পূর্ব বর্ধমান : শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনা। তারই মাঝে আচমকা বৃষ্টি। কখনও আকাশ পরিষ্কার, আবার কখনও মেঘের ঘনঘটা। আবহাওয়ার এই খামখেয়ালিপনার মধ্যেও উৎসবের আনন্দে কোনও খামতি নেই। মহাসপ্তমীর সকালে বৃষ্টিকে উপেক্ষা করেই প্রতিমা দর্শনে পথে নামলেন অগণিত মানুষ। নতুন পোশাক, হাতে ছাতা আর চোখেমুখে উৎসবের উচ্ছ্বাস নিয়ে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে পুজো মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেল দর্শনার্থীদের। শনিবার সকাল থেকেই পূর্ব বর্ধমান জেলার বিভিন্ন পুজো মণ্ডপ, গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা এবং জনবহুল এলাকায় চোখে পড়ল মানুষের ভিড়। আবহাওয়ার প্রতিকূলতা যেন উৎসবের আনন্দকে আরও রঙিন করে তুলেছে। দুর্গাপুজো মানেই বাঙালির আবেগ, ভালোবাসা এবং বছরের সেরা কয়েকটি আনন্দের দিনের অপেক্ষা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেবী দুর্গার আগমনে চারদিকে এখন উৎসবের আবহ। ষষ্ঠীর পর মহাসপ্তমী থেকেই পুজো মণ্ডপগুলিতে দর্শনার্থীদের ভিড় আরও বাড়তে শুরু করেছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রতিমা দর্শন, মণ্ডপের সাজসজ্জা উপভোগ এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো—এই নিয়েই মেতে উঠেছেন আট থেকে আশি সকলেই। কিন্তু উৎসবের এই আনন্দের মাঝেই আবহাওয়ার পরিবর্তন কিছুটা চিন্তা বাড়িয়েছে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পুজো উদ্যোক্তাদের। পুজোর আগে বেশ কয়েক দিন ধরে বৃষ্টির দাপটে উদ্বেগে ছিলেন জেলার মানুষ। কোথাও আকাশ কালো করে বৃষ্টি, কোথাও আবার দীর্ঘক্ষণ ধরে বৃষ্টির জেরে রাস্তাঘাট ভিজে যাওয়া—সব মিলিয়ে পুজোর প্রস্তুতি নিয়ে চিন্তায় পড়েছিলেন উদ্যোক্তারা। মণ্ডপ নির্মাণ, আলোকসজ্জা, প্রতিমা সাজানো এবং দর্শনার্থীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা ঠিক রাখতে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁদের। তবে পুজোর আগে আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করায় কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছিল। উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, সকলেই আশা করেছিলেন যে পুজোর দিনগুলিতে আবহাওয়া অনুকূলে থাকবে।

কিন্তু মহাসপ্তমীর সকালে ফের বদলে গেল আবহাওয়ার মেজাজ। সকাল হতেই আচমকা বৃষ্টিতে ভিজল পূর্ব বর্ধমানের বিভিন্ন এলাকা। কিছুক্ষণ বৃষ্টির তীব্রতা কমলেও আকাশের মুখ ভার থাকায় বৃষ্টির আশঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি। ফলে মণ্ডপে বেরোনোর আগে অনেককেই আবহাওয়ার দিকে নজর রাখতে দেখা যায়। কেউ হাতে ছাতা নিয়ে বেরিয়েছেন, কেউ আবার বৃষ্টি থামার অপেক্ষা না করেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পুজো দেখতে পথে নেমেছেন। তবে বৃষ্টির কারণে কোথাও কোথাও দর্শনার্থীদের চলাফেরায় সাময়িক অসুবিধা তৈরি হলেও উৎসবের আনন্দে তার বিশেষ প্রভাব পড়েনি। মহাসপ্তমীর সকালে পুজো মণ্ডপগুলিতে ছিল নানা বয়সের মানুষের উপস্থিতি। ছোটদের নতুন পোশাক, তরুণ-তরুণীদের উচ্ছ্বাস, প্রবীণদের প্রতিমা দর্শন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একসঙ্গে সময় কাটানোর ছবি ধরা পড়েছে বিভিন্ন এলাকায়। বৃষ্টির ফোঁটা মাথায় নিয়েও কেউ প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে প্রণাম করছেন, কেউ আবার মণ্ডপের শিল্পকলা ও আলোকসজ্জা উপভোগ করছেন। পুজোর এই কয়েকটি দিনেই পরিচিত মানুষদের সঙ্গে দেখা হওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পান অনেকে। তাই আবহাওয়া কিছুটা বাধা সৃষ্টি করলেও বাড়িতে