পূর্ব মেদিনীপুর : সমুদ্রের বুকে একের পর এক বিশাল ঢেউ! আছড়ে পড়ছে উপকূলে। কখনও ঢেউয়ের দাপটে কেঁপে উঠছে সৈকত, আবার কখনও গার্ডওয়াল টপকে সমুদ্রের জল চলে আসছে রাস্তার ধারে। ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর প্রভাবে রাত বাড়তেই ক্রমশ ভয়ংকর হয়ে উঠল দিঘার সমুদ্র। পুরনো দিঘায় সমুদ্রের জল গার্ডওয়াল টপকে রাস্তার ধারে চলে আসতেই ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। দিঘার পাশাপাশি শঙ্করপুর, তাজপুর ও মন্দারমণির উপকূলেও দেখা গেল সমুদ্রের রুদ্ররূপ। পরিস্থিতির দিকে নজর রেখে পর্যটকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে তৎপর প্রশাসন ও পুলিশ। মঙ্গলবার বিকেল থেকেই পূর্ব মেদিনীপুর জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব পড়তে শুরু করে। কোথাও আকাশের মুখ ভার, কোথাও হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত, আবার কোথাও বইতে শুরু করে দমকা হাওয়া। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়ার পরিস্থিতি আরও প্রতিকূল হয়ে ওঠে। বিশেষ করে উপকূলবর্তী এলাকাগুলিতে সমুদ্রের পরিস্থিতি নিয়ে বাড়তে থাকে উদ্বেগ। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাসকে সামনে রেখে সতর্ক অবস্থানে থাকে প্রশাসন। রাত যত বাড়তে থাকে, ততই বদলাতে শুরু করে দিঘার সমুদ্রের চেহারা। রাত প্রায় ১১টা নাগাদ সমুদ্রের উত্তাল রূপ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সমুদ্রের বুক থেকে ধেয়ে আসতে থাকে একের পর এক বড় বড় ঢেউ। প্রবল গতিতে সেই ঢেউ আছড়ে পড়ে সৈকতে। ঢেউয়ের তীব্রতা এতটাই বেড়ে যায় যে পুরনো দিঘায় গার্ডওয়াল টপকে সমুদ্রের জল রাস্তার ধারে চলে আসে। সমুদ্রের এমন রুদ্ররূপ দেখে স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের একাংশ।

শুধু দিঘা নয়, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব পড়ে পূর্ব মেদিনীপুরের অন্যান্য উপকূলবর্তী এলাকাতেও। শঙ্করপুর, তাজপুর ও মন্দারমণির সৈকতেও বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়তে দেখা যায়। সমুদ্রের এই পরিস্থিতি ঘিরে উপকূলবর্তী এলাকায় বাড়তে থাকে সতর্কতা। পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে দিঘা, শঙ্করপুর, তাজপুর ও মন্দারমণিতে প্রতিদিনই বহু মানুষের আনাগোনা থাকে। বিশেষ করে ছুটির দিন কিংবা উৎসবের মরশুমে সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভিড় জমান পর্যটকেরা। কিন্তু আবহাওয়া প্রতিকূল হয়ে উঠলে সেই সমুদ্রই যে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, তা আরও একবার স্পষ্ট করে দিল ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর প্রভাবে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি। সমুদ্রের উত্তাল পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে আগেভাগেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রশাসন। পর্যটকদের যাতে কেউ সমুদ্রে নেমে বিপদের মুখে না পড়েন, তার জন্য দিঘার বিভিন্ন ঘাট দড়ি দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়। সৈকতে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করার পাশাপাশি পর্যটকদের গতিবিধির উপরেও নজর রাখা হয়। পুলিশকর্মীদের পাশাপাশি নুলিয়াদেরও সতর্ক রাখা হয়েছে। সমুদ্রের কাছে যাতে কেউ অসতর্কভাবে এগিয়ে না যান, সেদিকে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। প্রশাসনের তরফে উপকূলবর্তী এলাকায় দফায় দফায় মাইকিং করা হচ্ছে। মাইকের মাধ্যমে পর্যটক ও সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে দেওয়া হচ্ছে। কোনওভাবেই যাতে কেউ সমুদ্রে নামার চেষ্টা না করেন, সেই আবেদন জানানো হচ্ছে বারবার। সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা ও গতির পরিবর্তন কখন বিপজ্জনক হয়ে উঠবে, তা আগে থেকে অনুমান করা কঠিন। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সমুদ্রের কাছাকাছি না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে সৈকতে ঘোরাফেরা করার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের আবেদন জানানো হয়েছে।

প্রতিকূল আবহাওয়ার সময় সমুদ্রের সৌন্দর্য দেখতে গিয়ে অনেকেই বিপদের ঝুঁকি নিয়ে ফেলেন। কিন্তু উত্তাল সমুদ্রে আচমকা বড় ঢেউ আছড়ে পড়লে মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সমুদ্রের জল গার্ডওয়াল টপকে উঠে আসার ঘটনা সেই বিপদের আশঙ্কাকেই আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করে সমুদ্রে নামা কিংবা নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকার আবেদন জানানো হচ্ছে। অন্যদিকে, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে আবহাওয়ার পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেদিকেও নজর রাখছে প্রশাসন ও পুলিশ। পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। উপকূলবর্তী এলাকায় নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং পর্যটকদের সুরক্ষিত রাখাই এখন প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য। সব মিলিয়ে, ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর প্রভাবে দিঘা-সহ পূর্ব মেদিনীপুরের উপকূলবর্তী এলাকায় তৈরি হয়েছে সতর্কতামূলক পরিস্থিতি। একদিকে সমুদ্রের উত্তাল রূপ, অন্যদিকে গার্ডওয়াল টপকে রাস্তায় জল চলে আসার ঘটনা ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে লাগাতার নজরদারি ও মাইকিং চালানো হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পর্যটকদের সতর্ক থাকার এবং কোনওভাবেই সমুদ্রে না নামার আবেদন জানানো হয়েছে। এখন সকলের নজর, আবহাওয়ার পরিস্থিতি কোন দিকে যায় এবং কখন ফের শান্ত হয় দিঘার উত্তাল সমুদ্র।