
আসানসোল : একাধিক দাবি সামনে রেখে মঙ্গলবার ইসিএলের হেডকোয়ার্টার শাকতোড়িয়ায় ‘চলো শাকতোড়িয়া’ কর্মসূচির ডাক দিল আইএনটিইউসি অনুমোদিত কোলিয়ারী মজদুর ইউনিয়ন। কয়লা খনি শ্রমিকদের বিভিন্ন সমস্যা, বেতন, বোনাস, চাকরির সুযোগ-সুবিধা এবং শ্রম আইন সংক্রান্ত একাধিক বিষয়কে সামনে রেখেই এই কর্মসূচির আয়োজন বলে ইউনিয়নের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সংগঠনের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে কয়লা খনি শ্রমিকদের একাধিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে এখনও কার্যকরী সমাধান হয়নি। সেই সমস্ত দাবিকে সামনে রেখেই এবার ইসিএলের সদর দপ্তরের সামনে নিজেদের দাবি ও বক্তব্য তুলে ধরতে পথে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোলিয়ারী মজদুর ইউনিয়ন। ইউনিয়নের পক্ষ থেকে যে দাবিগুলি সামনে আনা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হল কয়লা খনি শ্রমিকদের বেতন সংক্রান্ত সমঝোতা দ্রুত কার্যকর করা। শ্রমিকদের বেতন সংক্রান্ত যে সমঝোতা হয়েছে, তা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে সংগঠন। তাঁদের বক্তব্য, বেতন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার সঙ্গে শ্রমিকদের আর্থিক স্বার্থ সরাসরি যুক্ত। ফলে বিষয়টি নিয়ে আর দেরি না করে দ্রুত পদক্ষেপ করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি শ্রমিকদের বাৎসরিক বোনাস অবিলম্বে প্রদান করার দাবিও জানানো হয়েছে। ইউনিয়নের দাবি, কয়লা খনি শ্রমিকরা সারা বছর কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেন। তাই তাঁদের প্রাপ্য বোনাস দ্রুত মিটিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। বোনাস প্রদানে কোনও ধরনের বিলম্ব যাতে না হয়, সেই দাবিতেই ইসিএলের কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছে সংগঠন।

শুধু বেতন বা বোনাস নয়, শ্রম আইন নিয়েও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে কোলিয়ারী মজদুর ইউনিয়ন। সংগঠনের পক্ষ থেকে নতুন শ্রম আইন প্রণয়ন বন্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। ইউনিয়নের বক্তব্য, শ্রমিকদের স্বার্থ ও অধিকারকে সামনে রেখেই শ্রম সংক্রান্ত যে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। নতুন শ্রম আইন নিয়ে তাঁদের যে আপত্তি রয়েছে, সেই বিষয়টিও ‘চলো শাকতোড়িয়া’ কর্মসূচির মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের সামনে তুলে ধরতে চাইছে সংগঠন। এই কর্মসূচিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ঠিকা শ্রমিকদের বিষয়টিকেও। ইউনিয়নের দাবি, ঠিকা শ্রমিকদের এইচপিসি অর্থাৎ হাই পাওয়ার কমিটির নির্ধারিত হারে বেতন এবং বোনাস দিতে হবে। তাঁদের অভিযোগ, খনি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বহু ঠিকা শ্রমিকও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। অথচ তাঁদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাই ঠিকা শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট হারে বেতন ও বোনাস নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে কোলিয়ারী মজদুর ইউনিয়ন। এর পাশাপাশি এমডিও ব্যবস্থা বন্ধ করার দাবিও সামনে আনা হয়েছে। কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে এমডিও বা মাইন ডেভেলপার অ্যান্ড অপারেটর ব্যবস্থাকে ঘিরে শ্রমিক সংগঠনগুলির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে। এবার সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও নিজেদের অবস্থান জানাতে চলেছে আইএনটিইউসি অনুমোদিত এই সংগঠন। ইউনিয়নের দাবি, কয়লা শিল্পে শ্রমিকদের স্বার্থ, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

নতুন শ্রমিকদের চাকরির সুযোগ-সুবিধা নিয়েও রয়েছে সংগঠনের নির্দিষ্ট দাবি। ইউনিয়নের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোনও নতুন শ্রমিক চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর ছয় মাস পূর্ণ হলে তাঁর সমস্ত সুযোগ-সুবিধা সম্পূর্ণভাবে বহাল করতে হবে। অর্থাৎ চাকরিতে যোগ দেওয়ার প্রাথমিক সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর শ্রমিকদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে যাতে কোনওভাবে বঞ্চিত না করা হয়, সেই দাবিই জানানো হয়েছে। কোলিয়ারী মজদুর ইউনিয়নের বক্তব্য, কয়লা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকরা প্রতিদিন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেন। খনি এলাকার কাজের সঙ্গে যেমন ঝুঁকি রয়েছে, তেমনই রয়েছে শারীরিক পরিশ্রম ও নানা প্রতিকূলতা। তাই শ্রমিকদের বেতন, বোনাস, চাকরির নিরাপত্তা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণেই একাধিক দাবিকে একসঙ্গে সামনে রেখে ইসিএলের সদর দপ্তর শাকতোড়িয়ায় এই কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবারের ‘চলো শাকতোড়িয়া’ কর্মসূচিকে ঘিরে সংগঠনের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সক্রিয়তা তৈরি হয়েছে। ইউনিয়নের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শান্তিপূর্ণভাবেই নিজেদের দাবি ও বক্তব্য কর্তৃপক্ষের সামনে তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যা দ্রুত সমাধানের জন্য ইসিএল কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের দাবি জানানো হবে। সব মিলিয়ে মঙ্গলবার শাকতোড়িয়ায় ইসিএলের সদর দপ্তরকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের একাধিক দাবি নিয়ে সরব হতে চলেছে আইএনটিইউসি অনুমোদিত কোলিয়ারী মজদুর ইউনিয়ন। বেতন সংক্রান্ত সমঝোতা দ্রুত কার্যকর করা থেকে শুরু করে বাৎসরিক বোনাস প্রদান, নতুন শ্রম আইন প্রণয়ন বন্ধ, ঠিকা শ্রমিকদের এইচপিসি হারে বেতন ও বোনাস, এমডিও ব্যবস্থা বন্ধ এবং নতুন শ্রমিকদের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পর সমস্ত সুযোগ-সুবিধা বহাল—এই একাধিক দাবিকে সামনে রেখেই মঙ্গলবারের ‘চলো শাকতোড়িয়া’ কর্মসূচি। এখন দেখার, সংগঠনের এই দাবিগুলির পরিপ্রেক্ষিতে ইসিএল কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয় এবং শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাগুলির কতটা সমাধান হয়।