দুর্গাপুর : তৃণমূলের একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে বেরিয়ে গেলেন পঙ্কজ রায় সরকার। সোমবার তাঁর এই পদক্ষেপকে ঘিরেই নতুন করে সরগরম দুর্গাপুরের রাজনৈতিক মহল। তৃণমূলের সঙ্গে কি তাহলে দূরত্ব বাড়ছে প্রাক্তন সিপিএম নেতা পঙ্কজ রায় সরকারের? নাকি এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র সাংগঠনিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ? আর যদি সত্যিই তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন, তাহলে কি আবারও পুরনো দল সিপিএমে ফিরতে পারেন তিনি? এই সমস্ত প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক মহলে। একসময় বাম রাজনীতির অন্যতম পরিচিত মুখ ছিলেন পঙ্কজ রায় সরকার। দুর্গাপুরের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন তিনি। সিপিএমের সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের পর ২০২৪ সালে আচমকাই শিবির বদল করেন পঙ্কজ। তৎকালীন রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের হাত ধরে তিনি যোগ দেন তৃণমূলে। তাঁর দলবদল ঘিরে সেই সময়েও রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট চর্চা হয়েছিল। দলবদলের পর সিপিএমের জেলা নেতৃত্বের তরফে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কারের ঘোষণাও করা হয়। তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর দলীয় কর্মসূচি থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও সক্রিয়ভাবে দেখা গিয়েছিল পঙ্কজ রায় সরকারকে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও তৃণমূলের হয়ে প্রচারে মাঠে-ময়দানে ছিলেন তিনি। দলের হয়ে একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর এই নতুন পদক্ষেপকে ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সোমবার তৃণমূলের একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে বেরিয়ে যান পঙ্কজ রায় সরকার। আর এই ঘটনাই যেন নতুন করে উসকে দিয়েছে জল্পনা। যদিও এখনও পর্যন্ত সরাসরি তৃণমূল ছাড়ার কথা ঘোষণা করেননি তিনি। ফলে তাঁর পদক্ষেপের রাজনৈতিক তাৎপর্য কী, তা নিয়ে নানা মহলে চলছে আলোচনা। নিজের সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পঙ্কজ রায় সরকার জানান, গত এক থেকে দেড় বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে অত্যন্ত বিড়ম্বনাময়। তাঁর অভিযোগ, দলের কর্মীরা যখন আক্রান্ত হয়েছেন বা সমস্যার মধ্যে পড়েছেন, তখন তাঁদের পাশে দাঁড়ানো এবং আইনি সহযোগিতা দেওয়ার ক্ষেত্রে দলের অনেক নেতাকেই তিনি দেখতে পাননি। কর্মীদের পাশে থাকার প্রশ্নেই তাঁর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। শুধু তাই নয়, দুর্গাপুরে দলের দায়িত্বে থাকা একাধিক নেতার বিরুদ্ধে নাম না করে দুর্নীতিতে যুক্ত থাকার অভিযোগও তুলেছেন পঙ্কজ রায় সরকার। তাঁর বক্তব্য ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। যদিও যাঁদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগের ইঙ্গিত করা হয়েছে, তাঁদের নির্দিষ্ট নাম তিনি প্রকাশ্যে জানাননি।

পাশাপাশি তৃণমূল ও সিপিএমের রাজনৈতিক আদর্শ নিয়েও নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন পঙ্কজ। তাঁর দাবি, সিপিএম একটি আদর্শভিত্তিক দল এবং সেই দলের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ রয়েছে। কিন্তু তৃণমূলে থাকার সময় তিনি কোনও লিখিত আদর্শগত পুস্তিকা খুঁজে পাননি। তবে একইসঙ্গে তৃণমূল সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের ঐতিহাসিক গুরুত্বও তিনি স্বীকার করেছেন। অর্থাৎ তাঁর বক্তব্যে একদিকে যেমন তৃণমূলের সাংগঠনিক ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভের ইঙ্গিত রয়েছে, অন্যদিকে সরকারের বিভিন্ন জনমুখী প্রকল্পের প্রশংসাও রয়েছে। ফলে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ঠিক কোন দিকে যাচ্ছে, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। এদিকে পঙ্কজ রায় সরকারের এই পদক্ষেপ নিয়ে সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন দুর্গাপুর পশ্চিমের বিধায়ক লক্ষণ চন্দ্র ঘোড়ুই। তাঁর দাবি, তৃণমূল দলটাই উঠে গেছে, প্রতীক চলে গেছে এবং দলের একাধিক নেতা-নেত্রী দল ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, অনেকেই এখন নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে আক্ষেপ করছেন। লক্ষণ চন্দ্র ঘোড়ুইয়ের এই মন্তব্যকে ঘিরেও রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে আলোচনা। কারণ, পঙ্কজ রায় সরকার এখনও পর্যন্ত তৃণমূল ছাড়ার কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেননি। ফলে বিজেপি বিধায়কের এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবেই দেখছে সংশ্লিষ্ট মহল। তাহলে কি সত্যিই তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পথে পঙ্কজ রায় সরকার? নাকি দলের অভ্যন্তরীণ কিছু বিষয়ে ক্ষোভ থেকেই আপাতত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ছেড়েছেন তিনি? নাকি আরও বড় কোনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের আগে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছেন? আরও একটি বড় প্রশ্ন, তাঁর পুরনো দল সিপিএম কি আবারও তাঁকে স্বাগত জানাবে? কারণ, ২০২৪ সালে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর সিপিএমের পক্ষ থেকে তাঁকে বহিষ্কারের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি সময় বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার পর তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন পঙ্কজ। তাই তাঁর বর্তমান পদক্ষেপকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই পুরনো রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রসঙ্গও সামনে আসছে। তবে এখনও পর্যন্ত সিপিএমে ফেরার বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেননি পঙ্কজ রায় সরকার। একইভাবে তৃণমূল ছাড়ার কথাও প্রকাশ্যে বলেননি তিনি। ফলে আপাতত তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান রয়েছে ধোঁয়াশার মধ্যেই। একদিকে তৃণমূলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে বেরিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে দলের সাংগঠনিক ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ—এই দুই ঘটনাকে ঘিরেই জল্পনা তুঙ্গে। সামনে কি তাহলে নতুন রাজনৈতিক ইনিংস? নাকি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ইতি টেনে অবসরের পথে হাঁটবেন পঙ্কজ রায় সরকার? এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য সময়ই দেবে। তবে আপাতত দুর্গাপুরের রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রে একটাই নাম—পঙ্কজ রায় সরকার। তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কোন দিকে গড়ায়, তিনি পুরনো রাজনৈতিক শিবিরে ফেরেন কি না, নাকি সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনও সিদ্ধান্ত নেন—সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।