দুর্গাপুর : দুর্গাপুজোর আনন্দের মাঝেই পার্কিং ফি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শিল্পাঞ্চলজুড়ে। সাইকেল স্ট্যান্ড থেকে শুরু করে দু’চাকা ও চার চাকার গাড়ি পার্কিং—বিভিন্ন জায়গায় নির্ধারিত হারের তুলনায় অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠছে। কোথাও চার চাকার গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য ৫০ টাকা, কোথাও ৭০ টাকা বা তারও বেশি দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ দর্শনার্থীদের। শুধু গাড়ি পার্কিং নয়, সাইকেল স্ট্যান্ড এবং অন্যান্য পার্কিং এলাকাতেও নির্ধারিত হারের বাইরে টাকা চাওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। আর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই দুর্গাপুর-আসানসোল শিল্পাঞ্চলের সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ। পুজোর সময় প্রতিদিনই বিভিন্ন মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ছে। পরিবার-পরিজনকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিমা দর্শনে বেরিয়ে অনেকেই নিজেদের গাড়ি নিয়ে বিভিন্ন পুজোমণ্ডপে পৌঁছচ্ছেন। কিন্তু অভিযোগ, পুজো দেখতে যাওয়ার আগে পার্কিং ফি নিয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাঁদের। কোথাও গাড়ি রাখার জন্য নির্ধারিত হারের তুলনায় অনেক বেশি টাকা চাওয়া হচ্ছে বলে দাবি করছেন দর্শনার্থীদের একাংশ। ফলে পুজোর আনন্দের মধ্যেই বাড়তি খরচের বোঝা চাপছে সাধারণ মানুষের উপর। এই পরিস্থিতিতে পার্কিং ফি নিয়ে ক্ষোভ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে সোশ্যাল মিডিয়াতেও। একের পর এক পোস্টে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছেন সাধারণ মানুষ। কোথায় কত টাকা নেওয়া হচ্ছে, কোন পার্কিং এলাকায় অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হচ্ছে—সেই সমস্ত বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন নেটিজেনদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, পুজোর সময় মানুষের ভিড়কে কাজে লাগিয়ে যদি কেউ ইচ্ছামতো পার্কিং ফি আদায় করেন, তাহলে তা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী পার্কিং ফি নেওয়া এবং সাধারণ মানুষকে হয়রানির হাত থেকে রক্ষা করার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।

এই অভিযোগ সামনে আসতেই এবার কড়া অবস্থানের কথা জানালেন দুর্গাপুর পূর্বের বিধায়ক চন্দ্রশেখর ব্যানার্জী। তাঁর বক্তব্য, আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী চার চাকার গাড়ির জন্য ২০ টাকা এবং দু’চাকার গাড়ির জন্য ১০ টাকা পার্কিং ফি ধার্য রয়েছে। অথচ বিভিন্ন জায়গায় তার চেয়ে বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ সামনে আসছে। এই ধরনের ঘটনা বরদাস্ত করা হবে না বলেই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন তিনি। বিধায়ক চন্দ্রশেখর ব্যানার্জী বলেন, “যারা এই ধরনের কাজ করছে, আমরা তা করতে দেব না। এই বিষয়ে আমরা একেবারে কঠোর অবস্থান নিয়েছি। যেখানে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে, সেই কুপন দিয়ে কেউ এফআইআর করলে পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেফতার করবে। এই বিষয়ে কোনও আপস করা হবে না।” তাঁর এই বক্তব্য ঘিরে পার্কিং ফি বিতর্কে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে শিল্পাঞ্চলের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে। বিধায়কের দাবি, নির্ধারিত পার্কিং ফি কার্যকর করতে কড়া পদক্ষেপ করা প্রয়োজন। কোনও পার্কিং স্ট্যান্ডের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি বা সংস্থা যদি নির্ধারিত হারের বাইরে টাকা আদায় করে, তাহলে সেই অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। পাশাপাশি, অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার প্রমাণ হিসেবে পার্কিং কুপন বা অন্যান্য নথি থাকলে তা অভিযোগ জানানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। চন্দ্রশেখর ব্যানার্জী আরও জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে সার্কুলার জারি করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে পার্কিংয়ের নির্ধারিত হার সম্পর্কে সাধারণ মানুষ আরও স্পষ্ট ধারণা পাবেন এবং কোথাও অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হলে তা নিয়ে অভিযোগ জানানোর পথও সহজ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে সার্কুলার জারি হলে তার নির্দেশিকা কী হবে এবং কীভাবে বিভিন্ন পার্কিং স্ট্যান্ডে তা কার্যকর করা হবে, সেদিকেই এখন নজর থাকবে।

অন্যদিকে, বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের তরফেও প্রতিক্রিয়া পাওয়া গিয়েছে। আসানসোল-দুর্গাপুরের পুলিশ কমিশনার ডঃ প্রণব কুমার জানিয়েছেন, পার্কিং ফি নিয়ে অভিযোগের রিপোর্ট তাঁদের কাছে এসেছে। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসন বিষয়টি দেখবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ, অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে নজরদারি শুরু হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। তবে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, অভিযোগের ভিত্তিতে বাস্তবে কত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কারণ, দুর্গাপুজোর মূল ভিড় এখনও বাকি। আগামী দিনে বিভিন্ন পুজোমণ্ডপে দর্শনার্থীদের সংখ্যা আরও বাড়বে। সেই সময় পার্কিং ব্যবস্থায় অনিয়ম হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, শিশুদের নিয়ে বেরোনো পরিবার এবং দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের ক্ষেত্রে পার্কিং নিয়ে সমস্যা তৈরি হলে পুজো পরিক্রমার আনন্দ অনেকটাই ম্লান হয়ে যেতে পারে। তাই দর্শনার্থীদের দাবি, প্রতিটি পার্কিং স্ট্যান্ডে নির্ধারিত ফি স্পষ্টভাবে লিখে রাখতে হবে। চার চাকা ও দু’চাকার গাড়ির জন্য কত টাকা নেওয়া হবে, তা যেন সহজেই চোখে পড়ে। পাশাপাশি, পার্কিংয়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় এবং অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা সম্পর্কেও সাধারণ মানুষকে অবগত করতে হবে। কোথাও অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা উচিত বলেও দাবি উঠছে।

একই সঙ্গে দর্শনার্থীদেরও পার্কিংয়ের টাকা দেওয়ার পর কুপন বা রসিদ সংগ্রহ করে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন সচেতন নাগরিকদের একাংশ। কারণ, অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগের ক্ষেত্রে কুপন বা রসিদ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে। তবে কোনও অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সব মিলিয়ে, দুর্গাপুজোর মরশুমে পার্কিং ফি নিয়ে শিল্পাঞ্চলে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা সামাল দেওয়াই এখন পুলিশ ও প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে বিধায়কের কড়া বার্তা, অন্যদিকে পুলিশ কমিশনারের অভিযোগ খতিয়ে দেখার আশ্বাস—এই দুইয়ের পর এবার বাস্তব পদক্ষেপের অপেক্ষায় সাধারণ মানুষ। নির্ধারিত পার্কিং ফি কার্যকর হয় কি না, অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, আর পুজোর ভিড় সামলাতে পার্কিং ব্যবস্থায় নজরদারি কতটা বাড়ানো হয়—সেদিকেই তাকিয়ে দুর্গাপুর-আসানসোল শিল্পাঞ্চলের বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা। পুজোর আনন্দ যেন অতিরিক্ত পার্কিং ফি-র চাপে ম্লান না হয়, এখন সেটাই চাইছেন সাধারণ মানুষ।