This site uses cookies for analytics and to improve your experience. By clicking Accept, you consent to our use of cookies. Learn more in our privacy policy.
দুর্গাপুর : গান্ধী মোড় সার্কাস ময়দানে রঙিন আলোর ঝলকানি, বিশাল তাবু আর দর্শকদের উৎসাহে যেন ফিরে এসেছে এক পুরনো দিনের আবহ। রথের মেলাকে কেন্দ্র করে শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হল ‘টারজান সার্কাস’-এর। এক সময় ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদনের মাধ্যম ছিল সার্কাস। ছুটির দিন মানেই পরিবারের সবাইকে নিয়ে সার্কাস দেখতে যাওয়া ছিল বহু মানুষের কাছে এক বিশেষ আনন্দের স্মৃতি। শিশুদের বিস্ময়, বড়দের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে সার্কাস ছিল এক অনন্য সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। কিন্তু সময় বদলেছে। প্রযুক্তির উন্নতি এবং ডিজিটাল বিনোদনের বিস্তারে মানুষের বিনোদনের ধরনও পাল্টে গেছে। মোবাইল ফোন, সোশ্যাল মিডিয়া, ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এবং মাল্টিপ্লেক্স সংস্কৃতির ভিড়ে সার্কাসের জনপ্রিয়তা অনেকটাই কমে এসেছে। এর পাশাপাশি প্রাণী প্রদর্শনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার পর সার্কাস জগতের সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। একসময় হাতি, ঘোড়া, সিংহ কিংবা অন্যান্য প্রাণীর খেলা ছিল সার্কাসের অন্যতম আকর্ষণ। সেই অধ্যায় এখন ইতিহাস। ফলে নতুনভাবে নিজেদের গড়ে তোলার প্রয়োজন পড়ে সার্কাস সংস্থাগুলির। আর সেই চ্যালেঞ্জকেই সুযোগে পরিণত করার চেষ্টা করছে ‘টারজান সার্কাস’। এখন আর প্রাণীর খেলা নয়, বরং সম্পূর্ণ মানুষের দক্ষতা, সাহস এবং শারীরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করেই সাজানো হয়েছে প্রতিটি পরিবেশনা। শো-তে রয়েছে রোমাঞ্চকর ট্রাপিজ পারফরম্যান্স, উচ্চতায় ভারসাম্য রক্ষা করে কসরত, দ্রুতগতির জিমনাস্টিক, আগুনের রিং পেরিয়ে দুঃসাহসিক স্টান্ট এবং এমন একাধিক পরিবেশনা, যা মুহূর্তের জন্য দর্শকদের নিঃশ্বাস আটকে দেয়। শুধু রোমাঞ্চ নয়, রয়েছে হাস্যরসও। শিশুদের আনন্দ দিতে ক্লাউনদের অভিনয়, সংগীত, আলোর কারুকাজ এবং আধুনিক সাউন্ড এফেক্টে প্রতিটি শো হয়ে উঠছে আরও আকর্ষণীয়। প্রতিদিনের প্রদর্শনীতে শিশু থেকে প্রবীণ—সব বয়সের দর্শকদের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেকেই পরিবার নিয়ে সার্কাস দেখতে এসে ফিরে পাচ্ছেন ছোটবেলার স্মৃতি। আবার নতুন প্রজন্মের অনেক শিশু প্রথমবারের মতো সার্কাস দেখে মুগ্ধ হয়ে পড়ছে। দর্শকদের মতে, মোবাইল কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় নয়, সরাসরি শিল্পীদের সামনে বসে তাঁদের সাহসী পরিবেশনা দেখার অভিজ্ঞতার আলাদা আবেদন রয়েছে। শিল্পীদের পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং দক্ষতা প্রত্যেককে মুগ্ধ করছে।
ডিজিটালের যুগেও হার মানেনি সার্কাস ! দুর্গাপুরে দর্শকদের ভিড়
তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। সার্কাসের প্রতিটি শিল্পী বছরের পর বছর কঠোর অনুশীলনের মধ্য দিয়ে নিজেদের প্রস্তুত করেন। একটি ছোট ভুলও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই প্রতিটি কসরতের পেছনে থাকে অসংখ্য ঘণ্টার অনুশীলন, আত্মনিয়োগ এবং ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা। সার্কাসের ম্যানেজার এনামুল হক জানান, জীবজন্তুর খেলা বন্ধ হওয়ার পর সার্কাস সম্পূর্ণ নতুন রূপে দর্শকদের সামনে এসেছে। বর্তমান সময়ে নানা আর্থিক ও সামাজিক প্রতিকূলতার মধ্যেও শিল্পীদের অক্লান্ত পরিশ্রমেই এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সার্কাস শুধুমাত্র বিনোদন নয়, এটি একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প। এই শিল্পের সঙ্গে বহু মানুষের জীবিকা জড়িয়ে রয়েছে। দর্শকদের ভালোবাসা ও সহযোগিতা থাকলে আগামী দিনেও এই যাত্রা অব্যাহত থাকবে। বর্তমানে সার্কাস পরিচালনা করা আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল। এক শহর থেকে অন্য শহরে বিশাল তাবু, যন্ত্রপাতি, আলোর ব্যবস্থা এবং শিল্পীদের নিয়ে যাওয়া যেমন কঠিন, তেমনি প্রতিদিনের পরিচালন ব্যয়ও অনেক বেড়েছে। তবুও দর্শকদের মুখে হাসি ফোটানোর লক্ষ্যেই নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন সার্কাস শিল্পীরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সার্কাস শুধু বিনোদন নয়, এটি ভারতের লোকসংস্কৃতি ও পারফর্মিং আর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। দুর্গাপুরে রথের মেলার আবহে ‘টারজান সার্কাস’-এর উদ্বোধন সেই ঐতিহ্যকেই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল। সন্ধ্যা নামতেই রঙিন আলোয় আলোকিত তাবুর সামনে ভিড় জমাতে শুরু করেন দর্শকরা। টিকিট কেটে একে একে প্রবেশ করেন তাঁরা, আর শুরু হয় রোমাঞ্চ, বিস্ময় ও আনন্দে ভরা এক অন্যরকম যাত্রা। শিল্পীদের আশা, আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন ধরনের পরিবেশনা দর্শকদের আরও বেশি আকৃষ্ট করবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছে সার্কাসের ঐতিহ্যও পৌঁছে যাবে। এক সময় যে সার্কাস ছিল প্রতিটি শহরের বড় আকর্ষণ, আজ সেই শিল্প নতুন রূপে আবার মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করছে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও শিল্পীদের এই লড়াই প্রমাণ করে, প্রকৃত শিল্প কখনও হারিয়ে যায় না—সে নতুন রূপে, নতুন উদ্যমে আবারও ফিরে আসে মানুষের কাছে।