কাঁকসা : হাইড্রা ক্রেনের ধাক্কায় মর্মান্তিক মৃত্যু এক সাইকেল আরোহীর। ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়াল কাঁকসার পানাগড়ে। মঙ্গলবার সকালে দুর্ঘটনাটি ঘটে পানাগড়-রনডিহা সড়কের অনুরাগপুর এলাকায়। মৃতের নাম রতন দাস। বয়স ৫৫ বছর। পানাগড়ের রেল কলোনির বাসিন্দা রতনবাবু পেশায় দিনমজুর ছিলেন। সকালে সাইকেলে করে ব্যক্তিগত কাজে বেরিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফেরা হল না। পথেই হাইড্রা ক্রেনের ধাক্কায় প্রাণ গেল তাঁর। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার সকালে সাইকেলে চেপে রঘুনাথপুরের দিকে যাচ্ছিলেন রতন দাস। পানাগড়-রনডিহা সড়কের অনুরাগপুর এলাকায় পৌঁছতেই পিছন দিক থেকে একটি হাইড্রা ক্রেন দ্রুতগতিতে এসে তাঁকে ধাক্কা মারে বলে অভিযোগ। ধাক্কার জেরে সাইকেল থেকে ছিটকে রাস্তায় পড়ে যান রতন দাস। এরপর হাইড্রা ক্রেনের চাকায় তিনি পিষ্ট হন বলে স্থানীয়দের দাবি। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার পর মুহূর্তের মধ্যেই এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঘটনাস্থলে জড়ো হতে শুরু করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার সময় হাইড্রা ক্রেনটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চলছিল। শুধু তাই নয়, চালক মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে। দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর হাইড্রা ক্রেনটি নিয়ে সেখান থেকে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছিল চালক। তখনই স্থানীয়রা তাড়া করে ক্রেনটিকে আটক করেন। এরপর চালককে ধরে একটি স্থানীয় ক্লাবঘরে আটকে রাখেন ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা। খবর দেওয়া হয় পুলিশকে। পাশাপাশি দুর্ঘটনার প্রতিবাদে এবং এলাকায় যান চলাচলের নিরাপত্তার দাবিতে পানাগড়-রনডিহা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন স্থানীয়রা। দুর্ঘটনার জেরে কিছু সময়ের জন্য ওই গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। রাস্তার দুই পাশে আটকে পড়ে একাধিক গাড়ি। ঘটনাস্থলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।

খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় বুদবুদ থানার পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা শুরু করেন পুলিশ আধিকারিকরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে অবরোধ তুলে নেওয়ার জন্য বোঝানো হয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মৃতদেহ উদ্ধার করে। পরে সেটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। একইসঙ্গে হাইড্রা ক্রেনের চালককে আটক করা হয়। দুর্ঘটনায় ব্যবহৃত হাইড্রা ক্রেনটিও বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। এখন পুলিশের তদন্তের কেন্দ্রে একাধিক বিষয়। দুর্ঘটনার সময় ক্রেনটির গতি কত ছিল? চালক আদৌ মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন কি না? রাস্তার পরিস্থিতি কেমন ছিল? কীভাবে সাইকেল আরোহীকে ধাক্কা লাগল? চালকের কোনও গাফিলতি ছিল কি না—সবদিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে স্থানীয়দের তোলা মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগও তদন্তের আওতায় রয়েছে। চালকের শারীরিক পরীক্ষা বা অন্যান্য তদন্তের মাধ্যমে এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হতে পারে। মৃত রতন দাসের পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। ৫৫ বছরের রতনবাবু পানাগড়ের রেল কলোনির বাসিন্দা ছিলেন। পেশায় দিনমজুর হওয়ায় পরিবারের জীবিকা অনেকটাই তাঁর উপার্জনের উপর নির্ভরশীল ছিল বলে জানা গিয়েছে। প্রতিদিনের মতো এদিনও ব্যক্তিগত কাজে সাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই পথযাত্রা পরিণত হল মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়। একটি পরিবারের কাছে হঠাৎ করেই নেমে এল অন্ধকার। ঘটনার পর রেল কলোনি এলাকাতেও শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেশীরা জানান, রতন দাস নিয়মিত নিজের কাজের জন্য সাইকেলে যাতায়াত করতেন। এদিনও বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু দুর্ঘটনার খবর আসতেই পরিবারের সদস্য এবং পরিচিতদের মধ্যে কান্নার রোল ওঠে।

অন্যদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, পানাগড়-রনডিহা সড়কে বিভিন্ন সময় ভারী যানবাহনের দ্রুতগতির কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। ব্যস্ত রাস্তায় ভারী গাড়ি এবং নির্মাণকাজে ব্যবহৃত যানবাহনের চলাচলের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা প্রয়োজন বলে দাবি তাঁদের। স্থানীয়দের একাংশের বক্তব্য, রাস্তার উপর দিয়ে বড় ও ভারী যান চলাচলের সময় গতি নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক নিয়ম কঠোরভাবে মানা উচিত। বিশেষ করে সাইকেল, মোটরবাইক বা পথচারীদের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় ভারী যানবাহনের চালকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। এই দুর্ঘটনার পর সেই দাবিই ফের জোরালো হয়েছে। তবে পুলিশি তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। পুলিশ ঘটনার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখছে। দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন থেকে শুরু করে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, চালকের ভূমিকা এবং গাড়ির অবস্থাও তদন্তের অংশ হতে পারে। অবরোধের জেরে তৈরি হওয়া যানজটও পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা উত্তেজনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এলাকায় যাতে নতুন করে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সেদিকেও নজর রাখে পুলিশ।

একদিকে দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল ৫৫ বছরের এক দিনমজুরের, অন্যদিকে ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন স্থানীয়রা। হাইড্রা ক্রেন আটক করে চালককে ক্লাবঘরে আটকে রাখা, রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ এবং পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া—সব মিলিয়ে সকাল থেকেই উত্তপ্ত ছিল পানাগড়ের অনুরাগপুর এলাকা। এখন তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে, ঠিক কীভাবে ঘটল এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। চালকের বিরুদ্ধে কী আইনি পদক্ষেপ করা হবে, সেটিও নির্ভর করছে তদন্তের ফলাফলের উপর। তবে এই দুর্ঘটনা ফের একবার প্রশ্ন তুলে দিল ব্যস্ত সড়কে ভারী যান চলাচল এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। দ্রুতগতির যানবাহনের সামনে একজন সাইকেল আরোহী কতটা অসহায়, পানাগড়ের এই দুর্ঘটনাই যেন তার মর্মান্তিক উদাহরণ। একটি দুর্ঘটনা কেড়ে নিল একটি প্রাণ, ভেঙে দিল একটি পরিবারকে। রেল কলোনির বাসিন্দা রতন দাসের মৃত্যুতে এখন শোকের ছায়া এলাকাজুড়ে। আর পুলিশের তদন্তের দিকে তাকিয়ে মৃতের পরিবার এবং স্থানীয় বাসিন্দারা।