পাণ্ডবেশ্বর : অন্ধকার খনির গভীরে মৃত্যুভয়, আর খনির মুখে উৎকণ্ঠায় প্রহর গুনছেন পরিবারের সদস্যরা। সময় যত গড়িয়েছে, ততই বেড়েছে উদ্বেগ। অবশেষে দীর্ঘ ১২ ঘণ্টার উৎকণ্ঠার অবসান! মঙ্গলবার ভোর ৫টা নাগাদ কুমারডিহি-এ কোলিয়ারির প্রায় ২০০ ফুট গভীরে আটকে পড়া ১২ জন ECL শ্রমিককে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হল। শ্রমিকদের নিরাপদে উপরে তুলে আনার পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। একই সঙ্গে এই উদ্ধার অভিযানে সারারাত ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে পরিস্থিতির উপর নজর রাখলেন পাণ্ডবেশ্বরের বিধায়ক জিতেন্দ্র তিওয়ারি। বিপদের মুহূর্তে শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়ে উদ্ধারকাজের প্রতিটি পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন তিনি। ঘটনাটি ঘটে সোমবার সন্ধ্যায়। জানা গিয়েছে, সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটা নাগাদ কুমারডিহি-এ কোলিয়ারিতে কয়লা খনির ভিতরে শ্রমিকদের ওঠানামার জন্য ব্যবহৃত ডুলির রশি ইঞ্জিন ঘরের ড্রামে আটকে যায়। এর জেরেই মাঝপথে আটকে পড়ে ডুলিটি। সেই সময় ডুলির ভিতরে ছিলেন ১২ জন ECL শ্রমিক। খনির প্রায় ২০০ ফুট গভীরে আটকে পড়ায় স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয় চরম উদ্বেগ। গভীর খনির ভিতরে আটকে থাকা শ্রমিকদের নিরাপদে বের করে আনা তখন উদ্ধারকারী দলের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। প্রথমে বিষয়টি যান্ত্রিক সমস্যার কারণে ঘটেছে বলে জানা গেলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির গুরুত্ব বাড়তে থাকে। খনির ভিতরে আটকে থাকা শ্রমিকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তাঁদের সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যরা। খনির মুখে অপেক্ষা করতে থাকেন প্রিয়জনেরা। কখন উদ্ধারকাজ শুরু হবে, কীভাবে শ্রমিকদের উপরে তুলে আনা হবে, আদৌ সবাইকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হবে কি না—এমন একাধিক প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে তাঁদের মনে।

এই পরিস্থিতিতে খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান পাণ্ডবেশ্বরের বিধায়ক জিতেন্দ্র তিওয়ারি। শুধু ঘটনাস্থলে উপস্থিত হওয়াই নয়, সারারাত সেখানে থেকে উদ্ধার অভিযানের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন তিনি। ECL-এর আধিকারিক, কোলিয়ারি কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন এবং পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে পরিস্থিতির উপর নজর রাখেন বিধায়ক। আটকে পড়া শ্রমিকদের দ্রুত ও নিরাপদে উদ্ধার করাই তখন ছিল প্রধান লক্ষ্য। রাত যত গভীর হয়েছে, ততই বেড়েছে অপেক্ষার চাপ। একদিকে খনির ভিতরে আটকে থাকা ১২ জন শ্রমিকের নিরাপত্তা, অন্যদিকে বাইরে তাঁদের পরিবারের সদস্যদের উদ্বেগ—সব মিলিয়ে কোলিয়ারি চত্বরে তৈরি হয় টানটান পরিস্থিতি। উদ্ধারকাজে কোনও রকম ঝুঁকি না নিয়ে কীভাবে যান্ত্রিক সমস্যার সমাধান করা যায়, তা নিয়ে উদ্যোগী হন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকেরা। সূত্রের খবর, উদ্ধার অভিযানের প্রাথমিক প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ডুলির রশি ইঞ্জিন ঘরের ড্রামে আটকে যাওয়ায় যান্ত্রিক ত্রুটি কাটিয়ে শ্রমিকদের উপরে তোলার ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়তে হয় উদ্ধারকারী দলকে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞ দল আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর ড্রামের যান্ত্রিক সমস্যা মেরামতের কাজ শুরু হয়। দীর্ঘ চেষ্টার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে ফের উদ্ধার অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

এই পুরো সময়টাই ঘটনাস্থলে ছিলেন বিধায়ক জিতেন্দ্র তিওয়ারি। ECL কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় রেখে উদ্ধারকাজের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নেন তিনি। শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও যাতে অযথা আতঙ্ক না ছড়ায়, সেই পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হয়। রাতভর অপেক্ষা, উদ্বেগ এবং অনিশ্চয়তার মধ্যেও উদ্ধারকারী দলের লক্ষ্য ছিল একটাই—আটকে পড়া প্রত্যেক শ্রমিককে জীবিত অবস্থায় নিরাপদে উপরে তুলে আনা। অবশেষে আসে সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। মঙ্গলবার ভোর ৫টা নাগাদ কুমারডিহি-এ কোলিয়ারির প্রায় ২০০ ফুট গভীর থেকে একে একে ১২ জন শ্রমিককে উপরে তুলে আনা সম্ভব হয়। দীর্ঘ রাতের উৎকণ্ঠার পর তাঁদের জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা যাওয়ায় স্বস্তি ফিরে আসে কোলিয়ারি চত্বরে। পরিবারের সদস্যদের দুশ্চিন্তার অবসান ঘটে। যে আশঙ্কা নিয়ে তাঁরা রাতভর অপেক্ষা করেছিলেন, শ্রমিকদের নিরাপদে ফিরে আসার খবরে সেই উদ্বেগ অনেকটাই কেটে যায়।

এই উদ্ধার অভিযান ঘিরে কুমারডিহি-এ কোলিয়ারিতে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি আরও একবার কয়লা খনিতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা এবং রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্ব সামনে নিয়ে এল। শ্রমিকদের যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত ডুলি ও তার সঙ্গে যুক্ত যন্ত্রাংশের সামান্য ত্রুটিও কীভাবে বড়সড় বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে, এই ঘটনাই তার উদাহরণ। কয়লাখনির মতো ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত যন্ত্রপাতি পরীক্ষা, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আপাতত সবচেয়ে বড় স্বস্তি, দীর্ঘ সময় খনির গভীরে আটকে থাকার পর ১২ জন শ্রমিককেই জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ধার অভিযানের সময় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, পুলিশ এবং কোলিয়ারি কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ের বিষয়টিও সামনে এসেছে। কিন্তু উদ্ধার অভিযান সফল হলেই কি দায়িত্ব শেষ? এই প্রশ্নও উঠছে। ঠিক কী কারণে ডুলির রশি ইঞ্জিন ঘরের ড্রামে আটকে গেল, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণে কোনও গাফিলতি ছিল কি না এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পাশাপাশি খনির নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা এবং শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি উঠতে পারে। দীর্ঘ ১২ ঘণ্টার উৎকণ্ঠার পর কুমারডিহি-এ কোলিয়ারিতে ফিরেছে স্বস্তি। মৃত্যুভয়ের আশঙ্কা কাটিয়ে পরিবারের কাছে ফিরেছেন ১২ জন শ্রমিক। আর এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আরও একবার স্পষ্ট হয়ে গেল, কয়লাখনির মতো বিপজ্জনক কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।