বসে থাকতে নারাজ উৎসবপ্রেমী বাঙালি। বিশেষ করে মহাসপ্তমীর সকাল থেকেই মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে প্রতিমা দর্শনের আলাদা আনন্দ উপভোগ করছেন দর্শনার্থীরা। কোথাও সাবেকি সাজে সজ্জিত মণ্ডপ, কোথাও আবার আধুনিক শিল্পকলার ছোঁয়া। প্রতিটি মণ্ডপের নিজস্ব আকর্ষণ দেখতে ভিড় জমাচ্ছেন মানুষ। পুজো উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে তৈরি মণ্ডপ এবং প্রতিমার সৌন্দর্য উপভোগ করতেই অনেকে সকাল সকাল বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছেন। বৃষ্টির কারণে আকাশে রোদের দেখা না মিললেও মণ্ডপের আলো, প্রতিমার সাজ এবং মানুষের উচ্ছ্বাসে উৎসবের পরিবেশ ছিল যথেষ্ট প্রাণবন্ত।

অন্যদিকে, আবহাওয়ার পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখে দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দিকে নজর দিয়েছেন পুজো উদ্যোক্তারা। বৃষ্টি হলে যাতে মানুষ কিছুটা আশ্রয় পান, তার জন্য মণ্ডপ চত্বরে শেড বা ছাউনির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের নিরাপদে যাতায়াত, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং মণ্ডপের আশপাশের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বৃষ্টির জেরে কোথাও যাতে জল জমে চলাচলে সমস্যা না হয়, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি হয়ে উঠেছে। উৎসবের দিনগুলিতে মানুষের ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবস্থাগুলির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তবে শুধু বৃষ্টি নয়, পুজোর দিনগুলিতে ভিড় সামলানোও প্রশাসন ও উদ্যোক্তাদের কাছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিমা দর্শনের জন্য একসঙ্গে বহু মানুষ রাস্তায় নামায় গুরুত্বপূর্ণ মোড় এবং মণ্ডপ সংলগ্ন এলাকায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে বেরোনো দর্শনার্থী, শিশু এবং প্রবীণদের নিরাপত্তার দিকে নজর রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৃষ্টির ফলে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় সাবধানে চলাফেরা করারও প্রয়োজন রয়েছে। তাই উৎসবের আনন্দ উপভোগ করার পাশাপাশি দর্শনার্থীদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আবহাওয়ার এই অনিশ্চয়তার মধ্যে সাধারণ মানুষের একটাই আশা, পুজোর বাকি দিনগুলিতে যেন আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে থাকে। কারণ দুর্গাপুজো শুধু প্রতিমা দর্শনের উৎসব নয়, এটি বাঙালির সামাজিক মিলন, আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এবং পুরনো স্মৃতিকে নতুন করে ফিরে পাওয়ার সময়। সারা বছরের ব্যস্ততার মাঝে এই কয়েকটি দিন মানুষ নিজের মতো করে উপভোগ করতে চান। আর সেই আনন্দে সামান্য বৃষ্টি বাধা হয়ে দাঁড়ালেও উৎসবের টান যে অনেক বেশি, মহাসপ্তমীর সকালেই তার প্রমাণ মিলেছে পূর্ব বর্ধমানে। সব মিলিয়ে, শরতের আকাশে মেঘের আনাগোনা আর মাঝেমধ্যে বৃষ্টির ভ্রুকুটি—কোনও কিছুই থামাতে পারেনি পুজোর উন্মাদনাকে। মাথায় ছাতা, পায়ে নতুন জুতো আর মুখে হাসি নিয়ে প্রতিমা দর্শনে বেরিয়ে পড়েছেন জেলার মানুষ। পুজো মণ্ডপগুলিতে উপচে পড়া ভিড় বুঝিয়ে দিচ্ছে, আবহাওয়া যেমনই হোক, উৎসবের আনন্দে ভাটা পড়ার নয়। মহাসপ্তমীর বৃষ্টিভেজা সকাল তাই পূর্ব বর্ধমানের মানুষের কাছে হয়ে উঠেছে আনন্দ, আবেগ এবং উৎসবের এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। এখন সকলের নজর পুজোর পরবর্তী দিনগুলির আবহাওয়ার দিকে। আকাশের মুখ ভার থাকলেও বাঙালির মন যে উৎসবের রঙে রঙিন, মহাসপ্তমীর সকালজুড়েই তার ছবি ধরা পড়ল পূর্ব বর্ধমানের বিভিন্ন প্রান্তে।