বিনামূল্যে HPV ভ্যাকসিন কর্মসূচির সূচনা

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
দুর্গাপুর : নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এবং জরায়ুমুখের ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। শনিবার থেকে রাজ্যজুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো বিনামূল্যে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস বা HPV ভ্যাকসিন প্রদান কর্মসূচি। এই উদ্যোগকে নারীদের স্বাস্থ্য রক্ষায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। শনিবার কলকাতা থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে এই বিশেষ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। একইসঙ্গে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা ও মহকুমা হাসপাতালেও ভার্চুয়াল মাধ্যমে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় দুর্গাপুর মহকুমা হাসপাতালেও আয়োজিত হয় বিশেষ অনুষ্ঠান। দুর্গাপুর মহকুমা হাসপাতালে ভার্চুয়াল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সম্প্রচারের পর প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে স্থানীয় স্তরে কর্মসূচির সূচনা করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিম বর্ধমানের জেলাশাসক পন্নামবলাম এস, দুর্গাপুর পশ্চিমের বিধায়ক লক্ষ্মণ চন্দ্র ঘোরুই, জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডা. মোহাম্মদ ইউনুস, স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিক, চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যকর্তারা জানান, বর্তমান সময়ে নারীদের মধ্যে জরায়ুমুখের ক্যানসার একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর বহু নারী এই রোগে আক্রান্ত হন। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে এখন এই রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। আর সেই লক্ষ্যেই রাজ্য সরকারের এই বৃহৎ উদ্যোগ। স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৪ বছর বা তার বেশি বয়সি কিশোরী ও তরুণীদের এই HPV ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। এই টিকাকরণ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হবে। ফলে সমাজের সব স্তরের মানুষ এই স্বাস্থ্য পরিষেবার সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। চিকিৎসকদের মতে, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস বা HPV একটি অত্যন্ত পরিচিত ভাইরাস, যা দীর্ঘমেয়াদে জরায়ুমুখের ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই ভাইরাসের সংক্রমণ দীর্ঘদিন শরীরে থেকে যায় এবং পরবর্তীকালে ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই প্রাথমিক পর্যায়েই প্রতিরোধমূলক টিকাকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, HPV ভ্যাকসিন শুধু জরায়ুমুখের ক্যানসারের ঝুঁকি কমায় না, বরং ভাইরাসজনিত আরও কয়েকটি গুরুতর রোগ প্রতিরোধেও সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বিশ্বের বহু উন্নত দেশ বহু বছর ধরেই এই টিকাকরণ কর্মসূচি চালু করেছে এবং তার ইতিবাচক ফলাফলও পাওয়া গিয়েছে।
বিনামূল্যে HPV ভ্যাকসিন কর্মসূচির সূচনা
জরায়ুমুখের ক্যানসার রুখতে রাজ্যজুড়ে শুরু HPV টিকাকরণ

স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকরা জানান, এই কর্মসূচিকে সফল করতে জেলা ও মহকুমা স্তরে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালগুলিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভ্যাকসিন মজুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদেরও বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে যাতে উপভোক্তারা নির্বিঘ্নে এই পরিষেবা পেতে পারেন। জানা গিয়েছে, পশ্চিম বর্ধমান জেলার বিভিন্ন জেলা হাসপাতাল, মহকুমা হাসপাতাল এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এই ভ্যাকসিন প্রদান করা হবে। শহরাঞ্চলের পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকার উপভোক্তারাও যাতে এই সুবিধা পান, তার জন্য বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে স্বাস্থ্য দফতর।স্বাস্থ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম বর্ধমান জেলায় প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩২ হাজার উপভোক্তাকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ধাপে ধাপে এই লক্ষ্য পূরণের জন্য বিশেষ অভিযান চালানো হবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত জেলাশাসক পন্নামবলাম এস বলেন, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রাজ্য সরকার ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন জনমুখী প্রকল্প বাস্তবায়ন করে চলেছে। স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও সহজলভ্য এবং আধুনিক করে তুলতে একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। HPV ভ্যাকসিন কর্মসূচি তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যদিকে বিধায়ক লক্ষ্মণ চন্দ্র ঘোরুই জানান, ক্যানসারের মতো মারণ রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেয়েদের সুস্থ ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডা. মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, বর্তমানে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। HPV ভ্যাকসিন সেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থারই একটি বড় অংশ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত চিকিৎসকরাও অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে সচেতনতার বার্তা দেন। তাঁরা জানান, অনেক সময় তথ্যের অভাব বা ভুল ধারণার কারণে মানুষ টিকাকরণ নিয়ে দ্বিধায় ভোগেন। কিন্তু HPV ভ্যাকসিন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, নিরাপদ এবং কার্যকর একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। তাই উপযুক্ত বয়সের কিশোরী ও তরুণীদের এই ভ্যাকসিন গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে এই কর্মসূচি আরও বিস্তৃত হলে জরায়ুমুখের ক্যানসারের প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রেও এটি একটি বড় ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। সব মিলিয়ে, নারীদের সুস্বাস্থ্য এবং ক্যানসারমুক্ত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিনামূল্যে HPV ভ্যাকসিন প্রদান কর্মসূচি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন এই কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন এবং সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণই হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম ভিত্তি।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram