This site uses cookies for analytics and to improve your experience. By clicking Accept, you consent to our use of cookies. Learn more in our privacy policy.
দুর্গাপুর : মধ্যপ্রদেশের ভোপালের বিস্তীর্ণ মাঠে এক অভিনব দৃশ্য নজর কাড়ল উপস্থিত কৃষক, গবেষক এবং দর্শকদের। স্টিয়ারিং হাতে নিয়ে ব্যাটারি চালিত একটি আধুনিক ই-ট্রাক্টর চালাচ্ছেন এক মহিলা। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষকদের চোখে বিস্ময়, কৌতূহল আর আগ্রহ। কারণ এই ই-ট্রাক্টর তৈরি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পশহর দুর্গাপুরে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি এই বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্র কৃষিক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি ভোপালে আয়োজিত এক বিশেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে দুর্গাপুরের সিএমইআরআই-তে তৈরি ব্যাটারি চালিত ই-ট্রাক্টর ও ই-টিলার প্রদর্শন করা হয়। টেকসই কৃষি, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রায় ২৫০ জন কৃষক, কৃষি গবেষক, ছাত্রছাত্রী এবং সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা। প্রদর্শনীতে দেখানো হয় কীভাবে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষির উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব, পাশাপাশি পরিবেশের উপর চাপ কমানো যায়। বর্তমানে কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত অধিকাংশ ট্রাক্টরই ডিজেলচালিত। এর ফলে একদিকে যেমন জ্বালানির খরচ বাড়ে, অন্যদিকে পরিবেশ দূষণের সমস্যাও তৈরি হয়। সেই জায়গাতেই নতুন বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে ব্যাটারি চালিত ই-ট্রাক্টর। দুর্গাপুরের সিএমইআরআই-এর বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে এই ই-ট্রাক্টর ও ই-টিলার তৈরি করেছেন। এই কৃষিযন্ত্রগুলো সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক শক্তিতে চলে, ফলে এতে ডিজেলের প্রয়োজন নেই। এর ফলে জ্বালানি খরচ অনেকটাই কমে যায় এবং পরিবেশে কার্বন নির্গমনও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। প্রদর্শনী চলাকালীন উপস্থিত কৃষকদের সামনে মাঠে সরাসরি ট্রায়াল দেওয়া হয় এই ই-ট্রাক্টরের। সেখানে এক মহিলা স্টিয়ারিং হাতে তুলে নিয়ে ট্রাক্টর চালান, যা উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহের সৃষ্টি করে। অনেক কৃষকই আগ্রহ নিয়ে ট্রাক্টরের কার্যক্ষমতা দেখেন এবং এর প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানতে চান। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ই-ট্রাক্টর ছোট এবং খণ্ডিত জমিতে চাষের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। ভারতের অধিকাংশ কৃষকের জমির পরিমাণ খুব বেশি নয়। ছোট জমিতে বড় ডিজেল ট্রাক্টর ব্যবহার করা অনেক সময় অসুবিধাজনক হয়ে পড়ে। সেখানে আকারে ছোট এবং সহজে নিয়ন্ত্রণযোগ্য এই বৈদ্যুতিক ট্রাক্টর কৃষকদের জন্য অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। শুধু তাই নয়, এই ই-ট্রাক্টরের শব্দও খুব কম। সাধারণ ডিজেল ট্রাক্টর চালানোর সময় যে উচ্চ শব্দ হয়, এই বৈদ্যুতিক ট্রাক্টরে সেই সমস্যা নেই বললেই চলে। প্রায় নিঃশব্দে কাজ করতে পারে এই যন্ত্র। ফলে কৃষকদের কাজ করার সময় শারীরিক ক্লান্তি কম হবে এবং আশেপাশের পরিবেশও শান্ত থাকবে।
দুর্গাপুরে তৈরি ই-ট্রাক্টর ভোপালের মাঠে, কৃষিতে নতুন প্রযুক্তির দিগন্ত
এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন সংস্থার ডিরেক্টর নরেশ চন্দ্র মূর্মু। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, “আমরা এমন প্রযুক্তি তৈরি করতে চাই যা কৃষকদের জীবনকে সহজ করবে। অতীতে কৃষিযন্ত্র ছিল ভারী, শব্দময় এবং ব্যয়বহুল। কিন্তু এখন আমরা চেষ্টা করছি এমন যন্ত্র তৈরি করতে যা পরিবেশবান্ধব, কম খরচে চালানো যায় এবং কৃষকদের পরিশ্রমও কমায়।” তিনি আরও জানান, এই ই-ট্রাক্টরের মাধ্যমে শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়নই নয়, কৃষকদের স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ ডিজেলচালিত যন্ত্রের ধোঁয়া ও শব্দ দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে কৃষকদের স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব পড়ে। সেই সমস্যার সমাধান হিসেবেই বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্রের উন্নয়ন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানের শেষপর্বে মাঠে সরাসরি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সেখানে উপস্থিত কৃষকদের হাতে-কলমে ট্রাক্টর চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়। অনেক কৃষকই প্রথমবার এই ধরনের বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্র চালিয়ে দেখেন এবং তাদের অভিজ্ঞতা জানান। কেউ কেউ বলেন, ট্রাক্টরটি চালানো অনেক সহজ এবং এতে কম শক্তি লাগে। কৃষি গবেষকদের মতে, আগামী দিনে ভারতের কৃষিক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার দ্রুত বাড়তে পারে। কারণ ডিজেলের দাম ক্রমাগত বাড়ছে এবং পরিবেশ দূষণ নিয়েও সচেতনতা বাড়ছে। সেই পরিস্থিতিতে ই-ট্রাক্টর ও ই-টিলার কৃষকদের জন্য একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। এছাড়া এই প্রযুক্তি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্রের উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে নতুন উদ্যোক্তাদের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এতে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের আশা, দুর্গাপুরে তৈরি এই আধুনিক বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্র শুধু দেশের বিভিন্ন রাজ্যেই নয়, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে। কারণ টেকসই কৃষি এখন বিশ্বজুড়েই একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষিকে আরও উন্নত করার চেষ্টা চলছে বিভিন্ন দেশে। সেই প্রেক্ষাপটে দুর্গাপুরের গবেষকদের এই উদ্যোগ একটি বড় পদক্ষেপ বলেই মনে করা হচ্ছে। তাদের বিশ্বাস, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি আরও উন্নত হবে এবং দেশের কোটি কোটি কৃষকের কাছে পৌঁছে যাবে। ভোপালের মাঠে সেই সম্ভাবনারই যেন এক ঝলক দেখা গেল। একদিকে আধুনিক প্রযুক্তি, অন্যদিকে কৃষকদের আগ্রহ—সব মিলিয়ে এই ই-ট্রাক্টর প্রদর্শনী যেন ভারতের কৃষির ভবিষ্যতের একটি নতুন ছবি তুলে ধরল। দুর্গাপুরে তৈরি এই বৈদ্যুতিক কৃষিযন্ত্র আগামী দিনে কৃষিক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলেই আশাবাদী গবেষকরা।