ক্ষুদে পায়ে ফুটবলের ঝড়, ক্ষুদিরাম স্মরণে জমজমাট কাঁকসা

একই সঙ্গে মাঠে জয় যেমন আনন্দ দেয়, তেমনই হারও শেখায় কীভাবে ব্যর্থতাকে মেনে নিয়ে আবার নতুন করে লড়াইয়ে ফিরতে হয়। আর ছোট বয়স থেকেই এই মানসিকতা তৈরি হওয়া ভবিষ্যতে তাদের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজে লাগবে বলেই মনে করছেন আয়োজকরা। জামবন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহশিক্ষক অনুপম মুখোপাধ্যায় জানান, নিজেদের স্কুলের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এবার বিদবিহার অঞ্চলের ন’টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের একসঙ্গে নিয়ে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যেমন পরিচিতি এবং বন্ধুত্ব তৈরি হচ্ছে, তেমনই খেলাধুলার প্রতি তাদের আগ্রহও বাড়ছে। অনুপম মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, শিশুদের মাঠমুখী করার পাশাপাশি তাদের মধ্যে দলগত সংহতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মানসিকতা তৈরি করাই এই আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে একটি স্কুলের পড়ুয়ারা অন্য স্কুলের পড়ুয়াদের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে, একসঙ্গে খেলছে, একে অপরকে উৎসাহ দিচ্ছে। ফলে খেলার মাঠই হয়ে উঠছে সামাজিক বন্ধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। এই আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও যথেষ্ট উৎসাহ দেখা যায়। অনেকেই মনে করছেন, বর্তমান সময়ে শিশুদের একটা বড় অংশ মোবাইল ফোন এবং বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল বিনোদনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে। সেই জায়গায় তাদের নিয়মিত মাঠে নিয়ে আসা এবং খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। ফুটবল সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে। কারণ ফুটবল শুধু শরীরচর্চা নয়, এটি শেখায় একসঙ্গে এগিয়ে চলার কথা। একজন খেলোয়াড় একা ম্যাচ জেতাতে পারে না। প্রয়োজন হয় গোটা দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। কখন কোথায় পাস দিতে হবে, কখন আক্রমণে যেতে হবে, আবার কখন নিজের গোলপোস্ট রক্ষা করতে হবে—প্রতিটি মুহূর্তেই প্রয়োজন হয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং সতীর্থদের উপর আস্থা রাখার মানসিকতা। আর সেই শিক্ষাই ছোট বয়সে মাঠের মধ্য দিয়ে শিশুদের মধ্যে তৈরি করার চেষ্টা এই প্রতিযোগিতায়। দিনভর প্রতিযোগিতাকে ঘিরে জামবন মাঠে ছিল উৎসবের আবহ। খুদে খেলোয়াড়দের দৌড়ঝাঁপ, গোলের উল্লাস, সতীর্থদের হাততালি আর অভিভাবকদের উৎসাহে প্রাণ ফিরে পায় গোটা মাঠ। বয়সে ছোট হলেও প্রতিটি খেলোয়াড়ের চোখেমুখে ছিল নিজের স্কুলের হয়ে ভালো করার তাগিদ। শেষ পর্যন্ত অবশ্য প্রতিটি প্রতিযোগিতার মতো এখানেও জয়-পরাজয়ের হিসেব থাকবেই। কিন্তু এই বয়সে সেই হিসেবের থেকেও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে অংশগ্রহণ, আনন্দ এবং অভিজ্ঞতা অর্জন। আজ যে শিশু মাঠে নেমে প্রথমবার প্রতিযোগিতার চাপ অনুভব করছে, আগামী দিনে সেই শিশুই হয়তো আরও বড় মঞ্চে নিজের প্রতিভার পরিচয় দেবে। আর সেই সম্ভাবনার বীজ বপন হয় এমন ছোট ছোট আয়োজনের মধ্য দিয়েই। ক্ষুদিরাম বসুর স্মৃতিকে সামনে রেখে আয়োজিত এই ফুটবল প্রতিযোগিতা তাই শুধুমাত্র একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নতুন প্রজন্মকে মাঠমুখী করার উদ্যোগ, দলগত চেতনা গড়ে তোলার প্রয়াস এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে শিশুদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার বার্তা। ক্ষুদে পায়ের দৌড়, গোলের উচ্ছ্বাস আর নির্মল হাসিতে মঙ্গলবার যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল কাঁকসার জামবন ফুটবল মাঠ। জয়-পরাজয়ের গণ্ডি পেরিয়ে এই আয়োজন শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার, একসঙ্গে এগিয়ে চলার এবং নতুন স্বপ্ন দেখার এক সুন্দর মঞ্চ।
