শ্রমিক বঞ্চনার অভিযোগে বিক্ষোভ, কাঠগড়ায় তৃণমূলের কোর কমিটি !

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
দুর্গাপুর : স্থানীয় শ্রমিকদের বঞ্চিত করে বহিরাগতদের কাজে নিয়োগের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠল দুর্গাপুরের নামো সগড়ভাঙা এলাকা। শুক্রবার একটি বেসরকারি ইস্পাত কারখানার গেটের সামনে বিক্ষোভে সামিল হন কাজ হারানো এবং অস্থায়ী শ্রমিকরা। দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত স্থানীয় শ্রমিকদের কাজ থেকে সরিয়ে বহিরাগতদের নিয়োগ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে প্রতিবাদে সরব হন তাঁরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় কোকওভেন থানার পুলিশ। শুক্রবার সকাল থেকেই কারখানার সামনে জড়ো হতে শুরু করেন বহু শ্রমিক। হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে এবং বিভিন্ন দাবি তুলে তাঁরা বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় শ্রমিকদের স্বার্থকে উপেক্ষা করা হয়েছে। যাঁরা বছরের পর বছর কারখানায় কাজ করেছেন, তাঁদের কাজের কার্ড বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের জায়গায় বাইরে থেকে শ্রমিক এনে কাজে নিয়োগ করা হয়েছে। শ্রমিকদের দাবি, তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে গঠিত কোর কমিটির মদতেই এই অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। তাঁদের অভিযোগ, স্থানীয় শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল, সেই কমিটির একাংশই উল্টে শ্রমিকদের বঞ্চিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা নিয়েছে। ফলে বহু পরিবার আজ আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শ্রমিকদের বক্তব্য, একাধিকবার এই বিষয়টি তৎকালীন নেতৃত্ব এবং কোর কমিটির সদস্যদের নজরে আনা হয়েছিল। বারবার আবেদন জানানো হয়েছিল যাতে স্থানীয় শ্রমিকদের কাজের সুযোগ বজায় থাকে এবং বহিরাগতদের নিয়োগের আগে এলাকার মানুষের কথা ভাবা হয়। কিন্তু অভিযোগ, তাঁদের দাবির কোনও গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বরং বারবার আশ্বাস মিললেও বাস্তবে কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি। প্রতিবাদী শ্রমিকদের আরও অভিযোগ, কোর কমিটির সদস্যদের কাছে বারবার আবেদন করা হলেও স্থানীয় শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে তাঁরা কার্যত উদাসীন ছিলেন। এমনকি কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করেই স্থানীয়দের উপেক্ষা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন তাঁরা। এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ জমতে থাকলেও কোনও সমাধান না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানান বিক্ষোভকারীরা।
শ্রমিক বঞ্চনার অভিযোগে বিক্ষোভ, কাঠগড়ায় তৃণমূলের কোর কমিটি !
দুই দশকের চাকরি হারিয়ে ক্ষোভ, ইস্পাত কারখানার সামনে বিক্ষোভ

বিক্ষোভে উপস্থিত শ্রমিক প্রদীপ বাসুরি জানান, তিনি প্রায় দুই দশক ধরে ওই কারখানায় কাজ করেছেন। দীর্ঘদিনের কর্মজীবনের পর ২০২৫ সালে হঠাৎ করেই তাঁর কাজের কার্ড বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর বহুবার পুনর্বহালের আবেদন জানানো হলেও কোনও ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার পরও কোনও কারণ না দেখিয়েই তাঁকে কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রদীপ বাসুরি বলেন, শুধুমাত্র তিনি নন, তাঁর মতো আরও অনেক স্থানীয় শ্রমিক একই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। বহু পরিবারের একমাত্র রোজগারের উৎস ছিল এই কারখানা। কাজ হারানোর ফলে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই বাধ্য হয়েই তাঁরা রাস্তায় নেমে নিজেদের দাবি তুলে ধরছেন। শ্রমিকদের দাবি, অবিলম্বে যাঁদের কাজের কার্ড বন্ধ করা হয়েছে, তাঁদের পুনরায় কাজে ফিরিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে কোনও নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। এলাকার যুবকদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসন ও কারখানা কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপও দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা। বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় কোকওভেন থানার পুলিশ। পুলিশ কর্মীরা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। যদিও আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তাঁদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। বিক্ষোভকারীদের একাংশের অভিযোগ, শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত দুর্গাপুরে স্থানীয় বাসিন্দাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ ক্রমশ কমে যাচ্ছে। বড় বড় শিল্প সংস্থাগুলিতে বহিরাগত শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়ছে, অথচ এলাকার বহু দক্ষ ও অভিজ্ঞ শ্রমিক কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে একদিকে যেমন বেকারত্ব বাড়ছে, তেমনই আর্থিক সমস্যার মুখে পড়ছেন বহু পরিবার। তাঁদের মতে, শিল্পাঞ্চলে স্থানীয়দের স্বার্থ রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিল্পের বিকাশের সঙ্গে এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকাও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্থানীয় মানুষ যদি কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে শিল্পের উন্নয়নের প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। শ্রমিকরা আরও জানিয়েছেন, তাঁদের দাবি নিয়ে যদি দ্রুত কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপ না করা হয়, তাহলে আগামী দিনে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটতে বাধ্য হবেন তাঁরা। প্রয়োজনে লাগাতার বিক্ষোভ, অবস্থান এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মসূচিও গ্রহণ করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা। সব মিলিয়ে, স্থানীয় শ্রমিকদের বঞ্চনার অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুর্গাপুরের নামো সগড়ভাঙার এই বিক্ষোভ নতুন করে শিল্পাঞ্চলে কর্মসংস্থান এবং স্থানীয়দের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এখন শ্রমিকদের দাবি নিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসন কী পদক্ষেপ করে, সেদিকেই নজর রয়েছে সকলের। স্থানীয় শ্রমিকদের পুনর্নিয়োগ এবং ভবিষ্যতে তাঁদের স্বার্থ সুরক্ষিত করার দাবিতে এই আন্দোলন আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram