বিধানসভায় দুর্গাপুর ব্যারেজে বিকল্প রিজার্ভার তৈরির প্রস্তাব চন্দ্রশেখরের

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
দুর্গাপুর : ২০২০ সালের নভেম্বর মাস। দুর্গাপুরবাসীর কাছে সেই সময়টা এখনও এক দুঃস্বপ্নের মতো। হঠাৎ করেই দুর্গাপুর ব্যারেজের ৩১ নম্বর লকগেটে বড়সড় বিপর্যয় দেখা দেয়। লকগেট ভেঙে যাওয়ার ফলে মুহূর্তের মধ্যে ব্যারেজ থেকে বিপুল পরিমাণ জল বেরিয়ে যেতে শুরু করে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কার্যত জলশূন্য হয়ে পড়ে দুর্গাপুর ব্যারেজ। দামোদর নদীর জল প্রবল বেগে বেরিয়ে গিয়ে নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। অন্যদিকে দুর্গাপুর শহর, শিল্পাঞ্চল এবং আশপাশের বহু এলাকায় দেখা দেয় তীব্র পানীয় জলের সঙ্কট। দিনের পর দিন দুর্ভোগ পোহাতে হয় সাধারণ মানুষকে। সেই ঘটনার রেশ এখনও কাটেনি। কারণ দুর্গাপুর ব্যারেজ শুধু একটি জলাধার নয়, এটি গোটা শিল্পাঞ্চল এবং লক্ষাধিক মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। পানীয় জল সরবরাহ থেকে শুরু করে শিল্প কারখানার জলের চাহিদা, কৃষিকাজ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য—সব ক্ষেত্রেই ব্যারেজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ব্যারেজে কোনও ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি বা অবকাঠামোগত সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব পড়ে বহু মানুষের জীবনে। এই প্রেক্ষাপটেই এবার রাজ্য বিধানসভায় গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রস্তাব উত্থাপন করলেন দুর্গাপুর পূর্ব কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি দুর্গাপুর ব্যারেজের জন্য একটি বিকল্প রিজার্ভার এবং বুস্টার পাম্পিং ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে আবারও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে দুর্গাপুর ও সংলগ্ন এলাকার মানুষকে। বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ২০২০ সালের ঘটনাটি প্রমাণ করে দিয়েছে যে শুধুমাত্র ব্যারেজের উপর নির্ভর করে জল সরবরাহ ব্যবস্থা চালানো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। একটি লকগেট বিকল হয়ে যাওয়ার কারণে গোটা অঞ্চলে জল সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। সেই সময় পানীয় জলের জন্য হাহাকার দেখা দিয়েছিল বিভিন্ন এলাকায়। প্রশাসনকে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হিমশিম খেতে হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, দুর্গাপুর ব্যারেজে একাধিক লকগেট দীর্ঘদিনের পুরনো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষয় ও যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। অতীতেও একাধিকবার লকগেট সংক্রান্ত সমস্যা এবং রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাই শুধুমাত্র মেরামতির উপর নির্ভর না করে একটি বিকল্প জল সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
বিধানসভায় দুর্গাপুর ব্যারেজে বিকল্প রিজার্ভার তৈরির প্রস্তাব চন্দ্রশেখরের
বিকল্প রিজার্ভার ও বুস্টার পাম্পিং ব্যবস্থা গড়ার দাবি বিজেপি বিধায়কের

বিজেপি বিধায়কের প্রস্তাব অনুযায়ী, দুর্গাপুর অঞ্চলে একটি বড় রিজার্ভার তৈরি করা হলে ব্যারেজে কোনও ধরনের বিপর্যয় ঘটলেও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পানীয় জল সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বুস্টার পাম্পিং স্টেশন তৈরি হলে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত জল সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা সহজ হবে। এতে সাধারণ মানুষ যেমন উপকৃত হবেন, তেমনই শিল্পাঞ্চলের উৎপাদন ব্যবস্থাও বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাবে। বিশেষজ্ঞদের একাংশও মনে করেন, বর্তমান সময়ে জল নিরাপত্তা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কারণে জলের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বড় জলাধারগুলির পাশাপাশি বিকল্প সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা বহু রাজ্যেই গুরুত্ব পাচ্ছে। দুর্গাপুরের মতো শিল্পনির্ভর অঞ্চলেও একই ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর হতে পারে বলে মত তাঁদের। ২০২০ সালের ঘটনার সময় দুর্গাপুর, আসানসোল এবং সংলগ্ন একাধিক এলাকায় পানীয় জলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। বিভিন্ন এলাকায় ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে জল পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। বহু মানুষকে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে জল সংগ্রহ করতে হয়। শিল্পাঞ্চলের বেশ কিছু সংস্থাকেও বিকল্প উৎস থেকে জল সংগ্রহের চেষ্টা করতে হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা আজও অনেকের মনে তাজা। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মতে, দুর্গাপুর ব্যারেজের গুরুত্ব বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। শুধুমাত্র লকগেট সংস্কার বা রক্ষণাবেক্ষণ নয়, জরুরি পরিস্থিতির জন্য আলাদা জল সংরক্ষণ ব্যবস্থাও থাকা উচিত। কারণ ভবিষ্যতে কোনও অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা ঘটলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা যাতে ব্যাহত না হয়, সেই প্রস্তুতি আগে থেকেই থাকা প্রয়োজন। তবে এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আর্থিক ব্যয়, জমি নির্বাচন, পরিবেশগত প্রভাব এবং প্রযুক্তিগত সম্ভাব্যতার বিষয়গুলিও বিবেচনা করতে হবে। একটি বড় রিজার্ভার তৈরি করতে হলে বিস্তৃত পরিকল্পনা এবং একাধিক দফতরের সমন্বয় প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এদিকে বিধানসভায় উত্থাপিত এই প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। জল সরবরাহ এবং অবকাঠামোগত নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সব পক্ষেরই ইতিবাচক ভূমিকা থাকা উচিত বলে মত অনেকের। কারণ এটি কোনও রাজনৈতিক ইস্যু নয়, বরং লক্ষাধিক মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, অতীতের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য কোনও স্থায়ী ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে কি রাজ্য সরকার? দুর্গাপুর ব্যারেজের বিকল্প রিজার্ভার এবং বুস্টার পাম্পিং ব্যবস্থার প্রস্তাব কতটা গুরুত্ব পায়, সেদিকেই নজর থাকবে শিল্পাঞ্চলবাসী থেকে শুরু করে প্রশাসনিক মহলের। কারণ জল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু বর্তমানের প্রয়োজন নয়, আগামী দিনের জন্যও একটি অপরিহার্য বিনিয়োগ।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram