Log in

দুর্গাপুর : দুর্গাপুরের গোপালমাঠে মিষ্টি ও ফাস্টফুডের দোকানে খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের অভিযানে উঠে এল চাঞ্চল্যকর ছবি। মিষ্টি তৈরির কারখানায় কিলবিল করছে আরশোলা! সেই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই তৈরি হচ্ছিল রকমারি মিষ্টি। কোথাও পড়ে রয়েছে বাসি খাবার, কোথাও আবার জমে রয়েছে দীর্ঘদিনের পচা মিষ্টির রস। শুধু তাই নয়, মিষ্টি তৈরিতে ব্যবহারের জন্য মজুত করে রাখা হয়েছিল বিভিন্ন ধরনের রং ও রাসায়নিক। খাদ্যের গুণমান এবং দোকানগুলির পরিচ্ছন্নতা নিয়ে অভিযোগের ভিত্তিতে সোমবার গোপালমাঠ এলাকায় একাধিক মিষ্টির দোকান, গোডাউন এবং খাবারের দোকানে অভিযান চালায় খাদ্য সুরক্ষা দপ্তর। অভিযান চলাকালীন আধিকারিকদের নজরে আসে একের পর এক অনিয়ম। মিষ্টি তৈরির জায়গায় অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে আরশোলা-সহ বিভিন্ন পোকামাকড়। যে জায়গায় মিষ্টি তৈরি হচ্ছিল, সেই একই পরিবেশে তা সংরক্ষণও করা হচ্ছিল।

খাদ্য তৈরির জায়গায় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশেষ করে মিষ্টির মতো খাবার তৈরির ক্ষেত্রে সামান্য অস্বাস্থ্যকর পরিবেশও খাবারের গুণমান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। কিন্তু গোপালমাঠের এই অভিযানে যে ছবি সামনে এসেছে, তা কার্যত চোখ কপালে তোলার মতো। মিষ্টি তৈরির কারখানার বিভিন্ন অংশে আরশোলার উপস্থিতি দেখতে পান খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের আধিকারিকরা। খাবার তৈরির জায়গায় পোকামাকড়ের এমন অবাধ বিচরণ কীভাবে চলছিল, তা নিয়েই উঠছে প্রশ্ন। পাশাপাশি কোথাও পড়ে ছিল বাসি খাবার, আবার কোথাও দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা পচা মিষ্টির রস উদ্ধার হয়। অভিযোগ, খাবার তৈরির পর সেগুলি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছিল না। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকেও নজর ছিল না। এর ফলে ওই পরিবেশে তৈরি খাবার সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেই আশঙ্কা।

এরপর অভিযান চলে ফাস্টফুডের দোকানগুলিতেও। সেখানেও সামনে আসে একাধিক অনিয়ম। একটি দোকান থেকে উদ্ধার হয় ছত্রাক ধরা মোমো। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় পড়ে থাকার কারণে ওই খাবারে ছত্রাক জন্মেছিল। এমন খাবার কেন এবং কীভাবে বিক্রির জন্য রাখা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। শুধু ছত্রাক ধরা মোমো নয়, ওই দোকান থেকে উদ্ধার হয় মেয়াদ উত্তীর্ণ মসলা। খাবার তৈরির জন্য মজুত রাখা মসলার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও তা কেন ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় রাখা হয়েছিল, তা নিয়ে তদন্তের বিষয় তৈরি হয়েছে। অভিযানকারীরা একটি গোডাউনেও তল্লাশি চালান। সেখান থেকে উদ্ধার হয়েছে বিভিন্ন ধরনের রং, কেমিক্যাল, বাসি খাবার এবং অন্যান্য অনুপযোগী সামগ্রী। বিশেষ করে মিষ্টি তৈরিতে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন ধরনের রং ও রাসায়নিক মজুত করে রাখার বিষয়টি নজরে আসে আধিকারিকদের। খাদ্য তৈরিতে ব্যবহৃত রং বা অন্যান্য উপকরণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ খাবারের সঙ্গে মেশানো কোনও উপাদান মানুষের শরীরে সরাসরি প্রবেশ করে। তাই কোন ধরনের রং ব্যবহার করা হচ্ছে, তা কীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে এবং সেটি খাদ্যে ব্যবহারের উপযুক্ত কি না—এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গোডাউন থেকে উদ্ধার হওয়া পচা ও বাসি খাবার ঘটনাস্থলেই নষ্ট করে ফেলে দেওয়া হয়। যাতে সেগুলি আর কোনওভাবেই সাধারণ মানুষের খাবার হিসেবে ব্যবহার বা বিক্রি করা না যায়, সেই ব্যবস্থা নেয় দপ্তর। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দোকান মালিকদের সতর্ক করা হয়। তবে শুধু সতর্ক করেই থেমে থাকেনি খাদ্য সুরক্ষা দপ্তর। নিয়ম না মানার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট দোকান মালিকদের জরিমানাও করা হয়েছে। ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়ম ফের সামনে এলে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের আধিকারিক শুভম ঘোষ জানান, একাধিক দোকানে চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের প্রমাণ মিলেছে। খাবার তৈরির জায়গায় পরিচ্ছন্নতার অভাব, পোকামাকড়ের উপস্থিতি এবং অনুপযোগী খাদ্যসামগ্রী মজুত রাখার মতো বিষয় সামনে এসেছে। নিয়ম মেনে খাবার তৈরি ও বিক্রি করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা হয়েছে। তিনি আরও স্পষ্ট করে জানান, খাদ্য সুরক্ষা সংক্রান্ত নিয়ম না মানলে আগামী দিনে আরও কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থাৎ শুধুমাত্র জরিমানা বা সতর্কবার্তা দিয়েই বিষয়টি শেষ হবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী আইন মেনে আরও কঠোর পদক্ষেপ করা হতে পারে। গোপালমাঠে এই অভিযানের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—যে দোকানগুলি থেকে প্রতিদিন সাধারণ মানুষ মিষ্টি এবং ফাস্টফুড কিনছেন, সেই খাবার কতটা নিরাপদ? বাইরে থেকে কোনও খাবার দেখতে ভালো হলেই যে সেটি স্বাস্থ্যসম্মত, এমনটা নয়। খাবার কোথায় তৈরি হচ্ছে, কী পরিবেশে তৈরি হচ্ছে, কীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে এবং কোন উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে—তার উপরও খাবারের নিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভর করে। বিশেষ করে মিষ্টির দোকানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ খাবার তৈরি হয়। উৎসব, অনুষ্ঠান কিংবা সাধারণ দিন—সব সময়ই মিষ্টির চাহিদা থাকে। ফলে উৎপাদনের জায়গায় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং তৈরি হওয়া মিষ্টি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।

একইভাবে ফাস্টফুডের ক্ষেত্রেও খাবারের কাঁচামাল, রান্নার জায়গা এবং সংরক্ষণ পদ্ধতির দিকে নজর দেওয়া দরকার। ছত্রাক ধরা মোমো কিংবা মেয়াদ উত্তীর্ণ মসলা উদ্ধারের ঘটনা সেই বিষয়টিই সামনে নিয়ে এসেছে। খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের এই অভিযান অবশ্য শুধু একটি বা দু’টি দোকানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নয়। এর মাধ্যমে এলাকার সমস্ত খাদ্য ব্যবসায়ীদের কাছেই একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে—মানুষের খাবার নিয়ে কোনও রকম গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না। খাদ্য ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের দায়িত্ব রয়েছে খাবারের মান বজায় রাখার। দোকান ও কারখানার পরিবেশ পরিষ্কার রাখা, নিয়মিত পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করা, বাসি ও পচা খাবার আলাদা করে নষ্ট করা, মেয়াদ উত্তীর্ণ খাদ্যসামগ্রী ব্যবহার না করা এবং খাদ্যে ব্যবহৃত রং ও অন্যান্য উপকরণ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা—সবকিছুই নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে প্রশাসনের নজরদারিও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত অভিযান এবং পরিদর্শনের মাধ্যমে যদি এই ধরনের অনিয়ম চিহ্নিত করা যায়, তাহলে খাদ্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের কাছেও নিরাপদ খাবার পৌঁছনোর সম্ভাবনা বাড়বে। গোপালমাঠের সোমবারের অভিযানে একাধিক দোকান, গোডাউন এবং খাবার তৈরির জায়গায় যে ছবি সামনে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। আরশোলার উপস্থিতির মধ্যে মিষ্টি তৈরি, পচা মিষ্টির রস, বাসি খাবার, ছত্রাক ধরা মোমো, মেয়াদ উত্তীর্ণ মসলা এবং বিভিন্ন ধরনের রং ও রাসায়নিক মজুত—একসঙ্গে এতগুলি অনিয়ম সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।

উদ্ধার হওয়া অনুপযোগী খাবার ঘটনাস্থলেই নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দোকান মালিকদের সতর্ক করার পাশাপাশি জরিমানাও করা হয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের তরফে জানানো হয়েছে, নিয়ম ভাঙার ঘটনা ফের সামনে এলে আগামী দিনে আরও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এই ঘটনার পর সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। খাবার কেনার সময় শুধু দাম বা স্বাদের দিকে নয়, খাবারটি কীভাবে রাখা হয়েছে, দোকানের পরিবেশ কেমন এবং খাবারটি তাজা কি না—সেদিকেও নজর রাখা দরকার। কোনও খাবার নিয়ে সন্দেহ হলে তা না খাওয়াই নিরাপদ। গোপালমাঠের এই অভিযান তাই শুধুমাত্র অনিয়ম ধরার অভিযান নয়, একই সঙ্গে খাদ্যের গুণমান এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। আরশোলার দাপটের মধ্যেই মিষ্টি তৈরি থেকে শুরু করে ছত্রাক ধরা মোমো এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ মসলা উদ্ধার—খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের অভিযানে সামনে এল একের পর এক চাঞ্চল্যকর ছবি। দপ্তরের কড়া বার্তা, খাদ্য তৈরিতে বা বিক্রিতে নিয়ম ভাঙলে আর কোনও রকম ছাড় নয়। প্রয়োজনে আগামী দিনে আরও কঠোর আইনি পদক্ষেপ করা হবে। এখন দেখার, গোপালমাঠের এই অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট দোকান ও খাদ্য ব্যবসায়ীরা কতটা সতর্ক হন এবং এলাকার অন্যান্য খাদ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও নজরদারি কতটা বাড়ানো হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *