তাঁতের কাপড়ে তেরঙ্গা, রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পৌঁছবে ফুলিয়ার পতাকা

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
নদিয়া : স্বাধীনতার আবেগ এবার মিশে যাচ্ছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী তাঁতের বুননে। ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ এবং আত্মনির্ভর ভারতের ভাবনাকে সামনে রেখে অভিনব উদ্যোগ নদিয়ার ফুলিয়ার রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত তাঁতশিল্পী বীরেন কুমার বসাকের। বাংলার ঐতিহ্যবাহী হস্তচালিত তাঁতের কাপড়ে তৈরি হচ্ছে ভারতের জাতীয় পতাকা। স্বাধীনতা দিবসের আগে দেশের প্রতি ভালোবাসা আর বাংলার তাঁতশিল্পের ঐতিহ্যকে এক সুতোয় বেঁধে তৈরি করা হচ্ছে এই বিশেষ তেরঙ্গা। সাধারণত জাতীয় পতাকা তৈরি হয় নির্দিষ্ট নিয়ম ও মানদণ্ড মেনে। কিন্তু এবার সেই জাতীয় পতাকার রঙে, বুননে এবং তৈরির পদ্ধতিতে যুক্ত হচ্ছে বাংলার নিজস্ব তাঁতশিল্পের ঐতিহ্য। নদিয়ার ফুলিয়ার তাঁতশিল্পী বীরেন কুমার বসাকের তত্ত্বাবধানে সম্পূর্ণ সুতি সুতো ব্যবহার করে টাঙ্গাইল পদ্ধতিতে তৈরি হচ্ছে এই বিশেষ জাতীয় পতাকা। স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে প্রায় এক মাস ধরে চলছে এই কাজ। একদিকে তাঁতের খটখট শব্দ, অন্যদিকে গেরুয়া, সাদা ও সবুজ সুতোর নিখুঁত বুনন—সব মিলিয়ে ফুলিয়ার তাঁতপাড়ায় যেন তৈরি হয়েছে অন্যরকম এক আবহ। এই উদ্যোগের বিশেষত্ব শুধু জাতীয় পতাকা তৈরি করাতেই নয়। দেশের জাতীয় পতাকাকে বাংলার ঐতিহ্যবাহী হস্তচালিত তাঁতের সঙ্গে যুক্ত করাই এই উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। অর্থাৎ একদিকে দেশাত্মবোধ, অন্যদিকে স্বদেশি শিল্পের প্রতি সম্মান—দুই ভাবনাকেই একসঙ্গে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা। প্রায় ৩৬ বছর ধরে তাঁতশিল্পের সঙ্গে যুক্ত বীরেন কুমার বসাক। দীর্ঘ এই কর্মজীবনে তাঁর দক্ষতা এবং সৃষ্টিশীলতার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁর ঝুলিতে এসেছে জাতীয় ও রাষ্ট্রপতি পুরস্কার। তাঁতশিল্পের জগতে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন তিনি। এবার সেই অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগিয়ে দেশের জাতীয় পতাকা বুনছেন তিনি নিজেই। তবে জাতীয় পতাকা তৈরি করা তাঁর জন্য একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা। বীরেন বসাক জানান, এর আগে কখনও জাতীয় পতাকা তৈরি করেননি তিনি। ফলে প্রথমদিকে কাজ করতে গিয়ে কিছুটা সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছিল। পতাকার মাপ, নকশা, রঙের বিন্যাস এবং বুননের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়েছে। তবে অভিজ্ঞ সহকর্মী তাঁতশিল্পীদের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে সেই সমস্যা কাটিয়ে ওঠেন তিনি। একসঙ্গে কাজ করতে করতে সহজ হয়ে আসে বুননের পদ্ধতি। আর তারপরই শুরু হয় একের পর এক তেরঙ্গা তৈরির কাজ। একটি পতাকা তৈরি করতে সময় লাগছে প্রায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা। অর্থাৎ একটি পতাকার পিছনে রয়েছে দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম, নিখুঁত কারিগরি এবং অসংখ্যবার সুতো সামলানোর দক্ষতা। মেশিনে দ্রুত উৎপাদনের পরিবর্তে হাতের তাঁতে প্রতিটি পতাকা তৈরি হওয়ায় এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কারিগরের নিজস্ব শ্রম ও আবেগ। ইতিমধ্যেই ১০ থেকে ১২টি পতাকা তৈরি হয়ে গিয়েছে। মোট ১৫ থেকে ২০টি জাতীয় পতাকা তৈরির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তৈরি হওয়া এই বিশেষ পতাকাগুলি পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে রাষ্ট্রপতি ভবন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দফতর, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দফতর এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ভবনে। একজন তাঁতশিল্পীর হাতে তৈরি জাতীয় পতাকা দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদাধিকারী থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ভবনে পৌঁছবে—এই ভাবনাই স্বাভাবিকভাবেই গর্বিত করছে ফুলিয়ার তাঁতশিল্পীকে।
তাঁতের কাপড়ে তেরঙ্গা, রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পৌঁছবে ফুলিয়ার পতাকা
ফুলিয়ার তাঁতে বোনা তেরঙ্গা ! রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর জন্য তৈরি হচ্ছে বিশেষ জাতীয় পতাকা
বীরেন বসাকের কথায়, নিজের হাতে দেশের জাতীয় পতাকা তৈরি করতে পারা তাঁর কাছে অত্যন্ত গর্বের বিষয়। এত বছর ধরে তাঁত বুনেছেন, নানা ধরনের শাড়ি ও পোশাক তৈরি করেছেন। কিন্তু দেশের জাতীয় পতাকা বোনা তাঁর কাছে সম্পূর্ণ আলাদা অনুভূতি। কারণ এই পতাকা শুধুমাত্র একটি কাপড়ের টুকরো নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ঐক্য এবং মানুষের আবেগ। সেই পতাকা নিজের হাতে তৈরি করার সুযোগ পাওয়াকে তাই বিশেষ সম্মানের বলেই মনে করছেন তিনি। এই কাজে সহযোগিতা করছেন তাঁর স্ত্রী অঞ্জনা বসাকও। দীর্ঘদিন ধরে নলি পাকানোর কাজে যুক্ত তিনি। তাঁতশিল্পের সঙ্গে তাঁরও দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। স্বামীর এই বিশেষ উদ্যোগে তিনিও পাশে দাঁড়িয়েছেন। জাতীয় পতাকা তৈরির কাজে যুক্ত হতে পেরে তাঁরও ভালো লাগছে বলে জানান অঞ্জনা বসাক। তাঁতের কাজে প্রতিটি ধাপেরই আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। সুতো প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে নলি পাকানো, তাঁতে সুতো বসানো এবং শেষ পর্যন্ত কাপড় তৈরি—প্রতিটি পর্যায়েই দরকার অভিজ্ঞতা ও ধৈর্য। ফলে এই জাতীয় পতাকা তৈরির নেপথ্যেও শুধু একজন শিল্পীর শ্রম নেই, রয়েছে একাধিক মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আর সেই কারণেই ফুলিয়ার এই উদ্যোগ বাংলার তাঁতশিল্পের জন্যও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নদিয়ার ফুলিয়া দীর্ঘদিন ধরেই বাংলার তাঁতশিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানকার তাঁতশিল্পীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নিজেদের দক্ষতা ও শিল্পকর্মের মাধ্যমে বাংলার ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। সময়ের সঙ্গে আধুনিক যন্ত্র এবং বাজারের পরিবর্তনের চাপ এলেও এখনও হাতের তাঁতের সেই স্বতন্ত্র সৌন্দর্য ও কারিগরি দক্ষতার কদর রয়েছে। এবার সেই ঐতিহ্যই যুক্ত হল দেশের জাতীয় পতাকার সঙ্গে। ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ কর্মসূচির মাধ্যমে স্বাধীনতা দিবসের সময় দেশের প্রতিটি ঘরে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের বার্তা দেওয়া হয়। তার পাশাপাশি ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর ভাবনাতেও দেশীয় শিল্প, কারিগর এবং স্বনির্ভরতার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফুলিয়ার এই উদ্যোগ যেন সেই দুই ভাবনাকেই একসঙ্গে সামনে নিয়ে আসছে। একদিকে দেশের প্রতি ভালোবাসা, অন্যদিকে দেশীয় শিল্পের প্রতি সম্মান। একদিকে জাতীয় পতাকা, অন্যদিকে বাংলার ঐতিহ্যবাহী তাঁত। আর সেই দুইয়ের মেলবন্ধন ঘটছে ফুলিয়ার তাঁতে। স্বাধীনতার আগে যখন দেশজুড়ে তেরঙ্গাকে ঘিরে নানা কর্মসূচি চলছে, তখন নদিয়ার এই তাঁতপাড়াতেও চলছে ব্যস্ততা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁতের শব্দের মধ্যে তৈরি হচ্ছে একের পর এক জাতীয় পতাকা। প্রতিটি পতাকার সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে শিল্পীর পরিশ্রম এবং দেশাত্মবোধের আবেগ। একটি পতাকা তৈরি করতে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা সময় লাগলেও শিল্পীর কাছে সেই সময় যেন পরিশ্রম নয়, বরং গর্বের। কারণ নিজের হাতের তৈরি একটি জাতীয় পতাকা যখন দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভবনে পৌঁছবে, তখন সেই মুহূর্ত নিঃসন্দেহে তাঁর দীর্ঘ তাঁতজীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। এই উদ্যোগ তাই শুধুমাত্র কয়েকটি তেরঙ্গা তৈরির গল্প নয়। এটি বাংলার মাটিতে জন্ম নেওয়া এক ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সঙ্গে দেশের জাতীয় আবেগের মিলন। ফুলিয়ার তাঁতের সুতোয় এবার বোনা হচ্ছে দেশপ্রেমের রং। গেরুয়া, সাদা আর সবুজের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে এক শিল্পীর স্বপ্ন, এক পরিবারের পরিশ্রম এবং বাংলার ঐতিহ্য। স্বাধীনতার আগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যখন উঠবে তেরঙ্গা, তখন সেই পতাকার সারিতে ফুলিয়ার হাতের তাঁতে তৈরি পতাকাও জায়গা করে নেবে—এই প্রত্যাশাতেই এখন দিন গুনছেন বীরেন কুমার বসাক এবং তাঁর সহকর্মীরা। তাঁতের খটখট শব্দের সঙ্গে এবার যেন শোনা যাচ্ছে দেশপ্রেমের সুর। বাংলার মাটিতে, বাংলার তাঁতে তৈরি হচ্ছে দেশের পতাকা—এটাই ফুলিয়ার এই অভিনব উদ্যোগের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram