দুর্গাপুর : OTP দেননি, কোনও সন্দেহজনক লিঙ্কেও ক্লিক করেননি। এমনকি অপরিচিত নম্বর থেকে আসা ফোনও ধরেননি। তারপরও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে একসঙ্গে উধাও ৬ লক্ষ টাকা! দুর্গাপুরের বিধাননগর এলাকায় এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে এমনই চাঞ্চল্যকর সাইবার প্রতারণার অভিযোগ ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে দুর্গাপুর শহর থেকে গোটা শিল্পাঞ্চলে। ঘটনার পর রীতিমতো দিশেহারা ব্যবসায়ী ও তাঁর পরিবার। কারণ অভিযোগ, কোনও OTP শেয়ার না করেও এবং কোনও সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিক না করেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা গায়েব হয়ে যায়। কীভাবে এই টাকা হাতিয়ে নেওয়া হল, সেটাই এখন তদন্তের অন্যতম বড় প্রশ্ন। জানা গিয়েছে, দুর্গাপুরের বিধাননগর এলাকার ব্যবসায়ী প্রবুদ্ধ গুহ সোমবার তাঁর মোবাইলে একাধিক সন্দেহজনক ফোন আসতে দেখেন। পরপর অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসায় বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হয় তাঁর। নম্বরগুলি পরিচিত না হওয়ায় কোনও ফোনই তিনি রিসিভ করেননি। শুধু তাই নয়, প্রবুদ্ধ গুহর দাবি, প্রতারকদের সঙ্গে কোনও ধরনের কথোপকথনও হয়নি তাঁর। তিনি কাউকে কোনও OTP দেননি। কোনও সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিকও করেননি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মনে হয়েছিল, ফোনগুলি হয়তো সাইবার প্রতারণার চেষ্টা হতে পারে। বিষয়টি আঁচ করার পর আর দেরি না করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেন তিনি। নিজের অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ব্যবসায়ী। কিন্তু অভিযোগ, এরপরও ঘটল বিপুল অঙ্কের টাকা গায়েবের ঘটনা। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর মোবাইলে একের পর এক ডেবিট মেসেজ আসতে শুরু করে। সেই মেসেজ দেখেই কার্যত মাথায় হাত পড়ে যায় ব্যবসায়ী ও তাঁর পরিবারের। অভিযোগ, তাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে মোট ৬ লক্ষ টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এত বড় অঙ্কের টাকা কীভাবে অ্যাকাউন্ট থেকে বেরিয়ে গেল, তা বুঝে উঠতে পারছেন না পরিবারের সদস্যরা। কারণ তাঁদের বক্তব্য, তাঁরা কোনও OTP কাউকে জানাননি। কোনও অচেনা লিঙ্কে ক্লিক করেননি এবং অপরিচিত নম্বর থেকে আসা ফোনও ধরেননি। ঘটনার গুরুত্ব আরও বেড়েছে পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতির কারণে। পরিবারের দাবি, চিকিৎসার খরচ এবং ছেলের ভর্তি সংক্রান্ত প্রয়োজনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে ওই টাকা সঞ্চয় করে রাখা হয়েছিল। ধীরে ধীরে জমানো সেই অর্থ এক মুহূর্তে অ্যাকাউন্ট থেকে উধাও হয়ে যাওয়ায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছে পরিবার। সাইবার প্রতারণার শিকার হওয়ার পর সাধারণত মানুষ প্রথমেই OTP, পাসওয়ার্ড বা সন্দেহজনক লিঙ্কের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু এই ঘটনায় অভিযোগকারীর দাবি অনুযায়ী, তিনি এই ধরনের কোনও তথ্যই প্রতারকদের দেননি। ফলে কীভাবে তাঁর অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে টাকা সরানো হল, তা নিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, ঘটনাটি সাইবার প্রতারণার কোনও নতুন কৌশলের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তবে ঠিক কী পদ্ধতিতে টাকা সরানো হয়েছে, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। ব্যাংকিং তথ্য, লেনদেনের বিবরণ এবং ডিজিটাল যোগাযোগের বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার পর প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে লিখিত অভিযোগ জানানো হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর কীভাবে টাকা অন্য অ্যাকাউন্টে বা অন্য কোনও মাধ্যমে সরানো হয়েছে, সেই বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি এই ঘটনার নেপথ্যে কারা রয়েছে, তাঁদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।

তদন্তকারীদের কাছে এখন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। যে অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা গায়েব হয়েছে, সেখানে কী ধরনের লেনদেন হয়েছে? কোন মাধ্যমে টাকা স্থানান্তরিত হয়েছে? টাকা কি একবারেই অন্য অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছে, নাকি একাধিক ধাপে সরানো হয়েছে? এই লেনদেনের সঙ্গে কোনও সন্দেহজনক অ্যাকাউন্ট বা ব্যক্তির যোগ রয়েছে কি না—সবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রবুদ্ধ গুহর মোবাইলে আসা একাধিক সন্দেহজনক ফোনও তদন্তের আওতায় আসতে পারে। অপরিচিত নম্বরগুলি থেকে কেন ফোন এসেছিল এবং সেই ফোনগুলির সঙ্গে টাকা গায়েবের ঘটনার কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। সাইবার প্রতারণার ক্ষেত্রে প্রতারকরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে। কখনও ব্যাংক আধিকারিক পরিচয় দিয়ে তথ্য নেওয়া হয়, কখনও বিভিন্ন পরিষেবা বা পুরস্কারের নাম করে যোগাযোগ করা হয়। আবার কখনও প্রযুক্তিগত পদ্ধতি ব্যবহার করে মানুষের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের চেষ্টা করা হয়। এই ঘটনার ক্ষেত্রেও ঠিক কী ঘটেছিল, সেটিই এখন তদন্তের বিষয়। ব্যবসায়ীর পরিবারের পক্ষ থেকে দ্রুত প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক কর্তৃপক্ষকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। টাকা উদ্ধারের সম্ভাবনা কতটা, সেই বিষয়েও এখন তদন্তের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে রয়েছে পরিবার। তবে এই ঘটনা সামনে আসার পর সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজনীয়তাও উঠে এসেছে। কারণ সাধারণ মানুষের ধারণা, OTP বা কোনও লিঙ্কে ক্লিক না করলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা গায়েব হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এই ঘটনার অভিযোগ সেই ধারণার বিপরীত একটি পরিস্থিতি সামনে এনেছে।

তাই ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক কোনও লেনদেনের মেসেজ এলেই দ্রুত ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করা, সন্দেহজনক নম্বর এড়িয়ে চলা এবং কোনও অচেনা ব্যক্তির সঙ্গে ব্যাংকিং সংক্রান্ত তথ্য শেয়ার না করার উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দুর্গাপুরের বিধাননগরের এই ঘটনায় এখন তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য—৬ লক্ষ টাকা ঠিক কোন পথে গায়েব হল, সেই লেনদেনের নেপথ্যে কারা রয়েছে এবং টাকা কোথায় সরানো হয়েছে, তা খুঁজে বের করা। OTP নয়, লিঙ্ক নয়, ফোনও রিসিভ করেননি—তারপরও অ্যাকাউন্ট থেকে গায়েব ৬ লক্ষ টাকা। ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে দুর্গাপুরে। এখন তদন্তের মাধ্যমে এই রহস্যের কিনারা হয় কি না এবং পরিবারের সঞ্চিত অর্থের কোনও অংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয় কি না, সেদিকেই নজর রয়েছে।