লোহাগুড়ি গ্রামের সরকার বাড়ির পুজোয় কালের তোপধ্বনি !!
Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
কাঁকসা: সবুজ শ্যামলিমা মাখা ছায়ার ঘোমটা মুখে ইতিহাসের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক হারানো কাহিনী। সামন্ত ও গোপরাজ বংশের রক্তে লেখা সেই কাহিনীর ছত্রে ছত্রে আজও রয়ে গেছে সুদূর অতীতের দীর্ঘশ্বাস।মহাকালের রথের চাকায় আবর্তিত হওয়া ইতিহাসের হলদে পাতায় যেন আজও লেগে আছে গড় জঙ্গলের বুকে লোহাগুড়ি গ্রামের সরকার বাড়ির সুপ্রাচীন দুর্গোৎসবের অতীত কাহিনী। সে কাহিনীর ছত্রে ছত্রে রোমাঞ্চ।নির্জন বন প্রান্তরে ফেলে আসা অতীতের বাতিঘরের মত এক টুকরো ইতিহাসের যোগসূত্র।অজয় নদের স্নেহ ফল্গু ধারায় সিঞ্চিত ইতিহাসের গর্ভে বিলীন সেদিনের ঢেকুর রাজ্যের অলিন্দে কান পাতলে আজও হয়তো শোনা যাবে, ‘আগা ডুম, বাঘা ডুম, ঘোড়া ডুম সাজে’-র চাপা ক্রন্দন ধ্বনি।ডোম সম্প্রদায়ের বীর যোদ্ধাদের নিয়ে রচিত ইছাই ঘোষের পদাতিক ও অশ্বারোহী বাহিনীর রক্তে লেখা আখ্যান! গোপরাজ ইছাই ঘোষ ও সামন্ত রাজা লাউসেনের সৈন্যদের নিয়ে গ্রাম্য কবির রচিত সেদিনের সেই আগা ডুম বাঘা ডুম কবিতার মধ্যেও যেন শোনা যায় ইতিহাসেরই পদধ্বনি। দুর্ধর্ষ বীর ইছাই ঘোষ ছিলেন গড় জঙ্গলের শাসক। তাঁর চির প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন প্রবল পরাক্রান্ত সামন্ত রাজা লাউসেন। জল, জঙ্গলের অধিকার নিয়ে দুই স্থানীয় শাসকের মধ্যে যুদ্ধ বিগ্রহ লেগেই থাকত। যুদ্ধের প্রয়োজনে চাই যুদ্ধাস্ত্র। ইংরেজ ঐতিহাসিক, গবেষক ও তৎকালীন জেলা কালেক্টর অগাস্টাস হিকির লেখা বেঙ্গল গেজেটিয়ার-এর বিবরণী থেকে জানা যায়, ইছাই ঘোষ স্বয়ং ছিলেন যুদ্ধবিদ্যায় অত্যন্ত নিপুন এক ব্যক্তি। তিনি নিজের হাতেই তৈরি করে দিতেন তলোয়ার, বল্লম, বর্শা, বেয়নেট এমনকি দেশীয় কামানের নকশাও। তাঁর সেই নকশা অনুযায়ী এই এলাকার লোহার বা কর্মকার সম্প্রদায়ের দক্ষ কারিগরেরা আকরিক থেকে লোহা নিষ্কাশন করে ছাঁচে ঢেলে নির্মাণ করতেন সেই সব সমরাস্ত্র। সেই কর্মকারদের আস্তানা ছিল জঙ্গলে ঘেরা এই এলাকা। ক্রমে লোহার সম্প্রদায়ের মানুষদের আবাসস্থলটি ‘লোহাগড়’ নামে পরিচিতি লাভ করে।সম্ভবত লোহাগড় থেকেই পরবর্তী কালে গ্রামের নাম লোহাগুড়ি হয়ে থাকতে পারে। এই লোহাগুড়ি গ্রামের বর্ধিষ্ণু সরকার পরিবারের প্রতিষ্ঠিত দেবী দুর্গতিনাশিনীর পুজোয় আজও যেন হারানো অতীতের হাতছানি। প্রাচীন রীতি মেনে আজও মহাষ্টমীর মহাসন্ধিক্ষণে সরকার পরিবারের কামান থেকে তোপধ্বনি করা হয়।কথিত আছে সেই গুরুগম্ভীর তোপধ্বনি শুনেই পার্শ্ববর্তী বিষ্টুপুর, শিবপুর এমনকি দেবী শ্যামরূপার মন্দিরেও মহাষ্টমীর সন্ধিপুজো শুরু হয়। সরকার পরিবারের বর্তমান কর্তা জগবন্ধু সরকার বলেন, তাঁদের বংশের এই ঐতিহ্যবাহী দুর্গোৎসব শুধু ভক্তিরসে সিঞ্চিত মঙ্গলাচারই নয়, এ যেন তাঁদের পূর্বসুরীদের রেখে যাওয়া বীরগাথারই প্রতিধ্বনি, স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইয়ে শোণিত ধারা প্রবাহের অনুরণন।আজও পরম নিষ্ঠা আর প্রাচীন লোকাচার মেনেই দেবীর পুজো সম্পন্ন হয়। যুগ যুগ ধরে বয়ে চলা অজয়ের ফেনিল জলধারার মতই তার আবহমানতা, মহাকালে বিলীন হয়ে যাওয়া এক পরম সত্যের জীবন্ত দলিল।
Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
