Log in

দুর্গাপুর : হোটেলের ঘরই যেন প্রতারণা চক্রের আস্তানা! দুর্গাপুরে একটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে তথাকথিত ‘জামতারা গ্যাং’-এর সঙ্গে যোগ থাকার অভিযোগে চার যুবককে গ্রেপ্তার করল পুলিশ। পুলিশের দাবি, হোটেলের ঘরকে কার্যত প্রতারণার ‘অফিস’ বানিয়ে সেখান থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে টার্গেট করত অভিযুক্তরা। গোপন সূত্রে খবর পাওয়ার পর অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে ল্যাপটপ, একাধিক মোবাইল ফোন, এটিএম কার্ড-সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি। এখন তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য, এই চক্রের সঙ্গে আর কারা যুক্ত এবং প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া টাকা কোথায় এবং কীভাবে লেনদেন করা হত, তা খুঁজে বের করা। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, দুর্গাপুর স্টেশন বাজার সংলগ্ন সাধুডাঙা এলাকার একটি হোটেলে বেশ কিছুদিন ধরে সন্দেহজনক গতিবিধি নজরে এসেছিল। গোপন সূত্রে সেই খবর পৌঁছয় পুলিশের কাছে। এরপরই নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে হোটেলটিতে অভিযান চালানো হয়। হোটেলের একটি ঘরে তল্লাশি চালিয়ে চার যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ধৃত চারজনই ঝাড়খণ্ডের দেওঘর জেলার মধুপুর এলাকার বাসিন্দা। পুলিশ সূত্রে তাঁদের নাম জানা গিয়েছে—গণেশ সদ্দার, সচিন দাস, জিতেন্দ্র কুমার দাস এবং সুরেন্দ্র দাস।

অভিযান চালানোর সময় পুলিশের হাতে আসে বেশ কিছু ইলেকট্রনিক ডিভাইস এবং গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী। উদ্ধার করা হয়েছে ল্যাপটপ, একাধিক মোবাইল ফোন, এটিএম কার্ড এবং বিভিন্ন নথি। তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, এই সমস্ত ডিভাইস ব্যবহার করেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হত। পুলিশের দাবি, প্রতারণার জন্য বিভিন্ন ধরনের কৌশল ব্যবহার করত অভিযুক্তরা। ফোন বা ডিজিটাল মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে নানা প্রলোভন দেখানো কিংবা বিশ্বাস অর্জনের পর প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোন এবং ল্যাপটপের তথ্য বিশ্লেষণ করেই এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। এই ঘটনার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে। পুলিশের দাবি, নিজেদের অবস্থান গোপন রাখতে অভিযুক্তরা একই হোটেলে দীর্ঘদিন থাকত না। ঘনঘন হোটেল পরিবর্তন করত তারা। এর ফলে কোনও নির্দিষ্ট জায়গায় দীর্ঘদিন অবস্থান না করায় পুলিশের নজর এড়ানো সহজ হত বলেই প্রাথমিকভাবে মনে করছেন তদন্তকারীরা। তবে শেষ পর্যন্ত গোপন সূত্রের খবরের ভিত্তিতে তাদের অবস্থানের সন্ধান মেলে। এরপর পরিকল্পনা করে হোটেলে অভিযান চালায় পুলিশ। চারজনকে একসঙ্গে গ্রেপ্তার করার পাশাপাশি তাঁদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী বাজেয়াপ্ত করা হয়।

এখন তদন্তকারীদের সামনে একাধিক প্রশ্ন। এই চারজন কি নিজেরাই গোটা প্রতারণা চক্র পরিচালনা করত, নাকি তাঁদের সঙ্গে আরও একটি বড় নেটওয়ার্ক যুক্ত রয়েছে? হোটেলের ঘর থেকেই কি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ফোন করা হত? কী ধরনের প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে টার্গেট করা হত? প্রতারণার টাকা কোথায় জমা পড়ত? সেই টাকা কীভাবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠানো হত? এবং এই নেটওয়ার্কে আরও কতজন যুক্ত রয়েছে ? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে পুলিশ। আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের ডেপুটি কমিশনার পূর্ব, রাসপ্রিত সিং জানান, বিভিন্ন হোটেলে পুলিশের অভিযান চলছে। সেই অভিযান চলাকালীনই এই চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ধৃতদের পুলিশি হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা তাঁদের কাছ থেকে চক্রের নেটওয়ার্ক, সহযোগীদের ভূমিকা এবং প্রতারণার অর্থের লেনদেন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করছেন। পুলিশের এই অভিযানকে গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ, প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্তরা যদি সত্যিই একাধিক জায়গা পরিবর্তন করে কাজ করে থাকে, তাহলে শুধু একটি হোটেল বা একটি এলাকার মধ্যে তদন্ত সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এই ধরনের চক্রের সঙ্গে যুক্ত অন্য ব্যক্তিদের সন্ধান পাওয়াও পুলিশের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। উদ্ধার হওয়া ল্যাপটপ এবং মোবাইল ফোন এই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে উঠতে পারে। ওই ডিভাইসগুলিতে থাকা ফোন নম্বর, যোগাযোগের তথ্য, বিভিন্ন অ্যাপের ব্যবহার, মেসেজ এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। সেখান থেকেই চক্রের অন্য সদস্যদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে আশা পুলিশের।

একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া এটিএম কার্ড এবং নথিগুলিও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। এগুলি কার নামে, কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হত এবং প্রতারণার অর্থের সঙ্গে এগুলির কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুর্গাপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল এবং যোগাযোগের কেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকায় হোটেলকে ব্যবহার করে কোনও প্রতারণা চক্র কাজ করছে কি না, সেই বিষয়েও পুলিশের নজরদারি বাড়ছে। বিশেষ করে বাইরের জেলা বা রাজ্য থেকে এসে কেউ দীর্ঘদিন ধরে হোটেলে থাকলে তাদের গতিবিধি নিয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষকে আরও সতর্ক থাকার বার্তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তদন্তকারীদের মতে, প্রতারণা চক্রগুলি নিজেদের পরিচয় এবং অবস্থান গোপন রাখতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। কখনও ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার, কখনও ঘনঘন অবস্থান পরিবর্তন—এই ধরনের পদ্ধতির মাধ্যমে তদন্তকারীদের চোখে ধুলো দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। তাই হোটেলগুলিতে অতিথিদের পরিচয় যাচাই এবং নথিপত্র সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

এই ঘটনায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া চার যুবকের বিরুদ্ধে কী ধরনের নির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে এবং তাঁদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া ডিভাইসগুলির মাধ্যমে ঠিক কী ধরনের প্রতারণা চালানো হত, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে প্রতারণা চক্রের সঙ্গে তাঁদের যোগ থাকার অভিযোগ সামনে এসেছে। এখন ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করেই এই চক্রের আসল পরিধি বোঝার চেষ্টা করছে পুলিশ। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া ডিজিটাল ডিভাইসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁদের যোগাযোগের সূত্রও খোঁজা হতে পারে। সব মিলিয়ে দুর্গাপুরের একটি হোটেলে পুলিশের এই অভিযান ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। হোটেলের ঘরকে ব্যবহার করে প্রতারণা চক্র চালানোর অভিযোগ, ঘনঘন হোটেল বদলে পুলিশের নজর এড়ানোর চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত গোপন সূত্রে খবর পেয়ে চারজনের গ্রেপ্তার—ঘটনার প্রতিটি দিকই এখন তদন্তের কেন্দ্রে।

তবে তদন্তের আসল ছবি আরও পরিষ্কার হবে ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং উদ্ধার হওয়া ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণের পর। এই চক্রের সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত রয়েছে কি না, প্রতারণার শিকার মানুষের সংখ্যা কত, এবং প্রতারণার টাকা কোথায় লেনদেন করা হয়েছে—সেই উত্তর খুঁজতেই এখন জোরকদমে তদন্ত চালাচ্ছে আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেট। আর পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা—অপরাধমূলক কাজের জন্য কোনও হোটেল বা অন্য কোনও জায়গাকে ব্যবহার করা হলে তা বরদাস্ত করা হবে না। বিভিন্ন হোটেলে নজরদারি ও অভিযানও চলবে। দুর্গাপুরের এই ঘটনায় চারজন গ্রেপ্তার হলেও তদন্ত এখানেই শেষ নয়। বরং এই গ্রেপ্তারের সূত্র ধরে তথাকথিত ‘জামতারা গ্যাং’-এর সঙ্গে তাঁদের যোগ, চক্রের নেটওয়ার্ক এবং আর্থিক লেনদেনের আরও বড় কোনও তথ্য সামনে আসে কি না, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে পুলিশের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *