যার স্বপ্নের দৌড় এখন তাশখন্দের পথে। সামনে বিশ্বমঞ্চ, সামনে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কিন্তু তার থেকেও বড় তার আত্মবিশ্বাস। আর সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই মাত্র ১০ বছরের এই খুদে ক্রীড়াবিদ এগিয়ে যেতে চায় দেশের পতাকা হাতে। পদকের স্বপ্ন নিয়ে, দেশের প্রতিনিধিত্বের গর্ব নিয়ে—বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের সেরাটা দেওয়ার অপেক্ষায় দুর্গাপুরের আরাধ্যা ধীবর।