বন্ধ কারখানার বুকে বিশ্বকর্মা পুজো, স্মৃতিতে শিল্প, বাস্তবে শূন্যতা

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
দুর্গাপুর: রাত পোহালেই দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আরাধনায় মাতোয়ারা হয়ে উঠবে শিল্প শহর দুর্গাপুরের সিংহভাগ মানুষ।শিল্পের দেবতার আরাধনা মধ্যেই খুঁজবে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার ফেলে আসা অতীত গরিমার সুখস্মৃতি। দুর্গাপুরের ইতিহাসে উঁকি দিলে দেখা যাবে শহর হিসেবে একটু একটু করে যখন পাখা মেলছে অয়োমুখী জঙ্গলকন্যা এই রাঢ়ভূমি, তখনই শিল্পের দেবতার আরাধনা শুরু হয় শহরের নানান জনপদে।ষাটের দশকের গোড়ার কথা। দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার চিমনি দিয়ে তখন সবে উড়তে শুরু করেছে কালো ধোঁয়া, নতুন শিল্প সম্ভাবনার নবজোয়ারে লক্ষ মানুষের অন্নসংস্থানের আশ্বাস,দুরন্ত গতির রথের চাকায় উন্নয়নের ধ্বজা, তখন দেবশিল্পীর আরাধনা মন্ত্রেও যেন লেগে থাকত নতুন যুগের আগমনীবার্তা। একের পর এক গড়ে ওঠা কল কারখানায় আগামীর প্রত্যাশা পূরণের দৃঢ় প্রত্যয়। সাবেক হেভী ইঞ্জিনীয়ারিং কর্পোরেশন-এর উত্তরণ ঘটল ‘মাইনিং অ্যান্ড অ্যালায়েড মেশিনারি কর্পোরেশন’ ‘এমএএমসি’ নামে। গড়ে উঠল ‘হিন্দুস্তান ফার্টিলাইজার কর্পোরেশন’, ‘মিশ্র ইস্পাত কারখানা’ থেকে অসংখ্য ম্যানুফ্যাকচারিং সংস্থা।   শিল্পের প্রবল জোয়ারে তখন একের পর এক শিল্প সংস্থা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। আর এই সমস্ত কারখানায় বিদ্যুৎ জোগানোর দায়িত্ব নিয়ে তৈরি হল ‘দুর্গাপুর প্রোজেক্টস লিমিটিড’, ‘দুর্গাপুর থার্মাল পাওয়ার স্টেশন’, ‘এনটিপিসি’-র মতো তাপবিদ্যুৎ কারখানা। সেই শিল্প জোয়ারের মহাযজ্ঞের প্রতিবিম্ব তখন এ শিল্পাঞ্চলের নতুন সর্বনামের অহঙ্কার। দুর্গাপুর হয়ে উঠল ‘ভারতের রূঢ়’। পশ্চিম জার্মানীর শিল্প সমৃদ্ধ সেই শহরের সাথে সমোচ্চারিত হওয়া সেদিনের সেই গর্বের শহর তখন গমগম করত দেব শিল্পীর আরাধনায়।উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত শ্রমিকের ছিল দুটো শক্ত হাত। শ্রমজীবী মানুষকে স্যালুট জানাতে দুর্গাপুরের এমএএমসি কারখানাকে ঘিরেই তৈরি হল ‘বিশ্বকর্মা নগরী’। সেই সোনালী দিনগুলো কখন যেন ফিরে গেল এক ধূসর অতীতে। মাত্র তিন দশকের মধ্যেই ঝিমিয়ে পড়ল এই শিল্পশহর।দিগভ্রান্ত জঙ্গী আন্দোলন, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের ভ্রান্ত শিল্পনীতির দাঁত নখে ফালা ফালা হয়ে গেল এ শহরের শৈল্পিক ভবিষ্যত।একের পর এক বন্ধ হয়ে গেল অতীতের সেই সমস্ত কারখানা, যেগুলি একদিন এ শহরকে দিয়েছিল আন্তর্জাতিক পরিচিতি। শহরে বিশ্বকর্মা পুজো আজও হয়, আজ মৃত কারখানার শবদেহের উপর বিশ্বকর্মার মন্ত্রোচ্চারণ বন্ধ কারখানার শ্রমিকের শ্রবণ যন্ত্রে বিলাপের মতই যেন করুণ শোনায়, কারা যেন ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, কর্মই যেখানে নেই,সেখানে ‘বিশ্বকর্মা’ নেহাতই বেমানান নয়কি ! তবু দেবশিল্পীর আরাধনা হয়,কৃত্রিম আনন্দের ছন্দে নিজেকে হারানোর এক মরীয়া প্রয়াস বাঁচিয়ে রাখেন অকালে কাজ হারানো ভুখা নাঙ্গা শ্রমিকের দল !
Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram