শ্রাবণের প্রথম সোমবারে রাঢ়েশ্বর শিব মন্দিরে ভক্তের ঢল

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
দুর্গাপুর : ভোরের আলো ফোটার আগেই রাঢ়েশ্বর শিব মন্দির চত্বরে শুরু হয়ে যায় ভক্তদের ঢল। চারদিক জুড়ে শুধুই “হর হর মহাদেব”, “বোল বাম” ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। কেউ খালি পায়ে, কেউ আবার কাঁধে বাঁক নিয়ে বহু কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে এসে দাঁড়িয়েছেন বাবার দরবারে। শুধু পশ্চিম বর্ধমান নয়, পূর্ব বর্ধমান, বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, হুগলি-সহ দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলা থেকে হাজার হাজার ভক্ত এদিন রাঢ়েশ্বর শিব মন্দিরে আসেন। তাঁদের হাতে গঙ্গাজলের কলসি, কাঁধে বাঁক, মুখে ভক্তিমূলক স্লোগান— সব মিলিয়ে এক অনন্য ধর্মীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, শ্রাবণ মাস মহাদেবের অত্যন্ত প্রিয়। আর এই মাসের প্রতিটি সোমবার শিবপূজার বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে। তাই বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এই দিনে ভক্তদের উপস্থিতি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সকাল থেকেই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করেন সকলেই, যাতে একবার বাবা রাঢ়েশ্বরের শিবলিঙ্গে গঙ্গাজল নিবেদন করতে পারেন। কেউ পরিবারের সুখ-শান্তির জন্য প্রার্থনা করছেন, কেউ সুস্বাস্থ্য কামনা করছেন, আবার কেউ সন্তানদের মঙ্গল ও জীবনের সাফল্যের আশীর্বাদ চাইছেন। অনেকেই মানত পূরণ করতে এসে শিবলিঙ্গে জল, দুধ, বেলপাতা ও ফুল নিবেদন করেন। ভক্তদের বিশ্বাস, নিষ্ঠা ও ভক্তিভরে মহাদেবের আরাধনা করলে তিনি সকলের মনোবাসনা পূরণ করেন। রাঢ়েশ্বর শিব মন্দির শুধু ধর্মীয় আস্থার কেন্দ্রই নয়, এটি বহন করে চলেছে বহু শতাব্দীর ইতিহাসও। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, সেন রাজবংশের অন্যতম শাসক রাজা বল্লাল সেন একসময় দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। বহু চিকিৎসার পরও যখন তিনি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি, তখন এক রাতে স্বপ্নে দেবাদিদেব মহাদেব তাঁকে রোগমুক্তির উপায় নির্দেশ দেন। স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী রাজা বল্লাল সেন বর্তমান কাঁকসার আড়া গ্রামের কালদিঘি পুকুরপাড়ে শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। সেই মন্দিরেই প্রতিষ্ঠিত হয় রাঢ়েশ্বর শিবলিঙ্গ। বিশ্বাস করা হয়, এরপর থেকেই রাজা সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং নিয়মিত শিবপূজার প্রচলন শুরু হয়। সেই ঐতিহ্য আজও সমান শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠার সঙ্গে বহন করে চলেছেন এলাকার মানুষ এবং দূরদূরান্ত থেকে আসা ভক্তরা।
শ্রাবণের প্রথম সোমবারে রাঢ়েশ্বর শিব মন্দিরে ভক্তের ঢল
কাঁধে বাঁক, হাতে গঙ্গাজল… রাঢ়েশ্বরে ভক্তদের ঢল

শ্রাবণ মাস এলেই এই ঐতিহাসিক মন্দিরকে ঘিরে যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়। প্রতিটি সোমবার হাজার হাজার মানুষ এখানে এসে মহাদেবের দর্শন করেন। মন্দির চত্বরে বসে বিভিন্ন ধর্মীয় সামগ্রীর অস্থায়ী দোকান। বেলপাতা, ধূপ, ফুল, মালা, প্রসাদ, গঙ্গাজল রাখার কলসি— সবকিছু নিয়েই জমজমাট হয়ে ওঠে মেলার পরিবেশ। ভক্তদের সুবিধার জন্য বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে পানীয় জল, বিশ্রাম ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়। অনেক জায়গায় শিবভক্তদের জন্য বিনামূল্যে শরবত ও প্রসাদ বিতরণ করা হয়। ফলে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মন্দির সংলগ্ন এলাকায় উৎসবের আবহ বিরাজ করে। এত বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগমকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের তরফেও নেওয়া হয় বিশেষ ব্যবস্থা। মন্দির চত্বরে মোতায়েন করা হয় পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশকর্মী। ভিড় নিয়ন্ত্রণে ব্যারিকেড তৈরি করা হয় এবং দর্শনার্থীদের জন্য আলাদা প্রবেশ ও প্রস্থান পথ নির্ধারণ করা হয়। যানজট এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরাও সারিবদ্ধভাবে ভক্তদের দর্শন ও জল নিবেদনে সহযোগিতা করেন। প্রবীণ নাগরিক, মহিলা এবং শিশুদের যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, সেদিকেও বিশেষ নজর রাখা হয়। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন উপস্থিত ভক্তরা। ভক্তদের বক্তব্য, বছরের প্রতিটি শ্রাবণ সোমবারই তাঁরা এখানে আসার চেষ্টা করেন। অনেকেই রাতভর হেঁটে গঙ্গা থেকে জল নিয়ে এসে বাবা রাঢ়েশ্বরের মাথায় নিবেদন করেন। তাঁদের বিশ্বাস, এই পূজার মাধ্যমে জীবনের সব বাধা দূর হয় এবং পরিবারে সুখ-সমৃদ্ধি ফিরে আসে। একদিকে শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য, অন্যদিকে অগাধ ধর্মীয় বিশ্বাস— এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই আজও কাঁকসার আড়ার রাঢ়েশ্বর শিব মন্দির লক্ষ লক্ষ মানুষের আস্থার কেন্দ্র হয়ে রয়েছে। শ্রাবণের প্রথম সোমবারে সেই বিশ্বাসই আরও একবার ধরা পড়ল হাজারো ভক্তের ঢল, ভক্তিমূলক আবহ এবং “হর হর মহাদেব” ধ্বনিতে মুখরিত মন্দির প্রাঙ্গণে।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram