জমা জলে দুর্ভোগ, ধানের চারা পুঁতে শ্রমিকদের অভিনব প্রতিবাদ

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
পানাগড় : রাস্তা নয়, যেন আস্ত এক ধানখেত! সামান্য বৃষ্টি হলেই হাঁটুসমান নোংরা জলে ডুবে যায় গোটা এলাকা। কোথাও রাস্তা দেখা যাচ্ছে না, কোথাও দোকানের সামনে জল জমে রয়েছে, আবার কোথাও সেই জল পেরিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে ব্যবসায়ী, শ্রমিক এবং সাধারণ মানুষকে। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে নিকাশি সমস্যায় জেরবার পানাগড়ের কাওয়ারী মার্কেট। বারবার অভিযোগ জানিয়েও সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় এবার কার্যত অভিনব প্রতিবাদের পথ বেছে নিলেন মার্কেটের শ্রমিকরা। জমা জলের মধ্যেই ধানের চারা পুঁতে বিক্ষোভ দেখালেন তাঁরা। তাঁদের এই প্রতিবাদ ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। ঘটনার সূত্রপাত সোমবারের ভারী বৃষ্টিকে কেন্দ্র করে। অন্যান্য দিনের মতো বৃষ্টি হলেও এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই পানাগড়ের কাওয়ারী মার্কেটের বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। রাস্তা থেকে শুরু করে দোকানের সামনের অংশ—সর্বত্র থইথই করতে থাকে নোংরা জল। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সমস্যা আজকের নয়। বছরের পর বছর ধরে সামান্য বৃষ্টি হলেই একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। জল বেরিয়ে যাওয়ার উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির জল জমে থাকে দিনের পর দিন। ফলে বাজারে ব্যবসা করা যেমন কঠিন হয়ে পড়ে, তেমনই সমস্যায় পড়েন এখানে কাজ করতে আসা শ্রমিকরাও। মঙ্গলবার সেই জমা জলের মধ্যেই দেখা গেল অভিনব প্রতিবাদ। কাজ বন্ধ রেখে জমা জলের মধ্যে ধানের চারা পুঁতে দেন মার্কেটের শ্রমিকরা। তাঁদের বক্তব্য, রাস্তা যখন ধান চাষের জমির মতো হয়ে গিয়েছে, তখন সেখানেই ধান চারা পুঁতে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই শ্রেয়। প্রতীকী এই প্রতিবাদের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের নিকাশি সমস্যার প্রতি প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান তাঁরা। শ্রমিকদের অভিযোগ, দিনের পর দিন নোংরা জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে কাজ করতে হচ্ছে তাঁদের। ভারী জিনিসপত্র নিয়ে কাজ করার সময় এই জল আরও বড় সমস্যা তৈরি করছে। শুধু কাজের অসুবিধাই নয়, দীর্ঘ সময় নোংরা জলে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে শরীরেও নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে বলে দাবি বিক্ষোভকারীদের। বিশেষ করে চর্মরোগের সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন তাঁরা। নোংরা এবং দূষিত জলে দীর্ঘ সময় থাকার ফলে পায়ে ও শরীরের বিভিন্ন অংশে চুলকানি, অস্বস্তি এবং অন্যান্য ত্বকের সমস্যা হচ্ছে বলে অভিযোগ শ্রমিকদের। তাঁদের প্রশ্ন, প্রতিদিন যে শ্রমিকরা এই বাজারে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাঁদের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব কে নেবে ? একদিকে বাজারের ব্যবসা, অন্যদিকে শ্রমিকদের রুজি-রোজগার—সবকিছুর উপরেই এই জলাবদ্ধতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ। বিক্ষোভকারীদের আরও দাবি, সমস্যাটি নিয়ে তাঁরা একবার নয়, একাধিকবার প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অভিযোগ জানিয়েছেন। কাঁকসা গ্রাম পঞ্চায়েত-সহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক মহলে বিষয়টি জানানো হয়েছে বলেও দাবি তাঁদের। কিন্তু অভিযোগ, প্রতিবারই আশ্বাস মিললেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। বৃষ্টি হলেই ফের একই ছবি। কয়েকদিন বৃষ্টি হলেই মার্কেটের রাস্তা কার্যত চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। জল জমে যাওয়ার পাশাপাশি কোথাও কোথাও কাদা এবং আবর্জনা মিশে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ক্রেতাদেরও অনেক সময় জল পেরিয়ে দোকানে আসতে হয়। ফলে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। শুধু প্রশাসনের বিরুদ্ধেই নয়, মার্কেটের ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেও নজরদারির অভাবের অভিযোগ তুলেছেন শ্রমিকদের একাংশ।
জমা জলে দুর্ভোগ, ধানের চারা পুঁতে শ্রমিকদের অভিনব প্রতিবাদ
১৫ বছরেও মেটেনি জল-যন্ত্রণা ! পানাগড়ে ধানের চারা পুঁতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ
তাঁদের দাবি, বাজারের নিকাশি ব্যবস্থা ঠিক রাখার পাশাপাশি কোথায় কীভাবে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে, নর্দমা বা জল বেরোনোর পথ পরিষ্কার রাখা হচ্ছে কি না—এসব বিষয়েও নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। কোথাও নোংরা-আবর্জনা জমে থাকলে জল নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। আর সেই কারণেই শুধু সাময়িকভাবে জল পাম্প করে বের করে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না বলেই মনে করছেন শ্রমিকরা। তাঁদের দাবি, প্রয়োজন স্থায়ী নিকাশি ব্যবস্থা। বাজারের জমা জল দ্রুত বের করে দেওয়ার জন্য উপযুক্ত ড্রেন তৈরি করতে হবে। কোথা দিয়ে জল বেরোবে, কোথায় সেই জল যাবে—তার একটি স্থায়ী পরিকল্পনা করতে হবে। শুধু বর্ষাকাল এলেই তৎপরতা দেখিয়ে পরে আবার বিষয়টি ভুলে গেলে চলবে না বলেও দাবি তাঁদের। এদিনের বিক্ষোভের জেরে কার্যত বন্ধ হয়ে যায় কাওয়ারী মার্কেটের লোহার ব্যবসার একটি বড় অংশ। শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রাখায় ব্যাহত হয় মাল ওঠানো-নামানো এবং অন্যান্য কাজ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রভাব পড়ে ব্যবসায়ীদের উপরেও। তবে শ্রমিকদের বক্তব্য, বারবার অভিযোগ জানিয়েও যখন কোনও স্থায়ী সমাধান হয়নি, তখন বাধ্য হয়েই তাঁরা এই ধরনের প্রতিবাদের পথ বেছে নিয়েছেন। তাঁদের হুঁশিয়ারি, দ্রুত জমা জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না করা হলে এবং স্থায়ী নিকাশি ব্যবস্থা গড়ে না তোলা হলে আগামী দিনে আন্দোলন আরও তীব্র করা হবে। শুধু কাজ বন্ধ নয়, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত মার্কেটে প্রবেশের পথও আটকে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। অর্থাৎ, সমস্যার সমাধান না হলে আগামী দিনে কাওয়ারী মার্কেটের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে বলেই আশঙ্কা। প্রশ্ন উঠছে, এত বছর ধরে চলা এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান কেন হল না ? একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে জল জমে থাকলেও কেন কার্যকর নিকাশি ব্যবস্থা তৈরি করা গেল না ? বর্ষার সময় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা কি প্রশাসনের নজরে নেই ? আর যদি নজরে থাকে, তাহলে এত বছরেও সমস্যার সমাধান হয়নি কেন ? এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখন প্রশাসনের কাছ থেকেই চাইছেন শ্রমিক, ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা। কারণ পানাগড়ের কাওয়ারী মার্কেট শুধু একটি বাজার নয়। বহু শ্রমিক এবং ব্যবসায়ীর জীবিকার সঙ্গে এই বাজারের সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিদিন এখানে বহু মানুষ কাজ করেন। সেই জায়গাতেই যদি সামান্য বৃষ্টিতে হাঁটুসমান নোংরা জল জমে যায়, তাহলে তা শুধু জলাবদ্ধতার সমস্যা নয়—এটি স্বাস্থ্য, জীবিকা এবং ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত সমস্যা। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, বর্ষার সময় জল জমে থাকার কারণে বাজারে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে। জল-কাদার মধ্যে ভারী মালপত্র নিয়ে চলাচল করতে গিয়ে শ্রমিকদের বিপদে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। একইসঙ্গে জল জমে থাকলে মশা এবং অন্যান্য জীবাণুবাহিত সমস্যাও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের। তাই এবার আর আশ্বাস নয়, দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপ চান শ্রমিকরা। তাঁদের দাবি, প্রথমে জমে থাকা জল দ্রুত নিষ্কাশন করতে হবে। এরপর বাজারের সম্পূর্ণ নিকাশি ব্যবস্থা পরিদর্শন করে কোথায় সমস্যা রয়েছে তা চিহ্নিত করতে হবে। প্রয়োজনে নতুন ড্রেন তৈরি করতে হবে এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থাও করতে হবে। এখন দেখার বিষয়, শ্রমিকদের এই অভিনব প্রতিবাদ প্রশাসনের ঘুম ভাঙাতে পারে কি না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কাওয়ারী মার্কেটের জলাবদ্ধতা নিয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, কাঁকসা গ্রাম পঞ্চায়েত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তরফে স্থায়ী নিকাশি ব্যবস্থা তৈরির কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয় কি না—সেদিকেই তাকিয়ে সকলে। কারণ শ্রমিকদের বক্তব্য একটাই— “রাস্তা দিয়ে কাজ করতে এসেছি, ধান চাষ করতে নয়।” আর সেই কারণেই এবার জমা জলের মধ্যে ধানের চারা পুঁতে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন তাঁরা। দীর্ঘ ১৫ বছরের জল-যন্ত্রণা এবার শেষ হবে, নাকি পরের বৃষ্টিতেও ফের একই ছবি দেখা যাবে—পানাগড়ের কাওয়ারী মার্কেটের শ্রমিক, ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের চোখ এখন সেদিকেই।
Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram