দুর্গাপুর : ভিন রাজ্য থেকে এসে পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষকতা করা শিক্ষকদের একাডেমিক শংসাপত্র ও শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাইয়ের দাবি ঘিরে এবার সরব হল বিজেপি শিক্ষা সেল ও সংগ্রামী যৌথ মঞ্চ। এই দাবিকে সামনে রেখে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি জমা দিলেন দুই সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তাঁদের বক্তব্য, রাজ্যে ভিন রাজ্য থেকে এসে শিক্ষকতা করছেন এমন শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং একাডেমিক সার্টিফিকেট যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কোনও শিক্ষক ভুয়ো বা জাল শংসাপত্রের ভিত্তিতে চাকরিতে রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের তরফে একটি সুসংবদ্ধ যাচাই প্রক্রিয়া চালু করা হোক—এই দাবিই মূলত সামনে এসেছে। সম্প্রতি রাজ্যে ভুয়ো চিকিৎসক ধরা পড়ার পর স্বাস্থ্য দপ্তরের উদ্যোগে ভিন রাজ্য থেকে এসে পশ্চিমবঙ্গে চিকিৎসা করা চিকিৎসকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, নথি এবং শংসাপত্র যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেই প্রসঙ্গ টেনেই শিক্ষকতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্মারকলিপি প্রদানকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, চিকিৎসার মতোই শিক্ষাক্ষেত্রেও যোগ্যতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন শিক্ষক সরাসরি পড়ুয়াদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ গঠনের সঙ্গে যুক্ত। তাই শিক্ষকতার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং সেই সংক্রান্ত শংসাপত্র সঠিক কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে বিহার-সহ অন্যান্য রাজ্য থেকে এসে পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষকতা করা শিক্ষকদের একাডেমিক সার্টিফিকেট এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার নথি খতিয়ে দেখার দাবি তোলা হয়েছে। প্রতিনিধিদের বক্তব্য অনুযায়ী, ভিন রাজ্যের কোনও স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অর্জিত ডিগ্রি, প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত শংসাপত্র কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা যেতে পারে। একইসঙ্গে শিক্ষক নিয়োগের সময় যে সমস্ত শিক্ষাগত নথি জমা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলিও প্রয়োজনে পুনরায় পরীক্ষা করে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।
স্মারকলিপি প্রদানকারীদের দাবি, এই বিষয়টি একেবারে নতুন নয়। অতীতেও ভিন রাজ্য থেকে এসে পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষকতা করা ব্যক্তিদের শিক্ষাগত শংসাপত্র যাচাইয়ের দাবি সামনে আনা হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের অভিযোগ, তৎকালীন সরকার সেই দাবিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। এবার নতুন সরকারের কাছে তাঁদের প্রত্যাশা, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রতিনিধিদের আরও বক্তব্য, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যোগ্য প্রার্থীরা যাতে তাঁদের প্রাপ্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন এবং কোনও ব্যক্তি ভুয়ো শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশায় প্রবেশ করতে না পারেন, তা নিশ্চিত করার জন্য নথি যাচাইয়ের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা দরকার। তাঁদের দাবি, শুধু ভিন রাজ্যের শিক্ষকদের ক্ষেত্রেই নয়, প্রয়োজনে শিক্ষক নিয়োগের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত শিক্ষাগত নথির একটি নির্ভরযোগ্য ও স্বচ্ছ যাচাই ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। এদিনের স্মারকলিপিতে মূলত তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, ভিন রাজ্য থেকে এসে পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষকতা করা শিক্ষকদের একাডেমিক সার্টিফিকেট যাচাই। দ্বিতীয়ত, বিহার-সহ অন্যান্য রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া শংসাপত্রের সত্যতা খতিয়ে দেখা। এবং তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে আরও কঠোর ও স্বচ্ছ করার দাবি। তবে কোনও শিক্ষক বা নির্দিষ্ট ব্যক্তির শংসাপত্র ভুয়ো—এমন কোনও নির্দিষ্ট অভিযোগ এদিনের কর্মসূচিতে প্রমাণিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়নি। মূলত ভবিষ্যতে যাতে ভুয়ো শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে কেউ শিক্ষকতার সুযোগ না পান, সেই উদ্দেশ্যেই যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে বলে জানান স্মারকলিপি প্রদানকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, যোগ্যতা যাচাইয়ের একটি নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া থাকলে শিক্ষকতা পেশার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও বাড়বে।
অন্যদিকে, স্মারকলিপি গ্রহণ করে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন রাজ্যের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী। প্রতিনিধিদের বক্তব্য, মন্ত্রী তাঁদের দাবি শুনেছেন এবং বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন। এখন প্রশাসনের তরফে এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কী পদক্ষেপ করা হয়, সেদিকেই নজর রয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগ নিয়ে ইতিমধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা যাচাই এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটে ভিন রাজ্য থেকে এসে পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষকতা করা শিক্ষকদের একাডেমিক শংসাপত্র যাচাইয়ের এই দাবি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। বিজেপি শিক্ষা সেল ও সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের প্রতিনিধিদের বক্তব্য, শিক্ষকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতা যথাযথভাবে যাচাই করা প্রশাসনের দায়িত্ব। আর সেই যাচাইয়ের মাধ্যমে যদি কোনও অনিয়ম ধরা পড়ে, তাহলে নিয়ম মেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এখন দেখার, উচ্চশিক্ষা মন্ত্রীর কাছে জমা পড়া এই স্মারকলিপির পর রাজ্য সরকার আদৌ কোনও পূর্ণাঙ্গ যাচাই প্রক্রিয়া শুরু করে কি না। ভিন রাজ্য থেকে আসা শিক্ষকদের শংসাপত্র যাচাইয়ের দাবিতে এদিন যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা আগামী দিনে রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগ ও নথি যাচাই ব্যবস্থাকে ঘিরে আরও বড় আলোচনার সূত্রপাত করে কি না, সেদিকেই নজর থাকবে।