সরকার বদলায়, বদলায় না দাদাগিরি ! ফের বন্ধ কয়লা খনি

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
জামুড়িয়া : সরকার বদলেছে, বদলেছে রাজনৈতিক সমীকরণও। কিন্তু বদলেছে কি শিল্পাঞ্চলের খনি চত্বরে রাজনৈতিক বিক্ষোভের সেই পুরনো ছবি? শাসক হোক কিংবা বিরোধী—দলের পতাকা হাতে নিয়ে খনি চত্বরে বিক্ষোভ, কাজ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ আর সেই ঘটনাকে ঘিরেই বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে শিল্পাঞ্চলের কয়লা উৎপাদন ও পরিবহণ ব্যবস্থা। জামুড়িয়ার চুরুলিয়ায় রাজ্য সরকারের অধীনস্থ WBPDCL-এর তারা কোলিয়ারিতে এমনই এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের সামনে এসেছে রাজনৈতিক প্রভাব এবং শিল্প উৎপাদনের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন। সংস্থার দাবি অনুযায়ী, তারা কোলিয়ারি থেকে রাজ্যের বিভিন্ন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহ করা হয়। সাঁওতালডিহি, বাকরেশ্বর, বজবজ, টিটাগড়-সহ একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এই কোলিয়ারি থেকে কয়লা পাঠানো হয় বলে জানা গিয়েছে। ফলে একটি কোলিয়ারিতে উৎপাদন বা কয়লা পরিবহণের কাজ কোনও কারণে ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু ওই খনি এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তার প্রভাব পড়তে পারে রাজ্যের বৃহত্তর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাতেও। আর সেই কারণেই তারা কোলিয়ারিকে ঘিরে এদিনের বিক্ষোভকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বাড়তি চাঞ্চল্য। জানা গিয়েছে, এদিন সকাল থেকেই তারা কোলিয়ারি চত্বরে বিজেপির পতাকা হাতে নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন স্থানীয় বিজেপির কয়েকজন নেতা-কর্মী এবং এলাকার বাসিন্দাদের একাংশ। বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল দলের পতাকা, মুখে ছিল বিভিন্ন দাবি ও স্লোগান। তাঁদের অভিযোগ, স্থানীয়দের কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব করা হচ্ছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে কাজের সুযোগের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু তাঁদের অভিযোগ, বেছে বেছে তৃণমূল ঘনিষ্ঠদের কাজের সুযোগ দেওয়া হলেও বিজেপি সমর্থকদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। এই অভিযোগকে সামনে রেখেই এদিন কোলিয়ারি চত্বরে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভ চলাকালীন শাসকদলের বিধায়কের বিরুদ্ধেও স্লোগান দিতে শোনা যায় বিক্ষোভকারীদের। রাজনৈতিক স্লোগান এবং বিক্ষোভের জেরে একসময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে জানা যায়। এরই মধ্যে বিক্ষোভের প্রভাব পড়ে কোলিয়ারির স্বাভাবিক কাজকর্মেও। বিক্ষোভের জেরে কিছু সময়ের জন্য খনি থেকে কয়লা উত্তোলন এবং পরিবহণের কাজ ব্যাহত হয় বলে জানা গিয়েছে। যদিও পরবর্তীতে পুলিশ এবং কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেয়। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলা হয় এবং তাঁদের দাবিদাওয়া শোনার চেষ্টা করা হয়। প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষের তৎপরতায় বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। কিন্তু এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন সামনে আসছে আরও বড় একটি প্রশ্ন। সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার সমীকরণ বদলেছে, বিরোধীর ভূমিকাতেও এসেছে পরিবর্তন। তাহলে কি শিল্পাঞ্চলের খনি এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর সংস্কৃতিতেও কোনও পরিবর্তন এসেছে? নাকি রাজনৈতিক পতাকার রং বদলালেও খনি চত্বরে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগের সেই পুরনো ছবি এখনও একই রয়ে গিয়েছে? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে জামুড়িয়ার শিল্পাঞ্চলে। কারণ খনি কোনও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় নয়। খনি মানে উৎপাদন, খনি মানে কর্মসংস্থান এবং খনি মানে রাজ্যের শিল্প ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো। তাই রাজনৈতিক দাবি বা অভিযোগ থাকতেই পারে, স্থানীয়দের কাজের সুযোগ নিয়ে প্রশ্নও উঠতে পারে, কিন্তু সেই দাবিকে সামনে রেখে যদি খনির উৎপাদন বা কয়লা পরিবহণ ব্যাহত হয়, তাহলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পড়বে, সেটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তারা কোলিয়ারি থেকে যে কয়লা বিভিন্ন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরবরাহ করা হয়, সেই সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনও বাধা তৈরি হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলির উপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। কয়লার জোগান কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিকল্প উৎস থেকে কয়লা সংগ্রহের প্রয়োজন হতে পারে। আর সেই পরিস্থিতিতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাতেও তৈরি হতে পারে অতিরিক্ত চাপ।
