বকেয়া বেতনের দাবিতে ভাল্ভ ম্যানদের বিক্ষোভ, ধর্মঘটের হুঁশিয়ারি !

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
দুর্গাপুর : টানা তিন মাসের বেতন বকেয়া। মাসের পর মাস কাজ করেও মেলেনি প্রাপ্য পারিশ্রমিক। দ্রুত বকেয়া বেতন মেটানোর দাবিতে এবার সরব হলেন দুর্গাপুরের সগরভাঙা কলোনির জল সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ভাল্ভ ম্যানরা। মঙ্গলবার সগরভাঙা কলোনির হাউজিং দফতরে বিক্ষোভ দেখান তাঁরা। সংশ্লিষ্ট আধিকারিককে ঘিরে নিজেদের ক্ষোভ উগরে দেন আন্দোলনকারীরা। কর্মীদের অভিযোগ, এক মাস বা দু’মাস নয়, টানা তিন মাস ধরে তাঁদের বেতন বকেয়া রয়েছে। ইতিমধ্যেই চতুর্থ মাসে পড়ে গিয়েছে পরিস্থিতি। অথচ এখনও তাঁদের হাতে পৌঁছয়নি প্রাপ্য বেতন। প্রতিদিনের কাজ নিয়মিতভাবে করলেও কেন তাঁদের বেতন আটকে রয়েছে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। জানা গিয়েছে, সগরভাঙা কলোনির জল সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন মোট ৩১ জন ভাল্ভ ম্যান। এলাকার বাড়ি বাড়ি জল সরবরাহ যাতে স্বাভাবিক থাকে, সেই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তাঁদের উপর। নির্দিষ্ট সময়ে ভাল্ভ খোলা, বন্ধ করা এবং জল সরবরাহের বিভিন্ন বিষয় দেখভালের কাজ করেন তাঁরা। অর্থাৎ, তাঁদের কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে এলাকার মানুষের দৈনন্দিন জল পরিষেবা। কিন্তু সেই কর্মীদেরই দীর্ঘদিন ধরে বেতন না পাওয়ার অভিযোগ সামনে আসায় তৈরি হয়েছে ক্ষোভ। আন্দোলনকারীদের দাবি, বেতন বকেয়ার বিষয়টি নিয়ে তাঁরা বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। সমস্যার কথা জানানো হলেও এখনও পর্যন্ত কার্যকর কোনও সমাধান হয়নি। ফলে বাধ্য হয়েই মঙ্গলবার হাউজিং দফতরের সামনে বিক্ষোভে নামতে হয়েছে তাঁদের। এদিন আন্দোলনকারীরা সংশ্লিষ্ট আধিকারিককে ঘিরে তাঁদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁদের বক্তব্য, সংসার চালানোর জন্য তাঁরা এই কাজ করেন। মাসের পর মাস বেতন আটকে থাকলে পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবেন, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মীদের আরও অভিযোগ, তিন মাসের বেতন বকেয়া থাকার পরেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কোনও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। তাঁদের বক্তব্য, কর্মীরা কাজ করছেন, অথচ তাঁদের প্রাপ্য অর্থ কেন সময়মতো দেওয়া হচ্ছে না—তার সদুত্তর তাঁরা পাচ্ছেন না। এই পরিস্থিতিতে আন্দোলনকারীরা এবার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তাঁদের দাবি, বুধবারের মধ্যে বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বেতন মেটানো না হলে বৃহস্পতিবার থেকে লাগাতার কর্মবিরতিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা। আর এখানেই তৈরি হয়েছে বড় আশঙ্কা। কারণ সগরভাঙা কলোনিতে রয়েছে প্রায় দুই হাজার আবাসন। এই বিপুল সংখ্যক আবাসনের জল সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন ওই ৩১ জন ভাল্ভ ম্যান। তাঁরা যদি বৃহস্পতিবার থেকে কর্মবিরতিতে চলে যান, তাহলে গোটা সগরভাঙা এলাকায় জল সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জলের মতো অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা বন্ধ বা ব্যাহত হলে সমস্যায় পড়বেন কয়েক হাজার মানুষ। বিশেষ করে পানীয় জল, রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং দৈনন্দিন অন্যান্য কাজের ক্ষেত্রে চরম ভোগান্তির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে এখন বেতন বকেয়ার এই সমস্যা শুধু কর্মীদের ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে থাকছে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে একটি বড় এলাকার জল পরিষেবার প্রশ্নও। এই পরিস্থিতিতে আন্দোলনরত কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছে বিজেপি। দুর্গাপুর পশ্চিমের বিজেপি বিধায়ক লক্ষণ চন্দ্র ঘোড়ুইয়ের কাছে নিজেদের সমস্যার কথা জানান আন্দোলনকারীরা। তাঁদের অভিযোগ এবং বেতন বকেয়ার বিষয়টি তাঁর কাছে তুলে ধরেন তাঁরা। দ্রুত সমস্যার সমাধানের দাবি জানান কর্মীরা।
বকেয়া বেতনের দাবিতে ভাল্ভ ম্যানদের বিক্ষোভ, ধর্মঘটের হুঁশিয়ারি !
বকেয়া বেতন মেটান, নইলে কর্মবিরতি ! দুর্গাপুরে ভাল্ভ ম্যানদের হুঁশিয়ারি
অন্যদিকে, দুর্গাপুর পূর্বের বিজেপি বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়ও বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, কর্মীদের বকেয়া বেতন দ্রুত মেটানোর দাবিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ, বেতন বকেয়ার এই সমস্যা এবার রাজনৈতিক পরিসরেও পৌঁছে গিয়েছে। বিজেপির পক্ষ থেকে প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগও তোলা হয়েছে। বিজেপির দুর্গাপুর পশ্চিম তিন নম্বর মণ্ডলের সভাপতি তেজনারায়ণ পান্ডে এই ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে বেতন পাচ্ছেন না, অথচ সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে তিনি সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। এমনকী তাঁর দাবি, এর পিছনে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার কোনও চক্রান্ত রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। যদিও এই অভিযোগের কোনও স্বাধীন প্রমাণ সামনে আসেনি। ফলে এই দাবির সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ। এদিকে গোটা বিষয়টি নিয়ে সগরভাঙা কলোনির হাউজিং দফতরের আধিকারিকদের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তাঁরা ক্যামেরার সামনে কোনও মন্তব্য করতে চাননি। ফলে কর্মীদের অভিযোগের জবাব কী, বেতন কেন আটকে রয়েছে, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বা আদৌ কোনও পদক্ষেপ করা হয়েছে কি না—এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। আর এই নীরবতাই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে মনে করছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, তাঁরা কোনও অতিরিক্ত সুবিধা চাইছেন না। যে কাজ করেছেন, তার প্রাপ্য বেতনই চাইছেন। তাই বেতন পাওয়ার জন্য কেন বারবার আন্দোলনে নামতে হবে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। কর্মীদের বক্তব্য, তিন মাস ধরে বেতন না পাওয়ার পরও তাঁরা জল সরবরাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা চালু রেখেছেন। কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে তাঁদের পক্ষে অনির্দিষ্টকাল কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই বুধবারের মধ্যে বকেয়া বেতন না মেটালে বৃহস্পতিবার থেকে কর্মবিরতিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা। এখন প্রশ্ন, বুধবারের মধ্যেই কি সমস্যার সমাধান হবে? নাকি বৃহস্পতিবার থেকে সত্যিই কর্মবিরতিতে যাবেন ৩১ জন ভাল্ভ ম্যান? যদি কর্মবিরতি শুরু হয়, তাহলে প্রায় দুই হাজার আবাসনের জল পরিষেবার কী হবে? প্রশাসন কি বিকল্প কোনও ব্যবস্থা করবে? নাকি দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে কর্মীদের বকেয়া বেতন মিটিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হবে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর এখন সময়ের অপেক্ষা। একদিকে বেতন না পাওয়া কর্মীদের ক্ষোভ, অন্যদিকে তাঁদের কর্মবিরতির হুঁশিয়ারি—সব মিলিয়ে সগরভাঙা কলোনিতে তৈরি হয়েছে চাপা উত্তেজনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, জল সরবরাহের মতো জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের বেতন সংক্রান্ত সমস্যা দ্রুত সমাধান করা জরুরি। কারণ কর্মীদের ন্যায্য পাওনা নিয়ে দীর্ঘসূত্রিতা হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের পরিষেবার উপরেই পড়তে পারে। তাই প্রশাসনের কাছে আন্দোলনকারীদের দাবি স্পষ্ট—বকেয়া বেতন দ্রুত মেটাতে হবে, সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না হয়, তার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। এখন নজর দুর্গাপুর প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট দফতরের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। বুধবারের মধ্যে বেতন মেটে কি না, কর্মীদের সঙ্গে প্রশাসনের আলোচনা হয় কি না এবং বৃহস্পতিবারের কর্মবিরতি শেষ পর্যন্ত বাস্তবে শুরু হয় কি না—সেটাই এখন দেখার। কারণ ৩১ জন ভাল্ভ ম্যানের এই আন্দোলন শুধু তাঁদের বকেয়া বেতনের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে সগরভাঙা কলোনির প্রায় দুই হাজার আবাসনের জল পরিষেবা। আর তাই বুধবারের মধ্যে সমাধান না হলে বৃহস্পতিবার থেকেই বড়সড় জল-সংকটের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে দুর্গাপুরের সগরভাঙায়।
Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram