বেআইনি নির্মাণে কড়া DMC, বহুতলের অতিরিক্ত অংশ ভাঙার নির্দেশ !

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
দুর্গাপুর : বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে এবার কড়া অবস্থান নিল দুর্গাপুর নগর নিগম। অনুমোদিত বিল্ডিং প্ল্যান অমান্য করে বহুতল আবাসনে অতিরিক্ত নির্মাণের অভিযোগের তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মেলার পর সংশ্লিষ্ট আবাসনের মালিককে ১৫ দিনের মধ্যে বেআইনি অংশ নিজ দায়িত্বে ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দেশ কার্যকর না হলে পুরনিগম নিজেই আইন অনুযায়ী ভাঙার কাজ করবে এবং সেই খরচও সংশ্লিষ্ট মালিকের কাছ থেকেই আদায় করা হবে বলে স্পষ্ট জানানো হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুর্গাপুর জুড়ে ফের বেআইনি নির্মাণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদিত নকশার বাইরে অতিরিক্ত নির্মাণ, অবৈধ সম্প্রসারণ এবং বিল্ডিং নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ সামনে এসেছে। এবার সেই ধরনের একটি অভিযোগের ভিত্তিতেই প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করল দুর্গাপুর নগর নিগম। পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, বেনাচিতির এমকে প্লট এলাকার বাসিন্দা নিত্যগোপাল রায় এবং মিঠু রায়ের বিরুদ্ধে অনুমোদিত বিল্ডিং প্ল্যান বহির্ভূত নির্মাণের অভিযোগ দায়ের করেন গোপালপুরের বাসিন্দা সন্তনু মিশ্র। অভিযোগে দাবি করা হয়, সংশ্লিষ্ট বহুতল ভবনে পুরসভার অনুমোদিত নকশা অনুসরণ না করে অতিরিক্ত নির্মাণ করা হয়েছে, যা বিল্ডিং বিধি লঙ্ঘনের সামিল। অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে দুর্গাপুর নগর নিগম। গত ৫ জুন বিল্ডিং ইন্সপেক্টর এবং সার্ভেয়ার ঘটনাস্থলে পৌঁছে নির্মাণকাজ সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। ভবনের বিভিন্ন অংশের মাপজোক করা হয় এবং অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বাস্তব নির্মাণের তুলনামূলক পরীক্ষা করা হয়। তদন্তকারী দল প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করে বিস্তারিত রিপোর্ট প্রস্তুত করে। এরপর প্রশাসনিক নিয়ম মেনে গত ২৪ জুলাই অভিযোগকারী এবং অভিযুক্ত— উভয় পক্ষকে নিয়ে শুনানির আয়োজন করা হয়। সেখানে দুই পক্ষই নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন। অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে ২০১৪ সালে দুর্গাপুর নগর নিগমের অনুমোদিত বিল্ডিং প্ল্যান জমা দেওয়া হয়। সেই নকশা এবং পরিদর্শন রিপোর্ট একসঙ্গে খতিয়ে দেখেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা। পরিদর্শন রিপোর্ট এবং অনুমোদিত নকশা বিশ্লেষণের পর নগর নিগমের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার জানান, বাস্তবে নির্মিত ভবনের একাধিক অংশ অনুমোদিত প্ল্যানের সঙ্গে মিলছে না। অনুমোদিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত নির্মাণের প্রমাণ মিলেছে বলেই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বেআইনি নির্মাণে কড়া DMC, বহুতলের অতিরিক্ত অংশ ভাঙার নির্দেশ !
নকশা বহির্ভূত বহুতল নির্মাণে কড়া বার্তা, ভাঙার নির্দেশ দুর্গাপুর নগর নিগমের, ১৫ দিনের মধ্যে বেআইনি অংশ ভাঙার নির্দেশ

এরপর গত ৩০ জুলাই দুর্গাপুর নগর নিগমের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক আদেশনামা জারি করা হয়। ওই নির্দেশে বলা হয়েছে, অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মিত সমস্ত অংশ আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট মালিককে নিজ দায়িত্বে ভেঙে ফেলতে হবে। শুধু ভাঙলেই হবে না, কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পর তার রিপোর্টও নগর নিগমে জমা দিতে হবে। আদেশে আরও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি বেআইনি নির্মাণ অপসারণ না করা হয়, তাহলে দুর্গাপুর নগর নিগম নিজেই আইন অনুযায়ী ভাঙার কাজ করবে। সেই ক্ষেত্রে ভাঙার জন্য যে খরচ হবে, তার সম্পূর্ণ দায়ভার বহন করতে হবে সংশ্লিষ্ট মালিককেই। অর্থাৎ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি আর্থিক দায়ও বর্তাবে অভিযুক্তদের উপর। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও সামনে এসেছে। দুর্গাপুর পূর্ব কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় বিষয়টি নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে কোনও রকম আপস করা হবে না। যাঁরা সরকারি নিয়ম ভেঙে নির্মাণ করেছেন কিংবা এই ধরনের বেআইনি নির্মাণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিধায়কের দাবি, শুধু নির্মাণকারী নন, অবৈধ ফাইল বা বেআইনি অনুমোদনের সঙ্গে যদি কেউ যুক্ত থাকেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও নোটিশ জারি করা হবে। আইন সবার জন্য সমান এবং সরকারি নিয়ম লঙ্ঘন করে কেউ পার পেয়ে যাবেন না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন। তিনি আরও বলেন, দুর্গাপুরে পরিকল্পিত নগরায়ণ বজায় রাখতে হলে বিল্ডিং নিয়ম কঠোরভাবে কার্যকর করা জরুরি। কারণ অনুমোদিত নকশা বহির্ভূত নির্মাণ শুধু আইন ভঙ্গই নয়, ভবিষ্যতে নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, পার্কিং এবং নাগরিক পরিকাঠামোর উপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপকে তিনি সমর্থন করেন। নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুমোদিত বিল্ডিং প্ল্যান মেনে নির্মাণ করা বাধ্যতামূলক। অতিরিক্ত তলা, বাড়তি বারান্দা, অবৈধ সম্প্রসারণ কিংবা সেটব্যাক নিয়ম ভঙ্গ করে নির্মাণ করলে তা আইনত দণ্ডনীয়। এমন নির্মাণ ভবিষ্যতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। তাই সময়মতো নজরদারি ও আইন প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশও মনে করছেন, এই ধরনের পদক্ষেপ শহরে বেআইনি নির্মাণের প্রবণতা কমাতে কার্যকর ভূমিকা নেবে। দীর্ঘদিন ধরে যেসব এলাকায় নিয়ম না মেনে নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে, সেখানেও প্রশাসন একই ধরনের অভিযান চালাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তাঁরা। সব মিলিয়ে, বেনাচিতির এমকে প্লটের এই ঘটনায় দুর্গাপুর নগর নিগমের কড়া অবস্থান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে— অনুমোদিত বিল্ডিং প্ল্যান অমান্য করে কোনও নির্মাণই বরদাস্ত করা হবে না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বেআইনি অংশ অপসারণ না হলে আইন মেনে পুরনিগম নিজেই ব্যবস্থা নেবে এবং সেই খরচও সংশ্লিষ্ট মালিকের কাছ থেকেই আদায় করবে। একইসঙ্গে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের বার্তা, পরিকল্পিত ও নিরাপদ শহর গড়তে আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram