হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল ECL-র জলট্যাংকি !

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
অন্ডাল : বুধবার ভোরের শান্ত পরিবেশ। দিনের কাজ শুরু হওয়ার আগেই আচমকা কেঁপে ওঠে গোটা এলাকা। বিকট শব্দে মুহূর্তের মধ্যে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেড বা ইসিএলের প্রায় ৭০ বছরের পুরনো একটি কংক্রিটের জলট্যাংকি। ঘটনাটি ঘটেছে পশ্চিম বর্ধমান জেলার অন্ডালের ইসিএলের বাকোলা এরিয়ার শ্যামসুন্দরপুর কোলিয়ারিতে। বুধবার সকাল প্রায় ছ’টা নাগাদ আচমকাই এই বিপর্যয় নেমে আসে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, প্রথমে জোরালো ফাটলের শব্দ শোনা যায়। এরপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিশালাকার কংক্রিটের জলট্যাংকিটি ধসে পড়ে। ধুলোর ঘন মেঘে ঢেকে যায় গোটা এলাকা। আতঙ্কে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দুর্ঘটনার সময় আশপাশে কর্মরত ছিলেন ইসিএলের কয়েকজন কর্মী। ধসে পড়া কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপের আঘাতে গুরুতর জখম হন দুই কর্মী—সঙ্গীতা দেবী এবং প্রভাবতী ভূঁইয়া। ঘটনার পরপরই সহকর্মীরা দ্রুত তাঁদের উদ্ধার করেন। তারপর তড়িঘড়ি তাঁদের দুর্গাপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে সেখানে তাঁদের চিকিৎসা চলছে। যদিও এই দুর্ঘটনায় কোনও প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। তবে বড়সড় প্রাণহানি অল্পের জন্য এড়ানো গিয়েছে বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা। কারণ, ঘটনার সময় যদি এলাকায় আরও বেশি কর্মী উপস্থিত থাকতেন, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই জলট্যাংকিটি বহু দশক ধরে এলাকার অন্যতম প্রধান পানীয় জলের উৎস ছিল। প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মানুষের বাড়িতে এই ট্যাংকি থেকেই পানীয় জল সরবরাহ করা হতো। ফলে ট্যাংকি ধসে পড়ার পর থেকেই দেখা দিয়েছে তীব্র জলসংকটের আশঙ্কা। এলাকার বাসিন্দাদের প্রশ্ন, এত পুরনো একটি জলট্যাংকি নিয়মিত পরীক্ষা করা হচ্ছিল কি ? তার কাঠামোগত শক্তি বা স্থায়িত্ব নিয়ে কোনও সমীক্ষা হয়েছিল কি ? যদি ট্যাংকিটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল, তাহলে আগে থেকেই কেন তা ব্যবহার বন্ধ করা হল না ? এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখন খুঁজছেন স্থানীয় মানুষ। দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছান বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন এবং ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই এই জলট্যাংকির অবস্থা অত্যন্ত খারাপ ছিল। একাধিক জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছিল বলেও দাবি তাঁদের।
হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল ECL-র জলট্যাংকি !
৭০ বছরের পুরনো জলট্যাংকি ধসে চাঞ্চল্য ! জখম ২ ইসিএল কর্মী

তবুও স্থায়ী সমাধানের পরিবর্তে বারবার অস্থায়ী মেরামত করে ট্যাংকিটিকে ব্যবহার করা হচ্ছিল। শ্রমিক সংগঠনগুলির বক্তব্য, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। কিন্তু সেই ক্ষেত্রে যথেষ্ট গাফিলতি হয়েছে বলেই তাঁদের অভিযোগ। তাঁরা অবিলম্বে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে দ্রুত নতুন একটি আধুনিক জলট্যাংকি নির্মাণের দাবিও তুলেছেন। কারণ, পানীয় জলের পরিষেবা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। ঘটনার পর নিরাপত্তার স্বার্থে ধসে পড়া ট্যাংকির চারপাশের এলাকা ব্যারিকেড করে দেওয়া হয়েছে। কেউ যাতে ধ্বংসস্তূপের কাছে যেতে না পারেন, সেজন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজও শুরু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত এই ঘটনার বিষয়ে ইসিএল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে জল্পনা অব্যাহত রয়েছে। কাঠামোর অতিরিক্ত পুরনো হয়ে যাওয়া, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, নাকি অন্য কোনও প্রযুক্তিগত ত্রুটি—কী কারণে এই বিপর্যয় ঘটল, তা তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পাঞ্চলে বহু পুরনো পরিকাঠামো এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে। সময়মতো সেগুলির স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা ‘স্ট্রাকচারাল অডিট’ না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই শুধু এই একটি ঘটনার তদন্ত নয়, শিল্পাঞ্চলের অন্যান্য পুরনো জলট্যাংকি, ভবন এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোরও জরুরি ভিত্তিতে নিরাপত্তা পরীক্ষা করার দাবি উঠছে। এদিকে আহত দুই কর্মীর দ্রুত আরোগ্য কামনা করছেন সহকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। একইসঙ্গে সকলের একটাই দাবি—এই ঘটনার প্রকৃত কারণ সামনে আসুক এবং ভবিষ্যতে যাতে আর কোনও শ্রমিক বা সাধারণ মানুষ এ ধরনের দুর্ঘটনার শিকার না হন, তার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। অন্ডালের শ্যামসুন্দরপুর কোলিয়ারির এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, শিল্পাঞ্চলের পুরনো পরিকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি। কারণ, সামান্য অবহেলাও কখনও কখনও বড়সড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠতে পারে। এখন সকলের নজর তদন্তের দিকে। তদন্তে কী উঠে আসে এবং ইসিএল ভবিষ্যতে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেটাই দেখার।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram