This site uses cookies for analytics and to improve your experience. By clicking Accept, you consent to our use of cookies. Learn more in our privacy policy.
কলকাতা : আইপিএলের মঞ্চে প্রতি মরসুমেই উঠে আসে নতুন নায়ক। কেউ ব্যাট হাতে, কেউ বা বল হাতে চমক দেখিয়ে রাতারাতি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন। এবারের মরসুমে সেই তালিকায় দ্রুত উঠে আসছেন এক তরুণ পেসার—অশোক শর্মা। গতি, আগ্রাসন আর আত্মবিশ্বাস—এই তিনের মিশেলে তিনি ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছেন ক্রিকেটপ্রেমীদের। বর্তমানে Gujarat Titans-এর হয়ে খেলছেন এই ২৩ বছরের বোলার। শুরু থেকেই তাঁর পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো, তবে সম্প্রতি Rajasthan Royals-এর বিরুদ্ধে ম্যাচে তিনি যেন নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করে ফেললেন। সেই ম্যাচেই তিনি এমন একটি ডেলিভারি করেন, যার গতি ছিল ঘণ্টায় ১৫৪.২ কিলোমিটার—এই মরসুমের দ্রুততম বল। এই একটি ডেলিভারিই তাঁকে রাতারাতি ‘হট টপিক’ করে তুলেছে ক্রিকেট মহলে। রাজস্থানের ইনিংসের ১৬তম ওভারে সেই মুহূর্তটি তৈরি হয়। অশোক তাঁর রান-আপ শুরু করেন স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই, কিন্তু বল ছাড়ার মুহূর্তে গতি আর নিখুঁত লাইনে ব্যাটারকে চমকে দেন। ব্যাট হাতে ছিলেন ধ্রুব জুরেল। ইয়র্কার লেন্থে করা সেই বল ব্যাটে লেগে সোজা প্যাডে লাগে। যদিও উইকেট পাননি, কিন্তু সেই ডেলিভারি যে কতটা মারাত্মক ছিল, তা বুঝতে কারও বাকি থাকেনি। এই এক বলই নয়, গোটা ম্যাচ জুড়েই অশোকের বোলিং ছিল আক্রমণাত্মক। তিনি মোট ৪ ওভার বল করে ৩৭ রান দিয়ে ১টি উইকেট নেন। পরিসংখ্যান হয়তো খুব অসাধারণ নয়, কিন্তু তাঁর বোলিংয়ের গতি এবং ধার রাজস্থানের ব্যাটারদের স্পষ্টভাবেই চাপে ফেলে দেয়। বিশেষ করে ডেথ ওভারে তাঁর ইয়র্কার এবং শর্ট বলের মিশ্রণ গুজরাটের জন্য বড় সম্পদ হয়ে উঠেছে। ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে তিনি এখন ‘রফতার সিং’ নামেই পরিচিত। এই নামের পেছনে কারণও স্পষ্ট—তাঁর বলের গতি। আধুনিক ক্রিকেটে যেখানে ১৪০-১৪৫ কিমি গতিই অনেক সময় যথেষ্ট বলে মনে করা হয়, সেখানে ১৫০-এর ওপর গতি বজায় রাখা সত্যিই বিরল দক্ষতা। অশোক সেই জায়গাতেই নিজেকে আলাদা করে তুলছেন।
গতির ঝড়ে আইপিএল কাঁপালেন অশোক শর্মা, নতুন স্পিডস্টারে মুগ্ধ ক্রিকেটমহল
তবে এই সাফল্য একদিনে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ পরিশ্রম এবং সংগ্রামের গল্প। ২০০২ সালের ১৭ জুন জন্ম অশোকের। রাজস্থানের একটি ছোট গ্রাম জয়পুরায় তাঁর বেড়ে ওঠা। তাঁর বাবা নাথুলাল শর্মা পেশায় একজন কৃষক। সাধারণ পরিবারে বড় হওয়া এই ছেলের ক্রিকেটযাত্রা শুরু হয়েছিল খুবই সাধারণভাবে। স্কুলে পড়ার সময়ই তাঁর বোলিং প্রতিভা নজরে আসে কোচদের। