গঙ্গাসাগর মেলায় অসুস্থ ২ পুণ্যার্থী, এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে কলকাতায় স্থানান্তর

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
দঃ ২৪ পরগনা : গঙ্গাসাগর মেলায় পুণ্যস্নানের উদ্দেশ্যে এসে অসুস্থ হয়ে পড়লেন ভিনরাজ্যের দুই পুণ্যার্থী। তাঁদের গুরুতর শারীরিক অবস্থার কথা মাথায় রেখে জেলা প্রশাসনের তৎপরতায় জরুরি ভিত্তিতে হেলিকপ্টার এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে কলকাতার এম আর বাঙুর হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। প্রশাসনের এই দ্রুত ও সুচারু পদক্ষেপে বড়সড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেলেন দুই প্রবীণ পুণ্যার্থী। এই ঘটনাকে ঘিরে গঙ্গাসাগর মেলা প্রাঙ্গণে কিছুক্ষণের জন্য উদ্বেগ তৈরি হলেও, প্রশাসনের কার্যকর ব্যবস্থাপনায় পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়। জেলা প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, অসুস্থ হয়ে পড়া দুই পুণ্যার্থীর একজন উত্তরপ্রদেশের লখনৌয়ের বাসিন্দা ৬৪ বছর বয়সী শান্তালাল এবং অপরজন হরিয়ানার ঝাঝর জেলার বাসিন্দা ৭৭ বছর বয়সী বিমলা দেবী। তাঁরা দু’জনেই গঙ্গাসাগরে পুণ্যস্নান ও পূণ্যলাভের উদ্দেশ্যে নিজ নিজ পরিবার ও সঙ্গীদের সঙ্গে মেলায় এসেছিলেন। লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর সঙ্গে তাঁরা গঙ্গাসাগরে এসে পৌঁছন এবং মেলা প্রাঙ্গণেই অবস্থান করছিলেন। প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, মেলায় অবস্থানকালে আচমকাই প্রথমে অসুস্থতা অনুভব করেন শান্তালাল। বয়সজনিত সমস্যা ও দীর্ঘক্ষণ হাঁটা, ভিড়ের চাপ এবং শারীরিক ধকলের কারণে তাঁর শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথা শুরু হয়। বিষয়টি বুঝতে পেরে তাঁর সঙ্গীরা দ্রুত তাঁকে গঙ্গাসাগরে স্থাপিত অস্থায়ী মেডিক্যাল ক্যাম্পে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন এবং কিছুক্ষণের জন্য পর্যবেক্ষণে রাখেন। Blue helicopter on helipad with people nearby.

অন্যদিকে, একই সময়ে বিমলা দেবীও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। জানা গেছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ রক্তচাপ ও অন্যান্য বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। মেলার ভিড়, আবহাওয়ার পরিবর্তন ও শারীরিক পরিশ্রমের ফলে তাঁর হঠাৎ করে মাথা ঘোরা ও শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। তাঁকেও দ্রুত অস্থায়ী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। গঙ্গাসাগরের অস্থায়ী হাসপাতাল ও মেডিক্যাল ক্যাম্পে চিকিৎসকরা দু’জনেরই শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেন। প্রাথমিকভাবে অক্সিজেন দেওয়া, প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ এবং শারীরিক স্থিতি বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়। তবে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে কিছুক্ষণের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে দু’জনের অবস্থাই আশঙ্কাজনক এবং উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে বিমলা দেবীর ক্ষেত্রে বয়সজনিত ঝুঁকি থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে দ্রুত জেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়। বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে প্রশাসনের তরফে জরুরি বৈঠক হয় এবং অবিলম্বে এয়ারলিফ্ট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যেহেতু গঙ্গাসাগর মেলায় বিপুল সংখ্যক পুণ্যার্থী উপস্থিত থাকেন এবং অনেক সময় স্থলপথে কলকাতায় রোগী স্থানান্তর করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, তাই জরুরি পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবাকে সক্রিয় রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে গঙ্গাসাগরের নির্দিষ্ট হেলিপ্যাডে দ্রুত সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। চিকিৎসক দল, স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের সমন্বয়ে পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয়। প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল সাপোর্ট সহ হেলিকপ্টার এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে প্রথমে বিমলা দেবী এবং পরে শান্তালালকে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা করানো হয়। হেলিকপ্টার ওঠার সময় হেলিপ্যাড ও তার আশপাশের এলাকা সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত রাখা হয়। পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় সাধারণ মানুষকে নির্দিষ্ট দূরত্বে রাখা হয় যাতে উদ্ধার ও স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় কোনও বিঘ্ন না ঘটে। প্রশাসনের এই দ্রুত ও সুচারু ব্যবস্থাপনায় উপস্থিত পুণ্যার্থীরাও স্বস্তি প্রকাশ করেন। কলকাতায় পৌঁছানোর পর দু’জনকেই সরাসরি এম আর বাঙুর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে তাঁরা দু’জনেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে এবং চিকিৎসকদের একটি দল তাঁদের শারীরিক অবস্থার উপর নিয়মিত নজর রাখছে। আপাতত দু’জনের অবস্থাই স্থিতিশীল বলে হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের একবার গঙ্গাসাগর মেলায় প্রশাসনের প্রস্তুতি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গুরুত্ব সামনে এসেছে। উল্লেখ্য, গঙ্গাসাগর মেলা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ। প্রতি বছর মকর সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী গঙ্গাসাগরে এসে পুণ্যস্নান করেন। এত বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগমে স্বাভাবিকভাবেই স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ বেড়ে যায়। সেই কারণেই রাজ্য প্রশাসনের তরফে গঙ্গাসাগর মেলাকে কেন্দ্র করে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। মেলা প্রাঙ্গণ জুড়ে একাধিক অস্থায়ী হাসপাতাল, মেডিক্যাল ক্যাম্প, অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি গুরুতর অসুস্থতার ক্ষেত্রে দ্রুত রোগী স্থানান্তরের জন্য রাখা হয়েছে হেলিকপ্টার এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা।

Emergency medical evacuation by air ambulance team.

প্রশাসনের এক আধিকারিক জানান, “গঙ্গাসাগর মেলায় প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ আসেন। অনেক পুণ্যার্থী প্রবীণ এবং বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। তাই আমরা আগেভাগেই সব ধরনের জরুরি পরিষেবার ব্যবস্থা করে রাখি। আজকের ঘটনায় সেই প্রস্তুতিরই বাস্তব প্রয়োগ দেখা গেল। ”স্থানীয় বাসিন্দা ও মেলায় আগত পুণ্যার্থীরাও প্রশাসনের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। তাঁদের মতে, এত বড় মেলায় কোনও পুণ্যার্থীর অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা থাকায় প্রাণরক্ষা সম্ভব হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবীণ পুণ্যার্থীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন। দীর্ঘ পথ হাঁটা, ভিড়ের চাপ, আবহাওয়ার পরিবর্তন ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব অনেক সময় গুরুতর শারীরিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই কারণে প্রশাসনের পাশাপাশি পুণ্যার্থীদেরও নিজেদের স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতন থাকা জরুরি। এই ঘটনার পর প্রশাসনের তরফে পুণ্যার্থীদের উদ্দেশে বার্তা দেওয়া হয়েছে—কোনও রকম শারীরিক অস্বস্তি বোধ করলে দেরি না করে নিকটবর্তী মেডিক্যাল ক্যাম্পে যোগাযোগ করতে। একই সঙ্গে প্রবীণ ও অসুস্থ পুণ্যার্থীদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। সব মিলিয়ে, গঙ্গাসাগর মেলায় ভিনরাজ্যের দুই পুণ্যার্থীর অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা একদিকে যেমন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল, তেমনই প্রশাসনের দ্রুততা, পরিকল্পনা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিরও একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বড়সড় বিপদ এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। গঙ্গাসাগর মেলায় আগত লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা যে প্রশাসনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, তা এই ঘটনায় আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠল।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram