ব্ল্যাকবোর্ড- খাতা-কলমও নেই—খোলা মাঠেই গৃহবধূদের সচেতনতার পাঠশালা রাজ্য পুলিশের

বর্তমানে মোবাইল ফোন পৌঁছে গিয়েছে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের হাতেও। আর সেই সুযোগকেই কাজে লাগাচ্ছে প্রতারকরা। কখনও সরকারি প্রকল্পের নাম করে ফোন, কখনও অচেনা নম্বর থেকে যোগাযোগ, আবার কখনও লোভনীয় অফার দেখিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা—প্রতারণার পদ্ধতি ক্রমশ বদলাচ্ছে। তাই গ্রামবাসীদের সহজ ভাষায় বোঝানো হয়, অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে কোনও তথ্য দেওয়া যাবে না। ফোনের ওপারে থাকা ব্যক্তি নিজেকে সরকারি আধিকারিক, ব্যাংক কর্মী বা অন্য কোনও পরিচিত প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি বলে দাবি করলেও যাচাই না করে তাঁর কথায় বিশ্বাস করা যাবে না। বিশেষ করে ওটিপি, ব্যাংক সংক্রান্ত তথ্য, ব্যক্তিগত নথির তথ্য কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনও গোপন তথ্য কোনও অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না। পুলিশ আধিকারিক তাপস চক্রবর্তী বলেন, অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে সতর্ক থাকতে হবে। অপরিচিত কেউ এলাকায় এসে নাম-পরিচয় বা ব্যক্তিগত তথ্য জানতে চাইলে কোনও তথ্য দেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে অন্নপূর্ণা যোজনা-সহ রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের নাম করে ফোন এলে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। কোনও পরিস্থিতিতেই ফোনে ওটিপি দেওয়া যাবে না। কারণ প্রতারকরা অনেক সময় মানুষের সরকারি প্রকল্প পাওয়ার আগ্রহকেই হাতিয়ার করে প্রতারণা করে। তাই কোনও প্রকল্পের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে কেউ ফোন করলে প্রথমেই তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি। শুধু সাইবার প্রতারণা নয়, এলাকার বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়েও গ্রামবাসীদের সঙ্গে আলোচনা করেন পুলিশকর্মীরা। দৈনন্দিন জীবনে কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, কোথায় সতর্ক থাকা প্রয়োজন, কোনও অপরাধ বা সন্দেহজনক ঘটনা চোখে পড়লে কীভাবে পুলিশকে জানাতে হবে—এসব বিষয়ও উঠে আসে আলোচনায়। এই কর্মসূচির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পুলিশ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে দূরত্ব কমানো। অনেক প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ এখনও পুলিশের কাছে যেতে দ্বিধা বোধ করেন। পুলিশের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগও তাঁদের সবসময় হয় না। সেই জায়গা থেকেই এই ধরনের সচেতনতা শিবিরের গুরুত্ব অনেক বেশি। গ্রামের মানুষের পাশে বসে, তাঁদের ভাষায় তাঁদের সমস্যার কথা শুনে পুলিশ আধিকারিকরা যে বার্তা দিলেন, তা শুধু একটি দিনের সচেতনতা কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারণ সচেতনতা মানে শুধু বিপদ ঘটলে ব্যবস্থা নেওয়া নয়। বিপদ ঘটার আগেই বিপদকে চিনে নেওয়া এবং নিজেকে সুরক্ষিত রাখার ক্ষমতা তৈরি করাও সচেতনতারই অংশ। আর তাই এই পাঠশালায় বই নেই, খাতা নেই, নেই ব্ল্যাকবোর্ড। তবু এখানে যে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, তার মূল্য কোনও পাঠ্যবইয়ের চেয়ে কম নয়। একদিকে বাল্যবিবাহ রোধের বার্তা, অন্যদিকে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার সাহস। তার সঙ্গে সাইবার প্রতারণা থেকে বাঁচার কৌশল এবং সরকারি প্রকল্পের নামে প্রতারণা ঠেকানোর সতর্কতা—সব মিলিয়ে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সচেতনতার পাঠ দিল পুলিশ। ত্রিপলের উপর বসে গ্রামের মহিলাদের এই ক্লাস হয়তো দেখতে খুব সাধারণ। কিন্তু এই সাধারণ আয়োজনের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে বড় একটি বার্তা—আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি মানুষের কাছে পৌঁছে তাঁদের সচেতন করাও পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব পালন করতেই এবার শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে গ্রামের মাঠে, মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেল পুলিশ। বই ছাড়া পাঠশালা, ব্ল্যাকবোর্ড ছাড়া ক্লাস—কিন্তু শিক্ষার বিষয় জীবন। আর সেই শিক্ষাই হয়তো আগামী দিনে বহু মানুষকে প্রতারণা, নির্যাতন এবং সামাজিক বিপদের হাত থেকে রক্ষা করবে।
