This site uses cookies for analytics and to improve your experience. By clicking Accept, you consent to our use of cookies. Learn more in our privacy policy.
দুর্গাপুর : ফের শিল্পাঞ্চলে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা। আর সেই দুর্ঘটনায় ঝরে গেল দুই শ্রমিকের প্রাণ। মঙ্গলবার দুর্গাপুর প্রজেক্টস লিমিটেড, অর্থাৎ ডিপিএল-এর কুলিং টাওয়ারে কাজ চলাকালীন ঘটে এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। ঘটনার পর মুহূর্তের মধ্যেই ডিপিএল চত্বরে ছড়িয়ে পড়ে চাঞ্চল্য। কাজ থামিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন অন্যান্য শ্রমিক, আধিকারিক এবং নিরাপত্তারক্ষীরা। ডিপিএল সূত্রে জানা গিয়েছে, কুলিং টাওয়ারের উঁচু অংশে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলছিল। সেখানে ঠিকাদারি সংস্থার অধীনে কর্মরত দুই শ্রমিক একসঙ্গে কাজ করছিলেন। হঠাৎই কোনও কারণে তাঁরা ভারসাম্য হারিয়ে বহু ফুট উঁচু থেকে নিচে পড়ে যান। বিকট শব্দ শুনে ছুটে আসেন সহকর্মীরা। রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় দুই শ্রমিককে। তড়িঘড়ি তাঁদের উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হয়। তবে চিকিৎসকদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ঘটনাস্থলেই তাঁদের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা যায়। মৃত দুই শ্রমিকের নাম উমেশ সাউ এবং পিন্টু কুমার ঘোষ। ৫৪ বছর বয়সি উমেশ সাউ পূর্ব বর্ধমানের অন্ডাল এলাকার বাসিন্দা। অন্যদিকে ৪৯ বছর বয়সি পিন্টু কুমার ঘোষ দুর্গাপুরের ইস্পাতনগরী বিজোন এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। দুজনেই দীর্ঘদিন ধরে ঠিকাদারি সংস্থার মাধ্যমে ডিপিএলে বিভিন্ন রক্ষণাবেক্ষণের কাজে যুক্ত ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে দুই শ্রমিকের পরিবারে। খবর পেয়ে কোকওভেন থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ মৃতদেহ উদ্ধার করে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। এর পাশাপাশি দুর্ঘটনাস্থল ঘিরে তদন্তও শুরু হয়েছে। কীভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটল? কাজের সময় নিরাপত্তা বেল্ট বা সেফটি হারনেস ব্যবহার করা হয়েছিল কি না ? নিরাপত্তা বিধি সম্পূর্ণভাবে মানা হয়েছিল কি ? উঁচুতে কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর ছিল কি না ? এই সমস্ত বিষয়ই এখন তদন্তের আওতায় এসেছে। ঘটনার পর থেকেই ডিপিএলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
নিরাপত্তা নিয়েই প্রশ্ন ! ডিপিএলে কুলিং টাওয়ার থেকে পড়ে দুই শ্রমিকের মৃত্যু
শিল্পাঞ্চলে উচ্চতায় কাজ করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী একাধিক সুরক্ষা ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক। তার মধ্যে রয়েছে সেফটি হারনেস, লাইফলাইন, হেলমেট, সেফটি নেট এবং নিয়মিত নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ। এই সমস্ত ব্যবস্থা যথাযথভাবে কার্যকর ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। যদিও ডিপিএল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছিল। ডিপিএলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক স্বাগতা মিত্র জানান, দুর্ঘটনার কারণ জানতে ইতিমধ্যেই বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, কী পরিস্থিতিতে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একইসঙ্গে মৃত দুই শ্রমিকের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে ডিপিএল কর্তৃপক্ষ। পরিবারকে সবরকম প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের ডেপুটি কমিশনার রাসপ্রিত সিং জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। ইতিমধ্যেই পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান নেওয়া হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি সংস্থার প্রতিনিধিদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানা গিয়েছে। তদন্তে কোনও গাফিলতির প্রমাণ মিললে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ডিপিএলের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের দুর্ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে এবারও স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে শ্রমিক মহলে। শ্রমিক সংগঠনগুলির একাংশের দাবি, উচ্চতায় কাজ করার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোরভাবে কার্যকর করা প্রয়োজন। নিয়মিত সেফটি অডিট, প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষেরও প্রশ্ন—যেখানে প্রতিদিন বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করেন শত শত শ্রমিক, সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও ফাঁক থেকে গেলে তার দায় কে নেবে? তবে এই মুহূর্তে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে কোনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়। তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে, এটি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনও ত্রুটির ফল। এদিকে দুই শ্রমিকের অকাল মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ তাঁদের পরিবার, সহকর্মী এবং গোটা শিল্পাঞ্চল। একটি দিনের কাজ, যা শেষ হওয়ার কথা ছিল নিরাপদে বাড়ি ফেরার মধ্য দিয়ে, তা শেষ হল দুই পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতির মধ্য দিয়ে। এখন সকলের নজর তদন্তের দিকে। এই ঘটনার প্রকৃত কারণ সামনে আসে কি না, দায় নির্ধারণ হয় কি না, এবং ভবিষ্যতে যাতে আর কোনও শ্রমিককে এভাবে প্রাণ হারাতে না হয়, সেই দিকেই তাকিয়ে রয়েছে শিল্পাঞ্চল।