ফের বাঘের হামলায় মৃত্যু মৎস্যজীবীর !

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
দঃ ২৪ পরগনা : সুন্দরবনের বাঘ আবারও কেড়ে নিল এক মানুষের প্রাণ। কুলতলীতে ফের বাঘের হামলায় মৃত্যু হল এক মৎস্যজীবীর। জীবিকার তাগিদে জঙ্গলে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণের শিকার হন তিনি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পরিবার থেকে গোটা এলাকাজুড়ে। একই সঙ্গে সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা এবং জীবিকার সংকট নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। জানা গিয়েছে, মৃত ব্যক্তির নাম রামপ্রসাদ বাগানি। তিনি দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলতলী ব্লকের দেউলবাড়ি এলাকার বাসিন্দা। স্থানীয় সূত্রে খবর, গত শুক্রবার তিনি তাঁর দুই সঙ্গী শম্ভু নস্কর এবং দেবপ্রসাদ নাইয়াকে সঙ্গে নিয়ে মধু সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। তিনজনই চাপাদারের ঘাট থেকে নৌকায় করে সুন্দরবনের দোবাকী এলাকায় যান। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই রামপ্রসাদ বাগানি জঙ্গলে গিয়ে মধু সংগ্রহ এবং মাছ ধরার কাজ করতেন। সেই আয়েই চলত তাঁর সংসার। এলাকার আরও বহু মানুষের মতো তিনিও জীবিকার সন্ধানে বারবার সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করতেন। কিন্তু এবার আর বাড়ি ফেরা হল না তাঁর। অভিযোগ, শুক্রবার বিকেলের দিকে তিনজন মিলে জঙ্গলের মধ্যে মধু সংগ্রহ করছিলেন। সেই সময় আচমকাই একটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে রামপ্রসাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঘটনাটি এতটাই আকস্মিক ছিল যে প্রথমে কিছুই বুঝে উঠতে পারেননি তাঁর সঙ্গীরা। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে থাকা সঙ্গীদের দাবি, বাঘটি মুহূর্তের মধ্যে রামপ্রসাদকে আক্রমণ করে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তাঁরা প্রাণপণ চেষ্টা করেন তাঁকে উদ্ধার করার। চিৎকার-চেঁচামেচি করে এবং বিভিন্ন উপায়ে বাঘটিকে তাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বাঘের আক্রমণ এতটাই ভয়ঙ্কর ছিল যে শেষ পর্যন্ত তাঁরা সফল হননি। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বাঘের গর্জন এবং পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে প্রাণ বাঁচাতে ঘটনাস্থল ছেড়ে ফিরে আসতে বাধ্য হন রামপ্রসাদের দুই সঙ্গী। পরে তাঁরা এলাকায় ফিরে এসে পুরো ঘটনার কথা জানান। খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় শোক এবং আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়। ঘটনার পর মৃতের পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। তাঁদের দাবি, সংসারের প্রধান উপার্জনকারী ছিলেন রামপ্রসাদ। তাঁর মৃত্যুর ফলে পরিবার কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়েছে। পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রতিবেশীরাও।
ফের বাঘের হামলায় মৃত্যু মৎস্যজীবীর !
কুলতলীতে ফের বাঘের হামলা, মধু সংগ্রহে গিয়ে মৃত্যু মৎস্যজীবীর

স্থানীয়দের অভিযোগ, বনদপ্তরের পক্ষ থেকে বর্তমানে নদীতে মাছ ধরা, কাঁকড়া সংগ্রহ এবং জঙ্গলে মধু সংগ্রহের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। মূলত বাঘের প্রজনন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের স্বার্থেই এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি হল, এলাকার বহু মানুষ এখনও এই পেশার উপর নির্ভরশীল। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েও মানুষকে জঙ্গলে প্রবেশ করতে হচ্ছে। প্রতিদিনের খাবার জোগাড় এবং পরিবারের ভরণপোষণের তাগিদে অনেকেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সুন্দরবনের গভীরে চলে যাচ্ছেন। আর সেই সুযোগেই বাড়ছে বাঘের হামলার ঘটনাও। স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েক বছরে সুন্দরবন এলাকায় বাঘের আক্রমণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে মধু সংগ্রহকারী, মৎস্যজীবী এবং কাঁকড়া ধরতে যাওয়া শ্রমিকরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা আর বাড়ি ফিরতে পারেন না। পরিসংখ্যানও সেই উদ্বেগকেই সামনে আনছে। জানা গিয়েছে, গত চার দিনের মধ্যে কুলতলী এলাকায় বাঘের হামলার শিকার হয়েছেন মোট চারজন। তাঁদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং একজন গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করছে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। শুধু গত চার দিন নয়, গত এক মাসের হিসাবও যথেষ্ট উদ্বেগজনক। স্থানীয় সূত্রে খবর, গত এক মাসে কুলতলী এলাকায় বাঘের হামলায় মোট ছয়জন আহত এবং নিহত হয়েছেন। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ক্রমশ বাড়ছে। পরিবেশবিদদের মতে, সুন্দরবন এমন একটি অঞ্চল যেখানে মানুষ এবং বন্যপ্রাণী দীর্ঘদিন ধরেই পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। কিন্তু জীবিকার জন্য জঙ্গলের উপর নির্ভরতা যত বাড়ছে, ততই মানুষ-বাঘ সংঘাতের ঘটনাও বাড়ছে। একদিকে বাঘের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র, অন্যদিকে মানুষের জীবিকার প্রয়োজন—এই দ্বন্দ্ব থেকেই এমন দুর্ঘটনা ঘটছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, শুধুমাত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। জঙ্গলের উপর নির্ভরশীল পরিবারগুলির জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে জীবনের ঝুঁকি জেনেও মানুষকে জঙ্গলে যেতে হবে, আর এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতেই থাকবে। এদিকে ঘটনার খবর পেয়ে বনদপ্তরের আধিকারিকরাও বিষয়টি খতিয়ে দেখতে শুরু করেছেন। যদিও সরকারি নিয়ম ভঙ্গ করে জঙ্গলে প্রবেশের অভিযোগ রয়েছে, তবুও মৃতের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।ফের একবার সুন্দরবনের বাঘের হামলায় প্রাণহানির ঘটনায় শোকস্তব্ধ কুলতলী। রামপ্রসাদ বাগানির মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, গোটা এলাকার জন্যই এক বড় ধাক্কা। একই সঙ্গে এই ঘটনা আবারও সামনে এনে দিল সুন্দরবনের মানুষদের কঠিন জীবনসংগ্রাম, যেখানে প্রতিদিনের রুজিরুটির জন্য লড়াই করতে গিয়ে অনেক সময় জীবনটাই বাজি রাখতে হয়।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram