ক্ষুদে পায়ে ফুটবলের ঝড়, ক্ষুদিরাম স্মরণে জমজমাট কাঁকসা

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
কাঁকসা : ছোট ছোট পায়ে ছুটছে ফুটবল। চোখে জয়ের স্বপ্ন। গোল হলেই মাঠজুড়ে উচ্ছ্বাসের ঢেউ। কখনও সতীর্থকে নিখুঁতভাবে বল বাড়িয়ে দেওয়া, কখনও প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখতে মরিয়া চেষ্টা—খুদে ফুটবলারদের এমনই প্রাণবন্ত মুহূর্তে মঙ্গলবার সকাল থেকেই জমে উঠল কাঁকসার জামবন ফুটবল মাঠ। স্বাধীনতা সংগ্রামী ক্ষুদিরাম বসুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আয়োজন করা হয় এক বিশেষ ফুটবল প্রতিযোগিতার। এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় বিদবিহার অঞ্চলের ন’টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা। সকাল হতেই বিভিন্ন স্কুলের জার্সি গায়ে একে একে মাঠে হাজির হয় খুদে খেলোয়াড়রা। কারও চোখে ছিল জয়ের স্বপ্ন, কারও মুখে চাপা উত্তেজনা, আবার কেউ মাঠে নামার আগেই সতীর্থদের সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে পড়ে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে। খেলা শুরু হতেই বদলে যায় জামবন ফুটবল মাঠের পরিবেশ। মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াতে থাকে খুদে ফুটবলাররা। বল দখলের লড়াই, পাস, ড্রিবলিং, গোলের চেষ্টা—সব মিলিয়ে বয়সে ছোট হলেও মাঠে তাদের লড়াইয়ের মানসিকতায় ছিল না কোনও খামতি। একটি গোলের পরই দেখা যায় উৎসবের ছবি। গোলদাতা খেলোয়াড়কে ঘিরে সতীর্থদের উচ্ছ্বাস, গ্যালারি থেকে সহপাঠীদের চিৎকার আর হাততালিতে মুহূর্তের মধ্যেই যেন বদলে যায় গোটা মাঠের পরিবেশ। আবার প্রতিপক্ষের আক্রমণের সময় গোলরক্ষকের মরিয়া ঝাঁপ, ডিফেন্ডারদের শেষ মুহূর্তে বল ক্লিয়ার করা কিংবা সতীর্থকে গোলের সুযোগ তৈরি করে দিতে নিঃস্বার্থভাবে বল বাড়িয়ে দেওয়া—প্রতিটি মুহূর্তেই ফুটে ওঠে খুদে খেলোয়াড়দের ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা। শুধু মাঠে নামা খেলোয়াড়রাই নয়, এই প্রতিযোগিতাকে ঘিরে উৎসাহ ছিল অন্যান্য পড়ুয়া, শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও। মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে অনেক অভিভাবককে দেখা যায় নিজেদের সন্তানদের উৎসাহ দিতে। কোথাও হাততালি, কোথাও আবার প্রিয় দলের খেলোয়াড়কে উদ্দেশ্য করে গলা ফাটিয়ে উৎসাহ—সব মিলিয়ে মঙ্গলবার সকাল থেকেই জামবন মাঠ হয়ে ওঠে এক ছোট্ট ফুটবল উৎসবের কেন্দ্র। তবে এই প্রতিযোগিতার গুরুত্ব শুধুমাত্র ফুটবল খেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। স্বাধীনতা সংগ্রামী ক্ষুদিরাম বসুর স্মৃতিকে সামনে রেখে এই আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের পড়ুয়াদের সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের একটি যোগসূত্র তৈরি করারও চেষ্টা করা হয়েছে। খুদিরাম বসু ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম। অল্প বয়সেই দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মবলিদান দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর সাহস, আত্মত্যাগ এবং দেশপ্রেম আজও নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস। আর সেই স্মৃতিকে সামনে রেখে শিশুদের নিয়ে এমন একটি ক্রীড়া আয়োজনের মাধ্যমে খেলাধুলার পাশাপাশি ইতিহাস ও দেশপ্রেমের বার্তাও পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আয়োজকদের বক্তব্য, শিশুদের সার্বিক বিকাশে খেলাধুলার গুরুত্ব অপরিসীম। শুধু বইয়ের পড়াশোনা নয়, মাঠের খেলাও একজন শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফুটবল কিংবা অন্য কোনও দলগত খেলায় অংশ নেওয়ার মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, নেতৃত্বের মানসিকতা এবং দলগতভাবে কাজ করার অভ্যাস তৈরি হয়।
ক্ষুদে পায়ে ফুটবলের ঝড়, ক্ষুদিরাম স্মরণে জমজমাট কাঁকসা
গোলের উল্লাসে মুখর জামবন মাঠ, ক্ষুদে ফুটবলারদের নিয়ে বিশেষ প্রতিযোগিতা

একই সঙ্গে মাঠে জয় যেমন আনন্দ দেয়, তেমনই হারও শেখায় কীভাবে ব্যর্থতাকে মেনে নিয়ে আবার নতুন করে লড়াইয়ে ফিরতে হয়। আর ছোট বয়স থেকেই এই মানসিকতা তৈরি হওয়া ভবিষ্যতে তাদের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজে লাগবে বলেই মনে করছেন আয়োজকরা। জামবন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহশিক্ষক অনুপম মুখোপাধ্যায় জানান, নিজেদের স্কুলের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এবার বিদবিহার অঞ্চলের ন’টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের একসঙ্গে নিয়ে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যেমন পরিচিতি এবং বন্ধুত্ব তৈরি হচ্ছে, তেমনই খেলাধুলার প্রতি তাদের আগ্রহও বাড়ছে। অনুপম মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, শিশুদের মাঠমুখী করার পাশাপাশি তাদের মধ্যে দলগত সংহতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মানসিকতা তৈরি করাই এই আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে একটি স্কুলের পড়ুয়ারা অন্য স্কুলের পড়ুয়াদের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে, একসঙ্গে খেলছে, একে অপরকে উৎসাহ দিচ্ছে। ফলে খেলার মাঠই হয়ে উঠছে সামাজিক বন্ধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। এই আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও যথেষ্ট উৎসাহ দেখা যায়। অনেকেই মনে করছেন, বর্তমান সময়ে শিশুদের একটা বড় অংশ মোবাইল ফোন এবং বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল বিনোদনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে। সেই জায়গায় তাদের নিয়মিত মাঠে নিয়ে আসা এবং খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। ফুটবল সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে। কারণ ফুটবল শুধু শরীরচর্চা নয়, এটি শেখায় একসঙ্গে এগিয়ে চলার কথা। একজন খেলোয়াড় একা ম্যাচ জেতাতে পারে না। প্রয়োজন হয় গোটা দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। কখন কোথায় পাস দিতে হবে, কখন আক্রমণে যেতে হবে, আবার কখন নিজের গোলপোস্ট রক্ষা করতে হবে—প্রতিটি মুহূর্তেই প্রয়োজন হয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং সতীর্থদের উপর আস্থা রাখার মানসিকতা। আর সেই শিক্ষাই ছোট বয়সে মাঠের মধ্য দিয়ে শিশুদের মধ্যে তৈরি করার চেষ্টা এই প্রতিযোগিতায়। দিনভর প্রতিযোগিতাকে ঘিরে জামবন মাঠে ছিল উৎসবের আবহ। খুদে খেলোয়াড়দের দৌড়ঝাঁপ, গোলের উল্লাস, সতীর্থদের হাততালি আর অভিভাবকদের উৎসাহে প্রাণ ফিরে পায় গোটা মাঠ। বয়সে ছোট হলেও প্রতিটি খেলোয়াড়ের চোখেমুখে ছিল নিজের স্কুলের হয়ে ভালো করার তাগিদ। শেষ পর্যন্ত অবশ্য প্রতিটি প্রতিযোগিতার মতো এখানেও জয়-পরাজয়ের হিসেব থাকবেই। কিন্তু এই বয়সে সেই হিসেবের থেকেও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে অংশগ্রহণ, আনন্দ এবং অভিজ্ঞতা অর্জন। আজ যে শিশু মাঠে নেমে প্রথমবার প্রতিযোগিতার চাপ অনুভব করছে, আগামী দিনে সেই শিশুই হয়তো আরও বড় মঞ্চে নিজের প্রতিভার পরিচয় দেবে। আর সেই সম্ভাবনার বীজ বপন হয় এমন ছোট ছোট আয়োজনের মধ্য দিয়েই। ক্ষুদিরাম বসুর স্মৃতিকে সামনে রেখে আয়োজিত এই ফুটবল প্রতিযোগিতা তাই শুধুমাত্র একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নতুন প্রজন্মকে মাঠমুখী করার উদ্যোগ, দলগত চেতনা গড়ে তোলার প্রয়াস এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে শিশুদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার বার্তা। ক্ষুদে পায়ের দৌড়, গোলের উচ্ছ্বাস আর নির্মল হাসিতে মঙ্গলবার যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল কাঁকসার জামবন ফুটবল মাঠ। জয়-পরাজয়ের গণ্ডি পেরিয়ে এই আয়োজন শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার, একসঙ্গে এগিয়ে চলার এবং নতুন স্বপ্ন দেখার এক সুন্দর মঞ্চ।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram