
দুর্গাপুর : সরকারি ত্রিপল ব্যবহার করে ভবন সংস্কারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়াল দুর্গাপুরের এবিএল কলোনি এলাকায়। অভিযোগ, একটি-দুটি নয়, প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি সরকারি ত্রিপল ব্যবহার করা হচ্ছে একটি ভবন সংস্কারের কাজে। আর এই অভিযোগকে ঘিরেই সরাসরি ঠিকাদারকে ঘিরে বিক্ষোভ দেখায় বিজেপি নেতৃত্ব। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় নিউ টাউনশিপ থানার পুলিশ। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এবিএল কলোনি এলাকায় একটি ভবন সংস্কারের কাজ চলছিল। সেই সংস্কারকাজের এলাকায় বেশ কিছু ত্রিপল ব্যবহার হতে দেখা যায়। বিজেপির অভিযোগ, এই ত্রিপলগুলি সাধারণ বাজার থেকে কেনা সাধারণ ত্রিপল নয়, বরং সরকারি কাজে ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করা ত্রিপল। তাদের দাবি, ঘটনাস্থলে প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি ত্রিপল ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে এত বিপুল সংখ্যক সরকারি ত্রিপল কীভাবে একটি ব্যক্তিগত সংস্কারকাজের এলাকায় এল, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে বিজেপি। ঘটনায় আরও বিতর্ক তৈরি হয়েছে কয়েকটি ত্রিপলে প্রাক্তন সরকারের ‘বিশ্ব বাংলা’ লোগো থাকায়। বিজেপির দাবি, ত্রিপলগুলিতে ‘বিশ্ব বাংলা’র লোগো স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। সেই কারণেই তাদের সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে। সরকারি সম্পত্তি যদি সত্যিই কোনও ব্যক্তিগত নির্মাণ বা সংস্কারের কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে তা কীভাবে সম্ভব হল, কার মাধ্যমে এই ত্রিপলগুলি সেখানে পৌঁছল এবং কে বা কারা সেগুলি সরবরাহ করল—এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর চায় বিজেপি নেতৃত্ব।

অভিযোগ সামনে আসতেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঠিকাদারকে ঘিরে বিক্ষোভ দেখায় বিজেপির কর্মী-সমর্থকেরা। তাদের দাবি, বিষয়টি শুধুমাত্র কয়েকটি ত্রিপল ব্যবহারের ঘটনা নয়। যদি সরকারি ত্রাণ বা সরকারি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা ত্রিপল ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে এর পিছনে একটি বড় ধরনের অনিয়ম রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি যাতে আরও উত্তপ্ত না হয়ে ওঠে, তার জন্য ঘটনাস্থলে পৌঁছয় নিউ টাউনশিপ থানার পুলিশ। পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। একই সঙ্গে গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেওয়া হয় বলে জানা গিয়েছে। দুর্গাপুর পূর্ব বিধানসভার বিজেপি কনভেনার তরুণ দাস এই ঘটনায় সরাসরি অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, প্রায় ৫০টি সরকারি ত্রিপল ব্যবহার করে ভবন সংস্কারের কাজ চলছে। তাঁর আরও অভিযোগ, ওই ত্রিপলগুলির বেশ কয়েকটিতে প্রাক্তন সরকারের ‘বিশ্ব বাংলা’ লোগো রয়েছে। এত বিপুল সংখ্যক সরকারি ত্রিপল কীভাবে সংস্কারকাজের এলাকায় এল, সেই প্রশ্নের উত্তর জানতে তদন্ত হওয়া দরকার বলে দাবি করেন তিনি। তরুণ দাসের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি সম্পত্তি সাধারণ মানুষের প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ থাকে। সেই সম্পত্তি যদি কোনও ব্যক্তিগত নির্মাণ বা সংস্কারের কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। তাই পুলিশের কাছে গোটা ঘটনার তদন্তের দাবি জানিয়েছে বিজেপি। তবে বিজেপির তোলা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংস্কারকাজের ঠিকাদার প্রভাকর পাণ্ডে। তাঁর দাবি, ত্রিপলগুলি তিনি কোনও সরকারি দফতর বা সরকারি সংস্থা থেকে নেননি। গরিব মানুষের কাছ থেকে তিনি ত্রিপলগুলি কিনেছেন বলেই দাবি করেছেন ঠিকাদার।

প্রভাকর পাণ্ডের বক্তব্য, “গরিব মানুষরা আমার কাছে ত্রিপল বিক্রি করেছে। আমি সেই জন্য কিনেছি। কিন্তু আমাকে চাপ দেওয়া হচ্ছে।” ঠিকাদারের এই বক্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই আরও প্রশ্ন উঠছে। যদি সত্যিই গরিব মানুষের কাছ থেকে ত্রিপলগুলি কেনা হয়ে থাকে, তাহলে সেই ত্রিপলগুলির উৎস কী ছিল, কীভাবে সেগুলি সাধারণ মানুষের হাতে এল এবং পরে কীভাবে ঠিকাদারের কাছে পৌঁছল—তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠছে। একই সঙ্গে ত্রিপলগুলির প্রকৃত মালিকানা এবং সরকারি ব্যবহারের জন্য সেগুলি বরাদ্দ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় বলে মনে করছে বিজেপি। এরই মধ্যে বিজেপির পক্ষ থেকে আরও একটি বক্তব্য সামনে আনা হয়েছে। সংস্থার এক কর্মীর বক্তব্য অনুযায়ী, ত্রিপলগুলি তৃণমূল কাউন্সিলরের অফিস থেকে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। যদিও এই দাবির সত্যতা এখনও তদন্তসাপেক্ষ। এই বক্তব্য সামনে আসার পরেই ঘটনায় রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও বেড়েছে।

একদিকে বিজেপির অভিযোগ, সরকারি ত্রিপল ব্যক্তিগত সংস্কারকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ঠিকাদারের দাবি, তিনি গরিব মানুষের কাছ থেকেই ত্রিপলগুলি কিনেছেন। পাশাপাশি তৃণমূল কাউন্সিলরের অফিস থেকে ত্রিপল দেওয়ার যে বক্তব্য বিজেপির পক্ষ থেকে সামনে আনা হয়েছে, তারও সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। ফলে পুরো ঘটনায় একাধিক প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরা। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি ত্রিপল যদি সত্যিই সরকারি হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলি কোথা থেকে এল? কারা এই ত্রিপলগুলি সরবরাহ করেছিল? কীভাবে সেগুলি ব্যক্তিগত সংস্কারকাজের জায়গায় পৌঁছল? ত্রিপলগুলির কোনও সরকারি নথিভুক্ত হিসাব রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। আর যদি ঠিকাদারের দাবি সত্যি হয় এবং ত্রিপলগুলি গরিব মানুষের কাছ থেকে কেনা হয়ে থাকে, তাহলে সেই বিক্রেতাদের কাছ থেকে ত্রিপলগুলি তাঁদের হাতে কীভাবে এসেছিল, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। তবে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগের বাইরে গিয়ে ত্রিপলগুলির উৎস এবং ব্যবহার সম্পর্কে নিরপেক্ষ তদন্ত হলেই প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে বলে মনে করছেন এলাকার বাসিন্দারা। এখন পুলিশের তদন্ত কোন দিকে এগোয়, উদ্ধার বা ব্যবহৃত ত্রিপলগুলি সত্যিই সরকারি সম্পত্তি কি না, সেগুলির উৎস কোথায় এবং কারও বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার মতো তথ্য সামনে আসে কি না—সেদিকেই নজর রয়েছে। সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারের অভিযোগ কতটা সত্য, নাকি এর পিছনে রয়েছে অন্য কোনও ঘটনা—তদন্ত শেষ হলেই তার উত্তর মিলবে।