‘ভুতুড়ে’ লোকের নামে বাড়ির টাকা, আসল মানুষ মাটির ঘরে !! কাটমানির অভিযোগে তোলপাড় দেবশালা

এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেবশালা পঞ্চায়েত এলাকায় বিক্ষোভও দেখান বঞ্চিত উপভোক্তারা। তাঁদের দাবি, শুধুমাত্র মৌখিক আশ্বাস নয়, গোটা আবাস তালিকা প্রকাশ্যে আনতে হবে। কার নামে বাড়ি বরাদ্দ হয়েছিল, কার নামে টাকা ছাড়া হয়েছে, কোন বাড়ি বাস্তবে তৈরি হয়েছে এবং সেই বাড়িতে বর্তমানে কে বসবাস করছেন—সবকিছু প্রকাশ্যে আনার দাবি উঠেছে। পাশাপাশি বিক্ষোভকারীদের দাবি, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। সরকারি প্রকল্পের টাকা নিয়ে যদি কোনও অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করা হোক এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক। এই ঘটনায় আরও একটি অভিযোগ সামনে এসেছে—কাটমানির। অভিযোগকারীদের একাংশের দাবি, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে কোথাও টাকা লেনদেন হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা এখনও প্রমাণিত নয়। তবে প্রশ্ন উঠছে, প্রকৃত উপভোক্তার নাম তালিকায় থাকার পরেও যদি তিনি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে সেই প্রক্রিয়ায় কোথাও গলদ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। এদিকে, দেবশালা গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান বৃথিকা মেটে অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে তাঁর দাবি, যে ঘটনাগুলির কথা বলা হচ্ছে, সেগুলি তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার আগের সময়ের। অর্থাৎ, বর্তমান পঞ্চায়েত নেতৃত্বের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগে যে অনিয়মের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলি বর্তমান সময়ের প্রশাসনিক দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। অন্যদিকে, এই ঘটনাকে হাতিয়ার করে সরব হয়েছে বিজেপিও। বিজেপি নেতা সৌমেন পাত্রের দাবি, এটি অত্যন্ত গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ। তাঁর মতে, গরিব মানুষের জন্য বরাদ্দ সরকারি প্রকল্পের সুবিধা যদি প্রকৃত উপভোক্তার কাছে না পৌঁছয়, তাহলে গোটা বিষয়টির দ্রুত তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মাঝেই এখন মূল প্রশ্নটা থেকে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার কথা যাঁদের, তাঁদের নাম যদি তালিকায় থাকে, তাহলে তাঁদের ঘর কোথায়? যদি সরকারি নথিতে কোনও বাড়িকে সম্পূর্ণ বলে দেখানো হয়, তাহলে সেই বাড়ির বাস্তব অবস্থান কী? আর সরকারি টাকা যদি সত্যিই বরাদ্দ হয়ে থাকে, তাহলে সেই টাকা কোন অ্যাকাউন্টে গিয়েছে, কে তুলেছেন এবং কীভাবে খরচ হয়েছে—তার হিসেবই বা কোথায়? এই প্রশ্নগুলির উত্তর পেতে প্রয়োজন নথিপত্রের স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষ তদন্ত। বিশেষ করে আবাস যোজনার মতো প্রকল্প সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত। মাটির ঘরে বসবাস করা একটি পরিবার যখন পাকা বাড়ির আশায় সরকারি তালিকায় নিজের নাম দেখে, তখন সেই আশার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নিরাপত্তা, সম্মান এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সেই সুবিধা যদি কাগজে-কলমে সম্পূর্ণ হয়ে যায়, অথচ বাস্তবে উপভোক্তা সেই সুবিধা না পান, তাহলে তা শুধু একটি প্রশাসনিক ত্রুটির প্রশ্ন নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একজন গরিব মানুষের অধিকার। দেবশালায় ওঠা অভিযোগ সত্যি হলে, প্রশ্ন উঠবেই—এই অনিয়মের পিছনে কারা? আর অভিযোগ যদি ভুল হয়, তাহলেও প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে সেই সত্য সামনে আনা। কারণ সরকারি প্রকল্পের টাকা জনগণের টাকা। সেই টাকা কোনওভাবেই অপচয় বা দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে না। তাই এখন দেবশালার মানুষের দাবি একটাই—আবাস যোজনার সম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশ হোক, নথি খতিয়ে দেখা হোক, প্রকৃত উপভোক্তাদের বক্তব্য নেওয়া হোক এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। গরিবের মাথার উপর পাকা ছাদ দেওয়ার যে স্বপ্ন নিয়ে আবাস প্রকল্প, সেই স্বপ্ন যদি সত্যিই কোনও অনিয়মের কারণে ভেঙে যায়, তাহলে দায় কার? দেবশালার বঞ্চিত মানুষের সেই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজতে হবে প্রশাসনকে। গরিবের ঘরের টাকা যদি সত্যিই অন্যের হাতে গিয়ে থাকে, তাহলে সেই টাকা গেল কোথায়, আর এর পিছনে কারা—এই প্রশ্নের উত্তরই এখন চাইছে দেবশালা।
