Log in

বুদবুদ : রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হাসপাতালে তাণ্ডব, ভাঙচুর এবং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ। ঘটনার তদন্তে নেমে এবার ছয়জনকে গ্রেপ্তার করল বুদবুদ থানার পুলিশ। সোমবার ধৃতদের দুর্গাপুর মহকুমা আদালতে পেশ করা হয়। ধৃতদের বিরুদ্ধে সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, কর্তব্যরত স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে একাধিক জামিনঅযোগ্য ধারায় মামলা রুজু করেছে পুলিশ। ধৃত ছয়জনই বুদবুদের মানকর এলাকার বাসিন্দা। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতদের নাম ভরত আকুরে, সুমন বাউরি, দীপক বাউরি, অমিত বাউরি, রাহুল বাউরি এবং শংকর আকুরে। ইতিমধ্যেই তাঁদের গ্রেপ্তার করে আদালতে পেশ করা হয়েছে। একইসঙ্গে ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারীরা। ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার রাতে।

মানকর এলাকার বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সি বুধন বাউরিকে অসুস্থ অবস্থায় মানকর গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে আসেন পরিবারের সদস্যরা। পরিবারের দাবি, অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসার পর চিকিৎসা শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পরেই চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেন মৃতের পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ ছিল, সময়মতো এবং যথাযথ চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়া গেলে হয়তো এই পরিণতি এড়ানো সম্ভব হত। যদিও চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগের সত্যতা তদন্তের বিষয় এবং তা এখনও প্রমাণিত নয়। রোগীর মৃত্যুর পর হাসপাতাল চত্বরে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে উত্তেজনা। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় বেশ কিছু মানুষও সেখানে জড়ো হন বলে জানা যায়। প্রথমে মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ ও বিক্ষোভ চললেও পরবর্তীতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ। পুলিশের দাবি, এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ হাসপাতালের ভিতরে ঢুকে পড়ে। এরপর হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে ভাঙচুর চালানোর পাশাপাশি কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

এই ঘটনায় হাসপাতাল চত্বরে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসা পরিষেবা দিতে থাকা স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। হাসপাতালের ভিতরে ভাঙচুর এবং কর্মীদের ওপর হামলার খবর পৌঁছয় পুলিশের কাছে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় বুদবুদ থানার পুলিশ। পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয় থানায়। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই শুরু হয় তদন্ত। তদন্তে নেমে পুলিশ প্রথমে ঘটনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখতে শুরু করে। কারা হাসপাতালে ঢুকেছিল, কারা ভাঙচুরে যুক্ত ছিল এবং কারা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছিল—তা জানতে তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়। হাসপাতালের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখা হয়। পাশাপাশি ঘটনার সময় হাসপাতালে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানও সংগ্রহ করেন তদন্তকারীরা। সেই তদন্তের ভিত্তিতেই ছয়জনকে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ছয়জনই মানকর এলাকার বাসিন্দা। তাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, কর্তব্যরত স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজে বাধা দেওয়া এবং তাঁদের ওপর হামলার অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়েই তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সোমবার ধৃতদের দুর্গাপুর মহকুমা আদালতে পেশ করা হয়। আদালতে তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশের পক্ষ থেকে কী আবেদন করা হয়েছে এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কী হবে, তা নিয়েও শুরু হয়েছে প্রক্রিয়া।

তবে এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল রোগীর মৃত্যুকে ঘিরে পরিবারের তোলা চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ। পরিবারের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ সামনে আসার পরই মূলত ক্ষোভের সূত্রপাত হয়। কিন্তু সেই অভিযোগের তদন্ত আলাদাভাবে হওয়া জরুরি বলেই মনে করা হচ্ছে। রোগীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী ছিল, চিকিৎসায় কোনও গাফিলতি হয়েছিল কি না, হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থায় কোনও ত্রুটি ছিল কি না—এই প্রশ্নগুলির উত্তর নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা নথি, হাসপাতালের রিপোর্ট এবং প্রয়োজনীয় তদন্তের ওপর। অন্যদিকে, চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ থাকলেও হাসপাতাল ভাঙচুর বা চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা হিসেবেই দেখছে পুলিশ। ইতিমধ্যেই ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে তদন্ত চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী তল্লাশি অভিযানও অব্যাহত রয়েছে। অর্থাৎ ছয়জন গ্রেপ্তারের পরেই তদন্ত শেষ হচ্ছে না। ঘটনার সময় হাসপাতালে কারা উপস্থিত ছিলেন, ভাঙচুরে আর কেউ অংশ নিয়েছিলেন কি না কিংবা স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় আরও কারও ভূমিকা ছিল কি না—সেই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

রোগীর মৃত্যু যে কোনও পরিবারের কাছেই অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক ঘটনা। আর সেই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যদি চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ ওঠে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেই অভিযোগের নিষ্পত্তির জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই হাসপাতাল চত্বরে ভাঙচুর কিংবা চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ সামনে আসায় ঘটনাটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এখন নজর রয়েছে তদন্তের পরবর্তী ধাপের দিকে। ছয়জনের গ্রেপ্তারের পর তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে কীভাবে এগোয়, এবং তদন্তে আরও কারও নাম সামনে আসে কি না—সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি মৃত বুধন বাউরির পরিবারের তোলা চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগেরও যথাযথ তদন্ত হয় কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে রোগীর মৃত্যুর কারণ নিয়ে পরিবারের প্রশ্ন, অন্যদিকে হাসপাতাল ভাঙচুর ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ—দুই দিক মিলিয়ে মানকর গ্রামীণ হাসপাতালের এই ঘটনায় এখন তদন্তের দিকেই রয়েছে সবার নজর।