বাঁকুড়া : বাঁকুড়ার সোনামুখীতে ফের দামোদর নদের চর থেকে উদ্ধার হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত একটি মর্টার শেল। বিশালাকার ওই ধাতব বস্তু ঘিরে এলাকায় ছড়িয়েছে চাঞ্চল্য। দুর্ঘটনা এড়াতে ঘটনাস্থল ঘিরে রেখেছে পুলিশ। খবর দেওয়া হয়েছে সেনাবাহিনীকে। শেলটি নিষ্ক্রিয় করার জন্য সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞদের অপেক্ষা করা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার বিকেলে দামোদর নদের চরে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন কয়েকজন মৎস্যজীবী। সেই সময় নদীর চরের মাটির মধ্যে আংশিকভাবে গেঁথে থাকা একটি বিশালাকার ধাতব বস্তু তাঁদের নজরে আসে। প্রথমে সেটি কী, তা বুঝতে না পারলেও কাছে গিয়ে দেখার পর সেটিকে মর্টার শেল বলে সন্দেহ হয়। এরপর আর ঝুঁকি না নিয়ে দ্রুত সোনামুখী থানায় খবর দেন মৎস্যজীবীরা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের যাতায়াত বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শেলটি যেখানে পাওয়া গিয়েছে, সেই এলাকা ঘিরে ফেলা হয়। পুলিশের তরফে সতর্কতা অবলম্বন করে স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘটনাস্থলের কাছে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ পুরনো হলেও ওই মর্টার শেলের ভিতরে বিস্ফোরক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সেটিকে নিরাপদ বলে ধরে নেওয়া সম্ভব নয়। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া শেলটি কী অবস্থায় রয়েছে, সেটি কতটা বিপজ্জনক এবং কীভাবে সেটিকে নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করা হবে, তা খতিয়ে দেখছে প্রশাসন।

ইতিমধ্যেই সেনাবাহিনীকে খবর দেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে শেলটি পরীক্ষা করার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানা গিয়েছে। তবে বাঁকুড়ার এই এলাকায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার মর্টার শেল উদ্ধারের ঘটনা একেবারেই নতুন নয়। এর আগেও জেলার বিভিন্ন নদীর চর এবং নদীবক্ষ থেকে একই ধরনের পুরনো মর্টার শেল উদ্ধার হয়েছে। কখনও দ্বারকেশ্বর নদ থেকে, আবার কখনও দামোদর নদের চর থেকে উদ্ধার হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বিস্ফোরক-ভর্তি মর্টার শেল। কয়েক বছর আগে সোনামুখী থানার ডিহিপাড়া এলাকায় দামোদর নদের চর থেকেই একসঙ্গে তিনটি মর্টার শেল উদ্ধার হয়েছিল। সেই ঘটনাতেও ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছিল এলাকায়। পরে সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থলে এসে সেগুলি নিষ্ক্রিয় করেন। ফলে এবার একই এলাকার কাছাকাছি ফের মর্টার শেল উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। তাঁদের আশঙ্কা, দামোদর নদের চর এবং নদীবক্ষে হয়তো আরও এমন পুরনো বিস্ফোরক পড়ে থাকতে পারে। সময়ের সঙ্গে মাটি, বালি কিংবা নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে সেগুলি এতদিন মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিল বলেই মনে করছেন অনেকে। স্থানীয়দের বক্তব্য, নদীর চর এলাকায় প্রতিদিনই বহু মানুষ মাছ ধরতে যান। এছাড়াও বিভিন্ন প্রয়োজনে সাধারণ মানুষের যাতায়াত রয়েছে। ফলে মাটির নিচে বা নদীর বালির মধ্যে যদি আরও কোনও বিস্ফোরক লুকিয়ে থাকে, তাহলে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে পুরনো মর্টার শেল বাইরে থেকে দেখতে ধাতব বস্তু মনে হলেও তার ভিতরে বিস্ফোরক অবশিষ্ট রয়েছে কি না, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। ফলে এই ধরনের কোনও বস্তু দেখতে পাওয়া গেলে সেটিকে স্পর্শ না করে দ্রুত পুলিশ বা প্রশাসনকে খবর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এবারের ঘটনায় মৎস্যজীবীদের সতর্কতার কারণেই বড়সড় বিপদ এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তাঁরা সন্দেহজনক বস্তুটি নিজেরা সরানোর চেষ্টা না করে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে খবর দেন। এরপর পুলিশ এসে এলাকাটি নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করে।

এখন মূল লক্ষ্য, শেলটি দ্রুত এবং নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করা। একই সঙ্গে ওই এলাকায় আরও কোনও পুরনো বিস্ফোরক রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু উদ্ধার হওয়া শেলটি নিষ্ক্রিয় করলেই হবে না। দামোদর নদের চর এবং সংলগ্ন এলাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ তল্লাশি চালানো দরকার। নদীর বালির নিচে বা চরের মাটিতে আরও মর্টার শেল কিংবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার অন্য কোনও বিস্ফোরক পড়ে আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁদের আরও দাবি, নদী সংলগ্ন এলাকায় সাধারণ মানুষ যাতে কোনও সন্দেহজনক বস্তু দেখতে পেলে সেটি স্পর্শ না করেন, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সচেতনতা বাড়ানো হোক। একদিকে সোমবার বিকেলে মাছ ধরতে গিয়ে মৎস্যজীবীদের চোখে পড়ল বিশালাকার ধাতব বস্তু, অন্যদিকে সেটি মর্টার শেল বলে সন্দেহ হওয়ার পরই দ্রুত পুলিশকে খবর দেওয়া—পুরো ঘটনায় আতঙ্কের পাশাপাশি স্বস্তিও রয়েছে। কারণ সময়মতো পুলিশকে খবর দেওয়ায় এলাকাটি দ্রুত ঘিরে ফেলা সম্ভব হয়েছে। তবে একই এলাকায় অতীতে তিনটি মর্টার শেল উদ্ধারের ঘটনার পর এবার ফের একই ধরনের শেল উদ্ধারের ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—দামোদরের চরে কি আরও এমন বিস্ফোরক লুকিয়ে রয়েছে? সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরীক্ষা করার পরই শেলটির প্রকৃত অবস্থা এবং সেটিকে নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। ততক্ষণ পর্যন্ত ঘটনাস্থলে পুলিশের নজরদারি থাকবে। সাধারণ মানুষকেও সতর্ক করা হয়েছে। আর স্থানীয়দের দাবি, ভবিষ্যতে বড়সড় দুর্ঘটনা এড়াতে দামোদর নদ ও সংলগ্ন চর এলাকায় দ্রুত প্রশাসনিক তল্লাশি চালানো হোক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত বলে সন্দেহ করা একটি মর্টার শেল, বহু বছর পর নদীর চর থেকে ফের উদ্ধার—সোনামুখীর এই ঘটনায় এখন একটাই প্রশ্ন, নদীর বুকে কিংবা বালির নিচে আরও কত পুরনো বিস্ফোরক এখনও লুকিয়ে রয়েছে ? সেই উত্তর খুঁজতেই এখন নজর প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।