দুর্গাপুর : বয়স মাত্র ১০ বছর ! যে বয়সে অধিকাংশ শিশুর সময় কাটে পড়াশোনা, খেলাধুলা আর বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দে, সেই বয়সেই আন্তর্জাতিক ক্রীড়ামঞ্চে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখল দুর্গাপুরের খুদে কিকবক্সার আরাধ্যা ধীবর। উজবেকিস্তানের তাসখন্দে অনুষ্ঠিত কিকবক্সিং বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে একের পর এক লড়াইয়ে নজরকাড়া পারফরম্যান্স। আর তারই স্বীকৃতি হিসেবে একটি স্বর্ণ, একটি রৌপ্য এবং দুটি ব্রোঞ্জ-সহ মোট চারটি পদক জিতে দেশের মুখ উজ্জ্বল করল বাংলার এই সোনার মেয়ে। আরাধ্যার এই সাফল্যে গর্বিত তার পরিবার, কোচ, দুর্গাপুরের ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ এবং গোটা বাংলা। আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরাধ্যার এই সাফল্য যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা যায় প্রতিযোগিতার ব্যাপ্তি দেখলেই। বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশের ৩০৪৩ জন প্রতিযোগীকে নিয়ে আয়োজিত হয় এই কিকবক্সিং বিশ্বকাপ। বিভিন্ন দেশের দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রতিযোগীদের সঙ্গে একই মঞ্চে লড়াই করার সুযোগ পায় ভারতের খেলোয়াড়রাও। এই প্রতিযোগিতায় ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করেন মোট ১৯ জন খেলোয়াড়। আর বাংলার হয়ে সুযোগ পায় মাত্র দু’জন। তাঁদেরই একজন দুর্গাপুরের আরাধ্যা ধীবর। এত অল্প বয়সে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া, তার উপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীদের মোকাবিলা করা—সবটাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু বয়সকে বাধা হতে দেয়নি আরাধ্যা। রাশিয়া, ইতালি, চিন, ব্রাজিল, জার্মানি-সহ একাধিক দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে লড়াই করে নিজের দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসের পরিচয় দিয়েছে সে। ছয়টি ইভেন্টে অংশ নিয়ে চারটি পদক জয় নিঃসন্দেহে তার ক্রীড়াজীবনের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। একটি স্বর্ণপদক, একটি রৌপ্যপদক এবং দুটি ব্রোঞ্জপদক—এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বাংলার ক্রীড়াক্ষেত্রের কাছেও এক বড় প্রাপ্তি।

তবে পদক জয়ের এই আনন্দের পিছনে রয়েছে দীর্ঘ অনুশীলন, কঠোর পরিশ্রম এবং একাধিক বাধা অতিক্রম করার কাহিনি। আন্তর্জাতিক স্তরের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া মানেই শুধু খেলায় দক্ষতা থাকলেই চলে না। বিদেশে যাওয়ার বিমানভাড়া, প্রতিযোগিতার রেজিস্ট্রেশন ফি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচের ব্যবস্থা করাও বড় চ্যালেঞ্জ। আরাধ্যার পরিবারের কাছেও সেই আর্থিক ব্যবস্থা করা সহজ ছিল না। মেয়ের প্রতিভা এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের হয়ে লড়াই করার স্বপ্ন থাকলেও, প্রয়োজনীয় অর্থের জোগাড় নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হয় পরিবারকে। কিন্তু আরাধ্যার স্বপ্নকে থেমে যেতে দেয়নি শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতা। তার স্কুল, কয়েকটি সংস্থা এবং সমাজসেবী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ফলেই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার পথ তৈরি হয়। একাধিক মানুষের সহযোগিতায় বিদেশের মাটিতে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পায় দুর্গাপুরের এই খুদে খেলোয়াড়। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই চারটি পদক জিতে ফিরেছে আরাধ্যা। ফলে তার এই সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শুধু নিজের পরিশ্রম নয়, বরং বহু মানুষের সহযোগিতা ও উৎসাহও। আরাধ্যার এই সাফল্যের নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে তার কোচ ঈশ্বর মাঝির। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, কৌশলগত অনুশীলন এবং প্রতিযোগিতার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তোলার ক্ষেত্রে কোচের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আরাধ্যার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কোচের বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং আরাধ্যার কঠোর অনুশীলনই আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্য পাওয়ার অন্যতম চাবিকাঠি বলে জানিয়েছেন কোচ। অল্প বয়স থেকেই খেলাটির প্রতি আরাধ্যার আগ্রহ, নিয়মিত অনুশীলন এবং লড়াই করার মানসিকতা তাকে এই জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।

দুর্গাপুরের এ-জোনের বাসিন্দা আরাধ্যার বাবা চিরঞ্জিত ধীবর এবং মা কাকলি ধীবর মেয়ের এই সাফল্যে স্বাভাবিকভাবেই গর্বিত। সন্তানের স্বপ্ন পূরণ করতে বাবা-মায়ের ভূমিকা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, আরাধ্যার ক্রীড়াযাত্রা তারই উদাহরণ। তবে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার খরচ এবং ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নিয়ে চিন্তা রয়েছে পরিবারের। কারণ, একটি বিশ্বকাপে চারটি পদক জেতার পর আরাধ্যার সামনে খুলে গিয়েছে আরও বড় স্বপ্নের দরজা। আগামী দিনে আরও উন্নত প্রশিক্ষণ, উপযুক্ত পরিকাঠামো এবং আর্থিক সহযোগিতা পেলে সে আরও বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবে বলেই আশা পরিবারের। আরাধ্যার বাবা চিরঞ্জিত ধীবরের আবেদন, আগামী দিনে বড় সংস্থাগুলির কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি বা সিএসআর প্রকল্পের মাধ্যমে সহযোগিতা এবং রাজ্য সরকারের সহায়তা পেলে মেয়ের ক্রীড়াজীবন আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। বিশেষ করে ওয়ার্ল্ড গেমস এবং এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের মতো বড় মঞ্চে অংশ নেওয়ার স্বপ্ন রয়েছে আরাধ্যার। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে প্রয়োজন ধারাবাহিক আর্থিক সহায়তা, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ। খেলাধুলায় প্রতিভা থাকলেও অনেক সময় আর্থিক প্রতিবন্ধকতা তরুণ খেলোয়াড়দের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রশিক্ষণ নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে পরিবারকে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। আরাধ্যার অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। তার মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের পাশে যদি সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা এগিয়ে আসে, তাহলে আগামী দিনে আরও অনেক খুদে ক্রীড়াবিদ আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেতে পারে।

উল্লেখ্য, তাসখন্দে বিশ্বকাপ শুরুর আগেই কেন্দ্রীয় ক্রীড়া ও যুবকল্যাণমন্ত্রী মনসুখ মাণ্ডব্য ফোনে আরাধ্যাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। দেশের হয়ে পদক জয়ের জন্য তাকে উৎসাহও দেন তিনি। মন্ত্রীর সেই শুভেচ্ছা আরাধ্যার কাছে বাড়তি অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিল বলে মনে করা হচ্ছে। আর বিশ্বকাপের মঞ্চে চারটি পদক জিতে সেই প্রত্যাশারই মর্যাদা রেখেছে দুর্গাপুরের এই খুদে কিকবক্সার।মাত্র ১০ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক মঞ্চে চারটি পদক জয় নিঃসন্দেহে এক অনন্য কৃতিত্ব। তবে আরাধ্যার এই সাফল্যকে ভবিষ্যতের আরও বড় অর্জনের সূচনা হিসেবেই দেখছেন ক্রীড়াপ্রেমীরা। আজ বিশ্বকাপের মঞ্চে পদক জয়, আগামী দিনে আরও বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশের প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজন ধারাবাহিক অনুশীলন, পরিবারের পাশে থাকার পাশাপাশি সমাজ, প্রশাসন এবং ক্রীড়া সংস্থাগুলির সহযোগিতা। দুর্গাপুরের এ-জোন থেকে তাসখন্দের আন্তর্জাতিক ক্রীড়ামঞ্চ—আরাধ্যার এই যাত্রা প্রমাণ করে, বয়স প্রতিভার পথে বাধা হতে পারে না। সুযোগ এবং সঠিক প্রশিক্ষণ পেলে ছোটরাও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে। চারটি পদক হাতে নিয়ে বাংলার এই খুদে কিকবক্সার আজ হাজারো শিশুর কাছে অনুপ্রেরণা। আরাধ্যার এই সাফল্যে গর্বিত দুর্গাপুর, গর্বিত বাংলা, গর্বিত দেশ। এখন সকলের প্রত্যাশা, উপযুক্ত সহযোগিতা পেয়ে আগামী দিনেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে আরাধ্যা ধীবর।