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর গতি এবং বাউন্স অন্যদের থেকে আলাদা ছিল। সেই সময় থেকেই তাঁকে নিয়ে আলাদা করে ভাবা শুরু হয়। ধীরে ধীরে জেলা স্তর, তারপর রাজ্য স্তরে সুযোগ পান তিনি। এরপর আসে Syed Mushtaq Ali Trophy-তে খেলার সুযোগ। এই টুর্নামেন্টে তাঁর পারফরম্যান্স অনেকের নজর কেড়ে নেয়। ধারাবাহিকভাবে দ্রুত গতিতে বল করা এবং সুইংয়ের ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। সেখান থেকেই আইপিএলের দরজা খুলে যায় তাঁর জন্য। ২০২২ সালে Kolkata Knight Riders তাঁকে ৫৫ লক্ষ টাকায় দলে নেয়। এটি ছিল তাঁর কেরিয়ারের একটি বড় মাইলস্টোন। তবে প্রথম সুযোগেই মূল দলে জায়গা পাওয়া সহজ ছিল না। নেটে বড় বড় ব্যাটারদের বিপক্ষে ভালো পারফরম্যান্স করলেও ম্যাচে নামার সুযোগ পাননি তিনি। ফলে পুরো মরসুমটাই তাঁকে বেঞ্চে বসেই কাটাতে হয়। এরপর ২০২৫ সালে Rajasthan Royals তাঁকে ৩০ লক্ষ টাকায় দলে নেয়। নিজের রাজ্যের হয়ে খেলার সুযোগ পাওয়াটা নিঃসন্দেহে বিশেষ ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য এখানেও পিছু ছাড়েনি। সেই মরসুমেও তিনি একাদশে জায়গা করে নিতে পারেননি। তবে এই সব ব্যর্থতা তাঁকে ভেঙে দেয়নি। বরং আরও কঠোর পরিশ্রম করতে অনুপ্রাণিত করেছে। অবশেষে ২০২৬ মরসুমে Gujarat Titans তাঁকে দলে নেয়। আর এখানেই তিনি নিজের প্রতিভার সঠিক মঞ্চ খুঁজে পেয়েছেন। এই মরসুমে সুযোগ পেয়েই তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, কেন তাঁকে এতদিন ধরে ‘ওয়াচলিস্ট’-এ রাখা হয়েছিল। মাত্র দুই ম্যাচেই তাঁর পারফরম্যান্স ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের নজর কেড়েছে। বিশেষ করে তাঁর বোলিং অ্যাকশন, গতি এবং নিয়ন্ত্রণ দেখে অনেকেই মনে করছেন, খুব শীঘ্রই তিনি জাতীয় দলের দরজায় কড়া নাড়বেন। ভারতের পেস বোলিং আক্রমণে গত কয়েক বছরে যে পরিবর্তন এসেছে, সেখানে অশোকের মতো একজন বোলারের উপস্থিতি আরও শক্তি যোগ করতে পারে। বিশেষ করে ডেথ ওভারে তাঁর ইয়র্কার দক্ষতা এবং বাউন্স তৈরি করার ক্ষমতা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও কার্যকর হতে পারে। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, অশোকের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর মানসিক দৃঢ়তা। এতবার সুযোগ না পাওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজের ফিটনেস এবং দক্ষতা ধরে রেখেছেন। এই মানসিকতা থাকলে বড় মঞ্চে সফল হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। সব মিলিয়ে, অশোক শর্মার এই উত্থান যেন একটি অনুপ্রেরণার গল্প। ছোট গ্রাম থেকে উঠে এসে আইপিএলের মতো মঞ্চে নিজের ছাপ রাখা—এটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং অসংখ্য তরুণ ক্রিকেটারের স্বপ্নকে নতুন করে উজ্জীবিত করছে। এখন দেখার, এই ধারাবাহিকতা তিনি কতটা বজায় রাখতে পারেন। তবে আপাতত এটুকু নিশ্চিত—ভারতীয় ক্রিকেট নতুন এক ‘স্পিডস্টার’-এর খোঁজ পেয়েছে, যার গতি আর আগ্রাসন আগামী দিনে আরও বড় মঞ্চ কাঁপাতে পারে।