দুর্গাপুর কেমিক্যাল কলোনিতে জল-বিদ্যুৎ সংকট, রাস্তা অবরোধ !

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
দুর্গাপুর : কেমিক্যালস কলোনিতে জল ও বিদ্যুৎ সংকটকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ছড়াল। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে থাকা দুর্গাপুর কেমিক্যালস কারখানার শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা বৃহস্পতিবার সকালে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভে সামিল হন। শুধু বিক্ষোভই নয়, সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবিতে কেমিক্যালস মোড়ে রাস্তা অবরোধও করেন তাঁরা। যার জেরে দীর্ঘক্ষণ ব্যাহত হয় যান চলাচল। আটকে পড়ে বাস, ট্রাক, ছোট গাড়ি-সহ একাধিক যানবাহন। জানা গিয়েছে, বহু বছর ধরে শিল্প সংকটের মুখে থাকা দুর্গাপুর কেমিক্যালস কারখানা বর্তমানে কার্যত বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। কারখানার সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১৮২ জন শ্রমিক গত সাত মাস ধরে কোনও বেতন পাননি বলে অভিযোগ। ফলে তাঁদের সংসারে নেমে এসেছে চরম আর্থিক দুরবস্থা। পরিবার চালানো, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা খরচ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে শ্রমিক পরিবারগুলিকে। এই অবস্থার মধ্যেই নতুন করে জল ও বিদ্যুৎ পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্ষোভ আরও বাড়তে থাকে। অভিযোগ, বুধবার রাতের অন্ধকারে কোনওরকম পূর্ব ঘোষণা বা নোটিস ছাড়াই কেমিক্যালস কলোনির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। বাসিন্দাদের দাবি, প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আগে থেকে কোনও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। হঠাৎ করেই বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় রাতভর সমস্যায় পড়েন এলাকার মানুষ। শুধু বিদ্যুৎ নয়, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রভাব পড়ে জল সরবরাহ ব্যবস্থাতেও। কারণ, এলাকার জল সরবরাহ পাম্প বিদ্যুতের উপর নির্ভরশীল। ফলে বৃহস্পতিবার সকাল হতেই পুরো কলোনিতে জল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। একদিকে পানীয় জলের সংকট, অন্যদিকে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় গরমে নাজেহাল হয়ে পড়েন বাসিন্দারা। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষদের সমস্যার মাত্রা আরও বেড়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমস্যার মধ্যে কাটছে তাঁদের জীবন। কারখানা বন্ধ, বেতন বন্ধ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা—সবকিছুর মধ্যে জল ও বিদ্যুতের মতো মৌলিক পরিষেবাও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। আর সেই কারণেই বৃহস্পতিবার সকাল দশটা নাগাদ শ্রমিক, তাঁদের পরিবারের সদস্য এবং এলাকার সাধারণ মানুষ একজোট হয়ে রাস্তায় নামেন। বিক্ষোভকারীরা কেমিক্যালস মোড়ে রাস্তা অবরোধ শুরু করেন।
দুর্গাপুর কেমিক্যাল কলোনিতে জল-বিদ্যুৎ সংকট, রাস্তা অবরোধ !
জল-বিদ্যুৎ পরিষেবা বন্ধ, ক্ষোভে ফুঁসছে কেমিক্যাল কলোনি ! রাস্তা অবরোধে শ্রমিক-বাসিন্দারা
হাতে প্ল্যাকার্ড, মুখে স্লোগান তুলে তাঁরা দাবি জানান, অবিলম্বে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় চালু করতে হবে, জল সরবরাহ স্বাভাবিক করতে হবে এবং দীর্ঘ সাত মাসের বকেয়া বেতন দ্রুত মিটিয়ে দিতে হবে। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, তাঁরা বারবার সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন। কিন্তু কোনও স্থায়ী সমাধান না মেলায় শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই রাস্তায় নেমেছেন। অবরোধের ফলে কেমিক্যালস মোড় এবং রাতুরিয়া-অঙ্গদপুর শিল্পাঞ্চল সংলগ্ন এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়। অফিসগামী মানুষ থেকে শুরু করে সাধারণ যাত্রীদেরও সমস্যার মুখে পড়তে হয়। দীর্ঘক্ষণ ধরে রাস্তার দুই প্রান্তে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে বিভিন্ন যানবাহন। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ বাহিনী। পুলিশ প্রথমে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। পরে প্রশাসনের প্রতিনিধিরাও ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ও দাবিদাওয়া শোনার পাশাপাশি দ্রুত সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয় বলে সূত্রের খবর। যদিও আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, শুধুমাত্র আশ্বাসে তাঁরা আর ভরসা করতে রাজি নন। বাস্তবে পরিষেবা চালু না হলে এবং বকেয়া বেতন সংক্রান্ত বিষয়ে স্পষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়া হলে তাঁদের আন্দোলন আরও বৃহত্তর আকার নিতে পারে। শ্রমিকদের একাংশের বক্তব্য, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই তাঁরা কার্যত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে রয়েছেন। বহু শ্রমিক সংসার চালাতে ধার-দেনার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ বিকল্প কাজের সন্ধানে অন্যত্র ছুটছেন। কিন্তু স্থায়ী আয়ের উৎস না থাকায় পরিবারগুলির অবস্থা ক্রমশ সংকটজনক হয়ে উঠছে। তার উপর জল ও বিদ্যুতের মতো প্রাথমিক পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাওয়া তাঁদের কাছে একপ্রকার মানবিক সংকটের পরিস্থিতি তৈরি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও একই সুরে অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের দাবি, কলোনিতে বহু প্রবীণ নাগরিক এবং অসুস্থ মানুষ বসবাস করেন। বিদ্যুৎ না থাকায় চিকিৎসা সংক্রান্ত নানা সমস্যাও তৈরি হচ্ছে। গরমের মধ্যে ফ্যান, আলো কিংবা পানীয় জলের ব্যবস্থা না থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। এদিকে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জল ও বিদ্যুৎ পরিষেবা বন্ধ হওয়ার কারণ এবং শ্রমিকদের অভিযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে আন্দোলনকারীদের হুঁশিয়ারি, যতদিন পর্যন্ত না তাঁদের দাবি পূরণ হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া হবে। প্রয়োজনে আরও বৃহত্তর গণআন্দোলনের পথেও হাঁটতে পারেন তাঁরা। ফলে দুর্গাপুর কেমিক্যালস কলোনির এই জল-বিদ্যুৎ সংকট এবং শ্রমিক অসন্তোষ আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর প্রশাসন ও শিল্পাঞ্চলের মানুষের।
Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram