কাঁকসা : দুর্গাপুরের কাঁকসার অযোধ্যা গ্রামে একটি প্রাচীন পারিবারিক মন্দির থেকে তিনশো বছরেরও বেশি সময় ধরে পূজিত নারায়ণ শিলা উধাও হওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে মুখার্জি পরিবার। একইসঙ্গে, প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত এই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। কীভাবে মন্দির থেকে উধাও হয়ে গেল শতাব্দীপ্রাচীন নারায়ণ শিলা? কে বা কারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত? এই সমস্ত প্রশ্নকে ঘিরেই এখন চর্চা শুরু হয়েছে এলাকায়। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কাঁকসার অযোধ্যা গ্রামের বাসিন্দা পবিত্র মুখার্জির বাড়ির পারিবারিক মন্দিরে দীর্ঘ তিনশো বছরেরও বেশি সময় ধরে পূজিত হয়ে আসছে এই নারায়ণ শিলা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিবারের সদস্যরা নিষ্ঠার সঙ্গে এই শিলার পুজো করে আসছেন। পরিবারের কাছে এটি শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উপকরণ নয়, বরং দীর্ঘদিনের পারিবারিক ঐতিহ্য, বিশ্বাস এবং আধ্যাত্মিক অনুভূতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। সেই নারায়ণ শিলারই হদিশ না মেলায় স্বাভাবিকভাবেই ভেঙে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা। পরিবারের দাবি, প্রতিদিনের মতোই এদিন সকালে নিত্যপুজোর প্রস্তুতি নিতে মন্দিরে যান তাঁরা। কিন্তু মন্দিরের নির্দিষ্ট আসনে গিয়ে নারায়ণ শিলাটি দেখতে পাননি পরিবারের সদস্যরা। প্রথমে বিষয়টি তাঁদের নজরে আসে। এরপর মন্দিরের আশপাশে এবং বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। পরিবারের সদস্যরা নিজেদের মতো করে তল্লাশি চালালেও শেষ পর্যন্ত নারায়ণ শিলার কোনও সন্ধান মেলেনি বলেই অভিযোগ।

এরপরই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে মুখার্জি পরিবারের মধ্যে। দীর্ঘ তিনশো বছরেরও বেশি সময় ধরে যে শিলা তাঁদের পারিবারিক মন্দিরে পূজিত হয়ে আসছে, সেটি কীভাবে উধাও হয়ে গেল, তা বুঝে উঠতে পারছেন না তাঁরা। মন্দিরের নির্দিষ্ট আসন থেকে শিলাটি কীভাবে সরানো হল, আদৌ কেউ সেটি নিয়ে গিয়েছে কি না, নাকি এর পিছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্ন। পরিবারের সদস্য পবিত্র মুখার্জির দাবি, এর আগেও তাঁদের বাড়ির মন্দির থেকে একটি শঙ্খ উধাও হয়ে গিয়েছিল। সেই ঘটনার পর এবার প্রাচীন নারায়ণ শিলার খোঁজ না মেলায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। একই পরিবারের মন্দির থেকে পরপর পুজোর সামগ্রী উধাও হওয়ার অভিযোগ সামনে আসায় ঘটনাটিকে আর হালকাভাবে দেখতে পারছেন না পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের আশঙ্কা, পরিকল্পিতভাবে কেউ এই ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। যদিও কে বা কারা এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত করে কিছু জানাতে পারেনি পরিবার। নারায়ণ শিলার মতো প্রাচীন ধর্মীয় স্মারকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘদিনের বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান এবং পারিবারিক ইতিহাস। মুখার্জি পরিবারের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। বছরের পর বছর ধরে যে শিলাকে সামনে রেখে পরিবারের সদস্যরা পুজো করে এসেছেন, তার হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া তাঁদের কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক। পরিবারের দাবি, এই শিলা তাঁদের কাছে অমূল্য। এর ধর্মীয় এবং ঐতিহ্যগত গুরুত্ব কোনও অর্থমূল্য দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়।

ঘটনাটি সামনে আসার পর পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশ প্রশাসনের দ্বারস্থ হওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ই-মেলের মাধ্যমে পুলিশ আধিকারিকদের কাছে লিখিত অভিযোগ জানানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। পরিবারের তরফে ঘটনার যথাযথ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি, নিখোঁজ নারায়ণ শিলাটি দ্রুত উদ্ধার করে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করার আবেদন জানিয়েছেন তাঁরা। এই ঘটনার পিছনে যদি কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর যোগসূত্র থেকে থাকে, তাহলে তদন্তের মাধ্যমে তাদের চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করার দাবিও তুলেছে মুখার্জি পরিবার। অন্যদিকে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গ্রামের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, একটি প্রাচীন পারিবারিক মন্দির থেকে পুজোর সামগ্রী উধাও হওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষ করে, এর আগেও একই মন্দির থেকে একটি শঙ্খ হারিয়ে যাওয়ার অভিযোগ থাকায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা। গ্রামাঞ্চলের বাড়িতে থাকা প্রাচীন ধর্মীয় সামগ্রী ও ঐতিহ্যবাহী সম্পদ কতটা সুরক্ষিত, সেই প্রশ্নও উঠছে এই ঘটনাকে ঘিরে। তবে এই ঘটনার পিছনে ঠিক কী কারণ রয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। নারায়ণ শিলাটি চুরি করা হয়েছে কি না, কিংবা অন্য কোনওভাবে সেটি হারিয়ে গিয়েছে কি না, তা তদন্তের বিষয়। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ কী পদক্ষেপ করে এবং নিখোঁজ শিলার সন্ধান পাওয়া যায় কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন পরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে গ্রামের বাসিন্দারা। তিনশো বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা ধর্মীয় ঐতিহ্য কি ফিরে পাবে মুখার্জি পরিবার? প্রাচীন এই নারায়ণ শিলার হদিশ কি মিলবে? সেই উত্তর এখনও অজানা। আপাতত পরিবারের একটাই দাবি—দ্রুত ঘটনার তদন্ত হোক, উদ্ধার করা হোক ঐতিহ্যবাহী নারায়ণ শিলা এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।