দণ্ডী কেটে বারাবনি থেকে তারকেশ্বর, ভক্তির নজির হরেকৃষ্ণর

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
বারাবনি : অদম্য ইচ্ছাশক্তি, গভীর আস্থা এবং অটুট ভক্তি—এই তিনের মেলবন্ধন যেন বারাবনির বাসিন্দা বীরেশ মণ্ডল, যাঁকে এলাকার মানুষ হরেকৃষ্ণ নামেই বেশি চেনেন। শ্রাবণ মাসে বাবা তারকনাথের আশীর্বাদ লাভের উদ্দেশ্যে তিনি শুরু করেছেন এক কঠিন ও কষ্টসাধ্য ধর্মীয় যাত্রা। গন্তব্য হুগলির তারকেশ্বর মন্দির। আর সেই গন্তব্যে পৌঁছতে তিনি বেছে নিয়েছেন দণ্ডী কেটে যাওয়ার পথ। বারাবনি থেকে তারকেশ্বরের দূরত্ব প্রায় ১৮০ কিলোমিটার। এই দীর্ঘ পথ তিনি হেঁটে নয়, প্রতিটি পদক্ষেপে দণ্ডী কেটে অতিক্রম করার সংকল্প নিয়েছেন। সাধারণ মানুষের কাছে যা প্রায় অকল্পনীয়, সেটিকেই বাস্তবে রূপ দিচ্ছেন হরেকৃষ্ণ। শনিবার ভোরে রুনাকুড়া ঘাটে পবিত্র স্নান সেরে সমস্ত ধর্মীয় নিয়ম মেনে শুরু হয় তাঁর যাত্রা। নদীতে স্নানের পর বাবা ভোলানাথের নাম জপ করে তিনি রওনা দেন তারকেশ্বরের উদ্দেশ্যে। এই যাত্রার মূল উদ্দেশ্য কোনও ব্যক্তিগত লাভ নয়। হরেকৃষ্ণ জানিয়েছেন, তাঁর একমাত্র প্রার্থনা পরিবারের সকলের সুখ, শান্তি, সুস্বাস্থ্য এবং মঙ্গল। বাবা তারকনাথের আশীর্বাদেই যেন পরিবারের সমস্ত বাধা-বিপত্তি দূর হয়, সেই কামনাতেই এই কঠিন ব্রত পালন করছেন তিনি। তবে এই প্রথম নয়। এর আগেও নিজের মানত পূরণে একইভাবে দণ্ডী যাত্রা করেছিলেন হরেকৃষ্ণ। বিধানসভা নির্বাচনের আগে বারাবনির বিধায়ক অরিজিৎ রায়ের জয় কামনা করে রুনাকুড়া ঘাট থেকে চন্দ্রচূড় মন্দির পর্যন্ত দণ্ডী কেটে গিয়ে পুজো দিয়েছিলেন তিনি। সেই মানত পূর্ণ হওয়ার পর এবার আবারও নতুন সংকল্প নিয়ে পথে নেমেছেন এই শিবভক্ত। দণ্ডী কেটে চলার এই যাত্রা মোটেও সহজ নয়। প্রতিটি ধাপে শরীরকে মাটিতে সম্পূর্ণ শুইয়ে, তারপর উঠে আবার সেই স্থান পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়া—এই নিয়ম মেনেই এগোতে হয়। দিনের পর দিন একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে শত শত কিলোমিটার পথ অতিক্রম করা মানে অসাধারণ মানসিক শক্তি, ধৈর্য এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের পরিচয়।
দণ্ডী কেটে বারাবনি থেকে তারকেশ্বর, ভক্তির নজির হরেকৃষ্ণর
১৮০ কিমি দণ্ডী কেটে তারকেশ্বরের পথে বারাবনির হরেকৃষ্ণ !

এই কঠিন পথচলায় হরেকৃষ্ণ জানিয়েছেন, তিনি আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে তারকেশ্বর মন্দিরে পৌঁছনোর আশা করছেন। সেখানে বাবা তারকনাথের চরণে প্রণাম জানিয়ে মানত পূর্ণ করবেন। শ্রাবণ মাসে প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্ত তারকেশ্বরের পথে রওনা দেন। কেউ কাঁধে কাঁভার নিয়ে হাঁটেন, কেউ আবার পদযাত্রা করেন। কিন্তু দণ্ডী কেটে ১৮০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করার মতো দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়। তাই হরেকৃষ্ণের এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যেও গভীর আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। যাত্রাপথে রাস্তার দু’ধারে বহু মানুষ দাঁড়িয়ে তাঁকে উৎসাহ দিচ্ছেন। কেউ জল তুলে দিচ্ছেন, কেউ বিশ্রামের ব্যবস্থা করছেন, আবার কেউ ভক্তিভরে প্রণাম জানিয়ে তাঁর এই নিষ্ঠার প্রশংসা করছেন। স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, বর্তমান সময়ে যখন মানুষ দ্রুত ফল পাওয়ার প্রত্যাশায় অভ্যস্ত, তখন হরেকৃষ্ণের মতো একজন মানুষ কঠোর তপস্যা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে ভক্তির এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করছেন। হরেকৃষ্ণের এই যাত্রা শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এটি মানসিক দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস এবং অটুট বিশ্বাসেরও প্রতীক। তাঁর এই সংকল্প নতুন প্রজন্মের কাছেও এক অনুপ্রেরণার বার্তা বহন করছে। শ্রাবণ মাসে বাবা ভোলানাথের প্রতি ভক্তি প্রকাশের নানা রীতি রয়েছে। কেউ উপবাস পালন করেন, কেউ জলাভিষেক করেন, আবার কেউ দীর্ঘ পদযাত্রা করেন। সেই ধারার মধ্যেই হরেকৃষ্ণের দণ্ডী যাত্রা এক বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে। যাত্রাপথে শারীরিক কষ্ট থাকলেও তাঁর মুখে ক্লান্তির ছাপের বদলে রয়েছে এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস। প্রতিটি দণ্ডী কাটার সঙ্গে সঙ্গে তিনি উচ্চারণ করছেন ‘হর হর মহাদেব’ এবং ‘জয় বাবা তারকনাথ’। সেই ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠছে পথ। স্থানীয়দের মতে, হরেকৃষ্ণের এই ভক্তি এবং মানসিক শক্তি সত্যিই বিরল। তাঁর এই যাত্রা শুধু বারাবনি নয়, আশপাশের এলাকাতেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। অনেকেই তাঁর জন্য প্রার্থনা করছেন, যাতে তিনি নিরাপদে এবং সফলভাবে তারকেশ্বরে পৌঁছে মানত পূর্ণ করতে পারেন। শ্রাবণের পবিত্র মাসে এমন ভক্তির নিদর্শন ধর্মীয় আবহকে আরও গভীর করে তুলেছে। মানুষের বিশ্বাস, নিষ্ঠা আর ঈশ্বরের প্রতি অটুট আস্থাই হরেকৃষ্ণকে এই কঠিন পথ চলার শক্তি জোগাচ্ছে।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram