ডাম্পারের ধুলোয় অতিষ্ঠ মানুষ !

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
আসানসোল : শহরের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন এই পথ দিয়ে। স্কুল-কলেজের পড়ুয়া, অফিসগামী, ব্যবসায়ী, সাধারণ পথচারী থেকে শুরু করে ছোট-বড় যানবাহনের অবিরাম চলাচল লেগেই থাকে। কিন্তু সেই গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাতেই এখন নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে ধুলো আর দূষণ। অভিযোগ, ওভারলোডেড ডাম্পারের অবাধ যাতায়াতের জেরে ভগৎ সিং মোড় থেকে সেঁন্ড্রেলে রোডের পাঁচপুল সংলগ্ন রেল সাইডিং পর্যন্ত গোটা এলাকা কার্যত ধুলোর চাদরে ঢেকে যাচ্ছে। ফলে প্রতিদিন চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কয়লা বোঝাই ডাম্পারগুলির অধিকাংশই অতিরিক্ত মাল বহন করছে। গাড়ির উপরিভাগ সঠিকভাবে ঢেকে না রাখার ফলে চলন্ত অবস্থায় কয়লার গুঁড়ো ও ধুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। সামান্য বাতাসেই সেই ধুলো রাস্তার উপর কুয়াশার মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় কয়েক মিটার দূরের গাড়িও স্পষ্টভাবে দেখা যায় না। এতে যেমন পরিবেশ দূষণ বাড়ছে, তেমনই দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। ভগৎ সিং মোড় থেকে পাঁচপুল পর্যন্ত এই সড়কটি শুধু একটি সাধারণ রাস্তা নয়, এটি ১৯ নম্বর জাতীয় সড়কের যুবলী মোড়ের সঙ্গে সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। প্রতিদিন বহু ছোট-বড় যানবাহন এই রাস্তা ব্যবহার করে। পাশাপাশি প্রশাসনিক আধিকারিক, জনপ্রতিনিধি, মন্ত্রী, বিধায়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও নিয়মিত এই পথ দিয়ে যাতায়াত করেন। অথচ এত গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় ধুলো দূষণের এমন চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। রাস্তার দু’ধারে বসবাসকারী মানুষের দাবি, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একের পর এক ডাম্পার চলাচল করছে। ডাম্পারের চাকার ধাক্কায় রাস্তার জমে থাকা কয়লার গুঁড়ো আরও বেশি করে বাতাসে উড়ে যাচ্ছে। বাড়ির জানালা খুলে রাখা যায় না, কাপড় শুকোতে দিলে কয়লার ধুলোয় কালো হয়ে যায়। ঘরের আসবাবপত্রেও প্রতিনিয়ত ধুলোর আস্তরণ জমছে। প্রতিদিন ঘর পরিষ্কার করেও যেন কোনও লাভ হচ্ছে না। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী এবং পথচারীরা। অনেক শিক্ষার্থীকে মুখে রুমাল বা মাস্ক বেঁধে এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতে দেখা যায়। প্রবীণ নাগরিকদেরও একই অভিযোগ। তাঁদের মতে, ধুলোর কারণে চোখে জ্বালা, গলায় অস্বস্তি এবং শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে। যাঁদের আগে থেকেই হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে উঠছে।
ডাম্পারের ধুলোয় অতিষ্ঠ মানুষ !
শ্বাস নিতে কষ্ট, চোখে জ্বালা ! ডাম্পারের ধুলোয় অতিষ্ঠ ভগৎ সিং মোড়–পাঁচপুল এলাকার মানুষ

স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত। রাস্তার ধারে থাকা দোকানগুলিতে সারাদিন কয়লার ধুলো জমে থাকছে। খাবারের দোকান থেকে পোশাকের দোকান—সব ক্ষেত্রেই ধুলোর কারণে ব্যবসায় প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ। ক্রেতাদেরও অনেক সময় অস্বস্তির মধ্যে কেনাকাটা করতে হচ্ছে। এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, শুধু ধুলো দূষণই নয়, ওভারলোডেড ডাম্পারের কারণে রাস্তার উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। এর ফলে রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় ক্ষতি হচ্ছে এবং যান চলাচলেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে। ভারী গাড়িগুলির দ্রুতগতির চলাচলে ছোট গাড়ি, মোটরবাইক এবং সাইকেল আরোহীদের ঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে। বাসিন্দাদের দাবি, বহুবার প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বিষয়টি জানানো হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট দফতরের কাছে লিখিত ও মৌখিকভাবে অভিযোগ করা হলেও এখনও পর্যন্ত স্থায়ী কোনও সমাধান মেলেনি। মাঝে মধ্যে নজরদারি বাড়ানো হলেও কয়েকদিন পরেই আবার আগের পরিস্থিতি ফিরে আসে বলে অভিযোগ। অনেকের প্রশ্ন, কয়লা পরিবহনের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম থাকলেও সেই নিয়ম কতটা মানা হচ্ছে? ডাম্পারগুলির উপর ত্রিপল সঠিকভাবে ঢাকা রয়েছে কি না, নির্ধারিত ওজনের বেশি মাল বহন করা হচ্ছে কি না, কিংবা নিয়মিত জল ছিটিয়ে ধুলো নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে কি না—এসব বিষয়েও প্রশাসনের আরও কঠোর নজরদারির দাবি উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন কয়লার ধুলোর সংস্পর্শে থাকলে শ্বাসযন্ত্রের নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশু, বয়স্ক এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। পাশাপাশি অতিরিক্ত ধুলো বাতাসে ভেসে বেড়ালে দৃশ্যমানতা কমে যায়, যা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হতে পারে। তাই শুধুমাত্র পরিবেশ দূষণ নয়, জনস্বাস্থ্যের দিক থেকেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয়দের প্রস্তাব, ডাম্পারগুলিকে সম্পূর্ণভাবে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে কয়লা পরিবহন বাধ্যতামূলক করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ে ভারী যান চলাচলের অনুমতি, নিয়মিত রাস্তা পরিষ্কার, জল ছিটিয়ে ধুলো নিয়ন্ত্রণ এবং ওভারলোড গাড়ির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করলে পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হতে পারে। পাশাপাশি নিয়ম ভাঙা গাড়ির বিরুদ্ধে নিয়মিত জরিমানা ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ারও দাবি তুলেছেন তাঁরা। এলাকাবাসীর বক্তব্য, উন্নয়নের জন্য শিল্প ও পরিবহন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই উন্নয়নের বোঝা যদি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার উপর এসে পড়ে, তাহলে তা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিল্পের পাশাপাশি পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। সব মিলিয়ে, ভগৎ সিং মোড় থেকে পাঁচপুল পর্যন্ত সড়কে ওভারলোডেড ডাম্পারের অবাধ চলাচল এখন স্থানীয়দের কাছে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন ধুলো দূষণ, শ্বাসকষ্টের আশঙ্কা এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে পথ চলতে হচ্ছে হাজার হাজার মানুষকে। তাই তাঁদের একটাই আবেদন—প্রশাসন দ্রুত হস্তক্ষেপ করে ওভারলোড ডাম্পারের উপর কড়া নজরদারি চালাক, ধুলো নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করুক এবং সাধারণ মানুষের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত করুক।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram