This site uses cookies for analytics and to improve your experience. By clicking Accept, you consent to our use of cookies. Learn more in our privacy policy.
দুর্গাপুর : এক সিভিক ভলান্টিয়ারের কথিত ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের ভিডিও সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হতেই দুর্গাপুরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। একজন সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে কর্তব্যরত অবস্থায় ঠিক কী ধরনের আচরণ করা যায়, আর কোথায় প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমারেখা—এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে নেটমাধ্যমে। ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে এক মোটরবাইক চালককে উদ্দেশ্য করে এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যাচ্ছে, “তোকে রাস্তায় ফেলে পেটাবো, দেখি তোকে কে বাঁচায়।” ভিডিওটির সত্যতা এবং সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট প্রশাসনের তরফে এখনও প্রকাশ্যে নিশ্চিত করা হয়নি। তবে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই ওই বক্তব্যকে ঘিরে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। ঘটনাটি রবিবার দুর্গাপুরের গোপালমাঠ সংলগ্ন ১৯ নম্বর জাতীয় সড়কের বলে জানা গিয়েছে। সেখানে ট্রাফিক পুলিশের ডিউটি চলাকালীন বিনা হেলমেটে মোটরবাইক চালানোর অভিযোগে এক চালককে আটকানো হয়। অভিযোগ, সেই সময় চন্দন নামে এক সিভিক ভলান্টিয়ার ওই বাইক চালকের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, চালকের কাছ থেকে লাইসেন্স বা অন্যান্য নথি দেখতে চাওয়ার আগেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপরই ওই সিভিক ভলান্টিয়ার চালককে হুমকি দেন বলে অভিযোগ। ভাইরাল ভিডিওতে ধরা পড়া কথোপকথনকে কেন্দ্র করেই এখন প্রশ্ন উঠছে—ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করার দায়িত্বে থাকা একজন সিভিক ভলান্টিয়ার কীভাবে একজন নাগরিককে এই ধরনের ভাষায় হুমকি দিতে পারেন? ঘটনাস্থলে সেই সময় ট্রাফিক পুলিশের আধিকারিকরাও উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় ট্রাফিক পুলিশ আধিকারিকরা হস্তক্ষেপ করেন এবং বিষয়টি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু ঘটনার পর আরও বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে। বিশেষ সূত্রে জানা গিয়েছে, ভিডিওটি সমাজমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ২৪ ঘণ্টা পরও অভিযুক্ত সিভিক ভলান্টিয়ারের বিরুদ্ধে কোনও আইনি বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যদিও এই তথ্য প্রশাসনের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, ভাইরাল ভিডিও সামনে আসার পরেও কেন কোনও তদন্ত বা প্রাথমিক পদক্ষেপ দেখা গেল না ? আর এখানেই সামনে আসছে সিভিক ভলান্টিয়ারদের ক্ষমতা ও দায়িত্বের বিষয়টি। সিভিক ভলান্টিয়ারদের মূল ভূমিকা হল পুলিশ প্রশাসনকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহায়তা করা। বিশেষ করে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জনসাধারণকে সচেতন করা এবং পুলিশের নির্দেশ অনুযায়ী বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করাই তাঁদের কাজের অন্যতম অংশ। কিন্তু আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাঁদের ক্ষমতা কতটা—সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। গাড়ি আটকানো, চালকের কাছ থেকে নথি পরীক্ষা করা, আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া কিংবা কোনও নাগরিককে হুমকি দেওয়ার মতো বিষয় নিয়ে সিভিক ভলান্টিয়ারদের ভূমিকা ও ক্ষমতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। আইন প্রয়োগের মূল ক্ষমতা পুলিশের হাতে থাকলেও বাস্তবে অনেক সময় সিভিক ভলান্টিয়ারদের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা নিতে দেখা যায়। আর সেই কারণেই তাঁদের প্রশিক্ষণ, আচরণবিধি এবং জবাবদিহিতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ একজন সাধারণ নাগরিক যখন রাস্তায় পুলিশের পোশাক বা পুলিশের সঙ্গে যুক্ত কোনও ব্যক্তির মুখোমুখি হন, তখন তাঁর কাছ থেকে স্বাভাবিকভাবেই সংযত ও আইনসম্মত আচরণ প্রত্যাশা করা হয়। সেখানে যদি কোনও নাগরিককে প্রকাশ্যে মারধরের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা শুধু ব্যক্তিগত দুর্ব্যবহারের বিষয় থাকে না—এর সঙ্গে জড়িয়ে যায় পুলিশের ভাবমূর্তি এবং প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার প্রশ্নও।
‘রাস্তায় ফেলে পেটাবো’—দুর্গাপুরে সিভিক ভলান্টিয়ারের হুমকির ভিডিও ভাইরাল
এর আগেও বিভিন্ন সময়ে সিভিক ভলান্টিয়ারদের বিরুদ্ধে গাড়ির চাবি কেড়ে নেওয়া, চালকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, অযথা হয়রানি এবং অর্থ দাবি করার মতো অভিযোগ সামনে এসেছে। যদিও প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা পৃথকভাবে তদন্তের বিষয়, তবুও বারবার একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় সিভিক ভলান্টিয়ারদের প্রশিক্ষণ এবং নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে ট্রাফিক ডিউটির ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁদের সরাসরি যোগাযোগ বেশি। ফলে আইন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণ এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভদ্র ও পেশাদার আচরণের প্রশিক্ষণ কতটা দেওয়া হচ্ছে, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন অনেকে। এই ঘটনায় আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বিনা হেলমেটে মোটরবাইক চালানো যদি সত্যিই হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই তা নিয়মভঙ্গের আওতায় পড়ে। ট্রাফিক আইন ভাঙলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আইন ভাঙার অভিযোগ থাকলেও কোনও নাগরিককে হুমকি দেওয়া বা অপমানজনক ভাষায় কথা বলার অভিযোগকে সমর্থন করা যায় কি না—সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। অর্থাৎ, একজন চালক ট্রাফিক আইন ভেঙেছেন কি না, সেটা এক বিষয়। আর সেই আইনভঙ্গের কারণে কর্তব্যরত কর্মীর আচরণ কেমন হবে, সেটা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। আইন ভাঙলে আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা কাউকে মারধরের হুমকি দেওয়া কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য আচরণ কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর প্রশাসনকেই দিতে হবে। এই ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সমাজমাধ্যমে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। আবার কেউ বলছেন, ভিডিওটির সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট সামনে না এনে শুধুমাত্র কয়েক সেকেন্ডের ফুটেজ দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত নয়। তাই এখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। ভিডিওটি কীভাবে তৈরি হল, তার আগে ঠিক কী ঘটেছিল, মোটরবাইক চালক এবং সিভিক ভলান্টিয়ারের মধ্যে কী কথোপকথন হয়েছিল, ঘটনাস্থলে থাকা ট্রাফিক আধিকারিকরা কী দেখেছিলেন—সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা দরকার। প্রশ্ন একটাই—যদি অভিযোগ সত্যি হয়, তাহলে একজন সিভিক ভলান্টিয়ারকে এই ধরনের আচরণের জন্য কীভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে ? আর যদি অভিযোগের সত্যতা না থাকে, তাহলে প্রকৃত ঘটনা কী—সেটিও প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট করা জরুরি। কারণ এই বিতর্ক শুধুমাত্র একজন সিভিক ভলান্টিয়ারকে ঘিরে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পুলিশের ভাবমূর্তি, সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রশাসনের সম্পর্ক এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ক্ষমতার সীমারেখার প্রশ্ন। এখন তাই নজর দুর্গাপুর প্রশাসন এবং পুলিশ বিভাগের দিকে। ভাইরাল ভিডিওটি খতিয়ে দেখে কোনও তদন্ত শুরু হয় কি না, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কোনও বিভাগীয় বা আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না, এবং সিভিক ভলান্টিয়ারদের ভূমিকা ও ক্ষমতা নিয়ে প্রশাসনের তরফে কোনও স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয় কি না—সেদিকেই তাকিয়ে সাধারণ মানুষ। কারণ রাস্তায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের নামে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখাই যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে সেই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও আইন, শৃঙ্খলা এবং শালীনতার সীমারেখা বজায় রাখা equally জরুরি। আর সেই সীমারেখা কোথায়—দুর্গাপুরের এই ভাইরাল ভিডিও ফের একবার সেই প্রশ্নই সামনে এনে দিল।