সরকার বদলায়, বদলায় না দাদাগিরি ! ফের বন্ধ কয়লা খনি
খনিতে BJP-র বিক্ষোভ, ব্যাহত কয়লা উত্তোলন ! ফের প্রশ্নের মুখে শিল্পাঞ্চলের রাজনীতি
যদিও এদিনের ঘটনায় দীর্ঘমেয়াদি কোনও প্রভাব পড়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়, তবে অল্প সময়ের জন্য হলেও খনির উৎপাদন এবং পরিবহণ ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ শিল্পাঞ্চলের জন্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের দাবিকেও একেবারে উপেক্ষা করা যায় না। কারণ শিল্পাঞ্চলের বড় বড় খনি ও কারখানাকে ঘিরে আশপাশের বহু মানুষের জীবিকা নির্ভর করে। তাই স্থানীয়দের অভিযোগ যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে সেই অভিযোগ খতিয়ে দেখা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। আবার অভিযোগের আড়ালে যদি শুধুমাত্র রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে খনির কাজ ব্যাহত করার চেষ্টা হয়ে থাকে, তাহলেও সেটি সমানভাবে উদ্বেগের বিষয়। কারণ রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে শিল্প উৎপাদনকে অচল করে দেওয়ার মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। দাবি আদায়ের জন্য গণতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন হতে পারে, আলোচনাও হতে পারে, কিন্তু উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব পড়তে পারে শ্রমিক, সংস্থা এবং বৃহত্তর অর্থনীতির উপর। বিশেষ করে কয়লা উৎপাদনের সঙ্গে যখন সরাসরি রাজ্যের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা যুক্ত, তখন এই বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। তাই তারা কোলিয়ারির এদিনের ঘটনাকে শুধু একটি স্থানীয় রাজনৈতিক বিক্ষোভ হিসেবে দেখলেই কি পুরো বিষয়টি বোঝা সম্ভব? নাকি এর পিছনে রয়েছে শিল্পাঞ্চলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আরও বড় একটি ছবি? সেই প্রশ্নও উঠছে। স্থানীয় বিজেপির পক্ষ থেকে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা নিয়ে কর্তৃপক্ষের অবস্থান কী, শাসকদলের পক্ষ থেকে এই অভিযোগের জবাব কী, এবং প্রকৃতপক্ষে স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কোনও পক্ষপাতিত্ব হয়েছে কি না—সেই বিষয়গুলি পরিষ্কার হওয়াও জরুরি। কারণ অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগের মাঝখানে প্রকৃত সত্যটি সামনে আসা দরকার। পাশাপাশি, কোনও রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির জেরে যাতে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প উৎপাদন এবং কয়লা সরবরাহ ব্যবস্থা দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এদিন পুলিশ এবং কোম্পানি কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিন্তু ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা যাতে ফের না ঘটে, তার জন্য প্রশাসন এবং কোলিয়ারি কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেয়, সেটাই এখন দেখার। কারণ সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক পতাকার রং বদলেছে, ক্ষমতার সমীকরণ বদলেছে—কিন্তু খনি চত্বরে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ যদি একইভাবে ফিরে আসে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, সত্যিই কি বদলেছে সেই পুরনো ছবি? নাকি শুধু পতাকার রং বদলেছে, বদলায়নি রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর সেই সংস্কৃতি? জামুড়িয়ার তারা কোলিয়ারির ঘটনাকে ঘিরে এখন সেই প্রশ্নই সামনে। আর এই প্রশ্নের উত্তর শুধু রাজনৈতিক মহল নয়, খনি শ্রমিক, স্থানীয় বাসিন্দা, শিল্প সংস্থা এবং রাজ্যের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কয়লার উৎপাদন শুধু একটি খনির বিষয় নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিল্প, কর্মসংস্থান, বিদ্যুৎ এবং রাজ্যের অর্থনীতির একটি বড় অংশ। তাই রাজনৈতিক দাবি থাকুক, প্রতিবাদ থাকুক, অভিযোগ থাকুক—তার সমাধান আলোচনার টেবিলে হোক, কিন্তু শিল্প উৎপাদন যেন রাজনৈতিক সংঘাতের বলি না হয়। এখন দেখার, তারা কোলিয়ারির এই ঘটনায় ওঠা অভিযোগের কতটা সত্যতা সামনে আসে, কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয় এবং আগামী দিনে শিল্পাঞ্চলের খনি চত্বরে রাজনৈতিক বিক্ষোভের এই সংস্কৃতিতে আদৌ কোনও পরিবর্তন আসে কি না।
Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram